আজকের খবর ২০২৬

নামজারি ছাড়াই করা যাবে ওয়ারিশসূত্রে প্রাপ্ত সম্পত্তির সব দলিল: নতুন অধ্যাদেশ জারি

বাংলাদেশ গেজেটে প্রকাশিত রাষ্ট্রপতির নতুন এক অধ্যাদেশের মাধ্যমে সম্পত্তি রেজিস্ট্রেশন প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হয়েছে। এখন থেকে ওয়ারিশসূত্রে প্রাপ্ত সম্পত্তির ক্ষেত্রে নামজারি (মিউটেশন) ছাড়াই হেবার ঘোষণা, দানপত্রসহ সব ধরনের দলিল রেজিস্ট্রি করা যাবে

অধ্যাদেশের মূল পরিবর্তনসমূহ:

সম্প্রতি প্রকাশিত ‘রেজিস্ট্রেশন (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৬’-এর মাধ্যমে ১৯০৮ সালের মূল রেজিস্ট্রেশন অ্যাক্টে গুরুত্বপূর্ণ কিছু সংশোধন আনা হয়েছে:

  • নামজারির শর্ত শিথিল: আগে জমি বিক্রয় বা হস্তান্তরের ক্ষেত্রে নামজারি বাধ্যতামূলক থাকলেও, নতুন সংশোধনী অনুযায়ী মুসলিম ব্যক্তিগত আইন (শরিয়ত) মোতাবেক হেবা বা হেবার ঘোষণা এবং হিন্দু, খ্রিস্টান ও বৌদ্ধ ব্যক্তিগত আইন অনুযায়ী দানপত্রের দলিলের ক্ষেত্রে এই নিয়ম শিথিল করা হয়েছে

  • সময়সীমা বৃদ্ধি: বায়না দলিল রেজিস্ট্রির সময়সীমা পূর্বের ৩০ দিন থেকে বাড়িয়ে এখন ৬০ দিন করা হয়েছে এছাড়া বিদেশে সম্পাদিত দলিলের ক্ষেত্রে সময়সীমা ৪ মাস থেকে বাড়িয়ে ৬ মাস করা হয়েছে

  • ই-রেজিস্ট্রেশন চালু: আধুনিকায়নের লক্ষ্যে সরকার ডিজিটাল পদ্ধতিতে বা ই-রেজিস্ট্রেশনের মাধ্যমে দলিল নিবন্ধনের নতুন বিধান যুক্ত করেছে এর ফলে সরকারি সফটওয়্যার ব্যবহার করে অনলাইনে দলিল উপস্থাপন ও সম্পাদন করা যাবে

  • আপিল নিষ্পত্তির নির্দিষ্ট সময়: রেজিস্ট্রেশন সংক্রান্ত কোনো আপিল দায়ের করা হলে তা রেজিস্ট্রারকে ৪৫ দিনের মধ্যে এবং অন্যান্য আবেদন ৩০ দিনের মধ্যে নিষ্পত্তি করতে হবে

কর্মকর্তাদের জবাবদিহিতা:

নতুন নিয়মে সাব-রেজিস্ট্রারদের দায়িত্ব পালনে আরও কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে। যদি কোনো রেজিস্টারিং অফিসার ভুলবশত বা অন্য কোনোভাবে কম ফি বা ট্যাক্স নিয়ে দলিল রেজিস্ট্রি করেন, তবে সেই অনাদায়ী অর্থ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার কাছ থেকেই আদায় করা হবে এবং এটি ‘অসদাচরণ’ হিসেবে গণ্য হবে

উল্লেখ্য, সংসদ ভেঙে যাওয়া অবস্থায় জনস্বার্থে জরুরি ব্যবস্থা গ্রহণের লক্ষ্যে সংবিধানের ৯৩ (১) অনুচ্ছেদে প্রদত্ত ক্ষমতাবলে রাষ্ট্রপতি মোঃ সাহাবুদ্দিন এই অধ্যাদেশটি জারি করেছেন এটি অবিলম্বে কার্যকর করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে

বন্টননামা ছাড়াই হস্তান্তর করা যাবে?

ওয়ারিশ সূত্রে পাওয়া সম্পত্তির ক্ষেত্রে নামজারি (মিউটেশন) করার নিয়ম শিথিল করা হলেও বণ্টননামা (Partition Deed) দলিলের বিষয়টি ভিন্ন। তথ্যাদি বিশ্লেষণ করে আপনার প্রশ্নের উত্তর নিচে দেওয়া হলো:

১. বণ্টননামা কি বাধ্যতামূলক? বর্তমান আইন অনুযায়ী, কোনো অংশীদার বা ওয়ারিশ যদি তার সুনির্দিষ্ট অংশ (দাগ বা চৌহদ্দি উল্লেখ করে) বিক্রি বা হস্তান্তর করতে চান, তবে অবশ্যই রেজিস্ট্রিকৃত বণ্টননামা দলিল থাকতে হবে। বণ্টননামা ছাড়া ওয়ারিশগণ কেবলমাত্র তাদের ‘অবিভক্ত অংশ’ (যেমন: মোট জমির ৫ শতাংশের মালিকানা) বিক্রি করতে পারেন, কিন্তু জমির কোন নির্দিষ্ট অংশটি (যেমন: উত্তর দিক বা রাস্তার ধারের অংশ) তিনি বিক্রি করছেন তা বণ্টননামা ছাড়া আইনত বৈধ হয় না।

২. নতুন অধ্যাদেশের প্রভাব: ২০২৬ সালের নতুন অধ্যাদেশে মূলত নামজারির (মিউটেশন) বাধ্যবাধকতা কমানো হয়েছে (বিশেষ করে হেবা বা দান দলিলের ক্ষেত্রে)। কিন্তু বণ্টননামার ক্ষেত্রে আগের নিয়মগুলো এখনও কার্যকর। অর্থাৎ, জমি যদি ওয়ারিশদের মধ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে ভাগ না করা থাকে, তবে একজন ওয়ারিশ অন্য ওয়ারিশদের বঞ্চিত করে নিজের খুশিমতো ভালো অংশ হস্তান্তর করতে পারবেন না।

৩. ঝুঁকি ও জটিলতা: বণ্টননামা ছাড়া জমি হস্তান্তর করলে পরবর্তীতে অন্য ওয়ারিশরা মামলা (Partition Suit) করতে পারেন। ফলে ক্রেতা বা গ্রহীতা আইনি জটিলতায় পড়তে পারেন। তাই নিরাপদ হস্তান্তরের জন্য প্রথমে রেজিস্ট্রিকৃত বণ্টননামা করে নেওয়া এবং এরপর হস্তান্তর করা সবচেয়ে শ্রেয়।

সারসংক্ষেপ: আপনি বণ্টননামা ছাড়া ওয়ারিশি সম্পত্তি হস্তান্তর করতে পারেন ঠিকই, তবে তা হবে একটি ‘অবিভক্ত অংশ’ মাত্র। আপনি যদি জমির নির্দিষ্ট জায়গা বা দাগ উল্লেখ করে হস্তান্তর করতে চান, তবে বণ্টননামা দলিল করা আবশ্যক।

রেজিস্ট্রেশন আইনে যুগান্তকারী পরিবর্তন: ই-রেজিস্ট্রেশন ও সময়সীমায় নতুন নিয়ম

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *