সূচীপত্র
বাংলাদেশ সরকারি কর্মচারীদের বহু প্রতীক্ষিত ৯ম পে স্কেল বা নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। সম্প্রতি পে কমিশন তাদের সুপারিশ জমা দিয়েছে, যেখানে সর্বনিম্ন বেতন ২০,০০০ টাকা এবং সর্বোচ্চ বেতন ১,৬০,০০০ টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে। তবে এই নতুন স্কেলে বেতন নির্ধারণ বা ‘পে-ফিক্সেশন’ (Pay-Fixation) কোন পদ্ধতিতে হবে, তা নিয়ে কর্মচারী মহলে চলছে ব্যাপক বিশ্লেষণ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মূলত দুটি পদ্ধতিতে বেতন ফিক্সেশন হতে পারে: ‘পার্থক্য যোগ পদ্ধতি’ এবং ‘ইনক্রিমেন্ট ফ্যাক্টর পদ্ধতি’। এই দুই পদ্ধতির গাণিতিক পার্থক্যের কারণে একই গ্রেডের দুই কর্মচারীর চূড়ান্ত বেসিকে বড় ব্যবধান তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
পদ্ধতি দুটির গাণিতিক বিশ্লেষণ
একটি কাল্পনিক উদাহরণ (১০ম গ্রেড) দিয়ে পদ্ধতি দুটির পার্থক্য নিচে তুলে ধরা হলো:
| বিষয় | পার্থক্য যোগ পদ্ধতি (Difference Addition Method) | ইনক্রিমেন্ট ফ্যাক্টর পদ্ধতি (Increment Factor Method) |
| পুরোনো বেসিক (ধরা যাক) | ১০,২০০ টাকা | ১০,২০০ টাকা |
| ইনক্রিমেন্টসহ বর্তমান বেসিক | ১৩,০৫০ টাকা | ১৩,০৫০ টাকা |
| পার্থক্য/ফ্যাক্টর নির্ণয় | ১৩,০৫০ – ১০,২০০ = ২,৮৫০ টাকা | ১৩,০৫০ / ১০,২০০ = ১.২৮০৪৯ (ফ্যাক্টর) |
| নতুন স্কেলের প্রারম্ভিক বেতন | ২১,০০০ টাকা | ২১,০০০ টাকা |
| গণনাকৃত নতুন বেসিক | ২১,০০০ + ২,৮৫০ = ২৩,৮৫০ টাকা | ২১,০০০ × ১.২৮০৪৯ = ২৬,৮৮০ টাকা |
| চূড়ান্ত বেতন (নিকটতম উচ্চতর ধাপ) | ২৫,২০০ টাকা | ২৭,০০০ টাকা |
বিশ্লেষণে যা দেখা যাচ্ছে
প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, ‘ইনক্রিমেন্ট ফ্যাক্টর’ পদ্ধতি অনুসরণ করলে কর্মচারীদের মূল বেতন ‘পার্থক্য যোগ’ পদ্ধতির তুলনায় উল্লেখযোগ্য হারে বেশি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। উপরের উদাহরণে দেখা যাচ্ছে, ইনক্রিমেন্ট ফ্যাক্টর পদ্ধতিতে বেতন প্রায় ১,৮০০ টাকা বেশি হচ্ছে। মূলত ২০১৫ সালের ৮ম পে স্কেলে ‘পার্থক্য যোগ’ পদ্ধতি ব্যবহার করা হলেও, কর্মচারীদের দীর্ঘদিনের দাবি এবার যেন বৈজ্ঞানিক ‘ফ্যাক্টর’ পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়।
৯ম পে কমিশনের মূল সুপারিশসমূহ (২০২৬)
বেতন বৃদ্ধি: ১০০% থেকে ১৪৭% পর্যন্ত বেতন বৃদ্ধির প্রস্তাব।
গ্রেড বিন্যাস: পূর্বের ২০টি গ্রেডই বহাল থাকছে।
ভাতা বৃদ্ধি: বৈশাখী ভাতা ২০% থেকে বাড়িয়ে ৫০% করার প্রস্তাব।
টিফিন ও যাতায়াত ভাতা: ১১-২০ গ্রেডের কর্মচারীদের জন্য টিফিন ভাতা ১,০০০ টাকা এবং ১০-২০ গ্রেডের জন্য যাতায়াত ভাতার সুবিধা।
বিশেষ সুবিধা: প্রতিবন্ধী সন্তান থাকলে মাসিক ২,০০০ টাকা বিশেষ ভাতার সুপারিশ।
কবে নাগাদ বাস্তবায়ন?
পে কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী, ১ জানুয়ারি ২০২৬ থেকে আংশিক এবং ১ জুলাই ২০২৬ থেকে নতুন স্কেল পূর্ণাঙ্গভাবে কার্যকর করার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে সরকারের সংশ্লিষ্ট কমিটিগুলো বর্তমানে এই সুপারিশগুলো যাচাই-বাছাই করছে। অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, বাজার স্থিতিশীল রাখা এবং সরবরাহ ব্যবস্থা ঠিক রাখার বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে এই বেতন বৃদ্ধি কার্যকর করা হবে।

২০ গ্রেডে ১০৫৬০ টাকা মূল বেতনে নতুন ফিক্সেশন বেতন কত হবে?
২০তম গ্রেডে আপনার বর্তমান মূল বেতন ১০,৫৬০ টাকা হলে, ৯ম পে কমিশনের সম্ভাব্য প্রস্তাবনা এবং পূর্ববর্তী ধাপগুলোর (৮ম পে স্কেল) তুলনায় গাণিতিক বিশ্লেষণ নিচে দেওয়া হলো।
৯ম পে স্কেলের প্রস্তাবিত সর্বনিম্ন মূল বেতন (২০তম গ্রেড) ধরা হয়েছে ২০,০০০ টাকা। আপনার বেতন ফিক্সেশন কোন পদ্ধতিতে হবে তার ওপর ভিত্তি করে দুটি সম্ভাব্য হিসাব নিচে দেওয়া হলো:
১. ‘পার্থক্য যোগ’ পদ্ধতি (Difference Addition Method)
এই পদ্ধতিতে আপনার বর্তমান মূল বেতন থেকে ২০তম গ্রেডের শুরুর বেতনের পার্থক্য বের করে তা নতুন স্কেলের শুরুর সাথে যোগ করা হয়।
৮ম স্কেলে ২০তম গ্রেডের শুরুর বেতন: ৮,২৫০ টাকা
আপনার বর্তমান মূল বেতন: ১০,৫৬০ টাকা
পার্থক্য (ইনক্রিমেন্ট জনিত): ১০,৫৬০ – ৮,২৫০ = ২,৩১০ টাকা
৯ম স্কেলে ২০তম গ্রেডের প্রস্তাবিত শুরু: ২০,০০০ টাকা
হিসাবকৃত নতুন বেতন: ২০,০০০ + ২,৩১০ = ২২,৩১০ টাকা
চূড়ান্ত ফিক্সেশন: পে স্কেলের নিয়ম অনুযায়ী পরবর্তী উচ্চতর ধাপে এটি নির্ধারিত হবে। সেক্ষেত্রে আপনার নতুন মূল বেতন হতে পারে ২২,৭৫০ টাকা (৫% ইনক্রিমেন্ট ধাপ অনুযায়ী)।
২. ‘ইনক্রিমেন্ট ফ্যাক্টর’ পদ্ধতি (Increment Factor Method)
এই পদ্ধতিতে আপনার বর্তমান ধাপের অনুপাত অনুযায়ী নতুন স্কেলে বেতন নির্ধারণ করা হয়। এটি কর্মচারীদের জন্য বেশি লাভজনক।
বর্তমান ইনক্রিমেন্ট ফ্যাক্টর: ১০,৫৬০ / ৮,২৫০ = ১.২৮ (অর্থাৎ আপনি বর্তমানে প্রারম্ভিক বেতনের ১.২৮ গুণ বেতন পাচ্ছেন)
৯ম স্কেলে প্রস্তাবিত শুরু: ২০,০০০ টাকা
হিসাবকৃত নতুন বেতন: ২০,০০০ × ১.২৮ = ২৫,৬০০ টাকা
চূড়ান্ত ফিক্সেশন: পরবর্তী উচ্চতর ধাপ অনুযায়ী আপনার নতুন মূল বেতন হতে পারে ২৬,০০০ টাকা বা এর কাছাকাছি।
সারসংক্ষেপ:
| পদ্ধতি | হিসাবকৃত বেতন | সম্ভাব্য চূড়ান্ত ফিক্সেশন (মূল বেতন) |
| পার্থক্য যোগ পদ্ধতি | ২২,৩১০ টাকা | ২২,৭৫০ টাকা (প্রায়) |
| ইনক্রিমেন্ট ফ্যাক্টর পদ্ধতি | ২৫,৬০০ টাকা | ২৬,০০০ টাকা (প্রায়) |
দ্রষ্টব্য: এটি ৯ম পে কমিশনের প্রাথমিক প্রস্তাবনা ও প্রচলিত গাণিতিক মডেলের ভিত্তিতে একটি সম্ভাব্য হিসাব। সরকারের চূড়ান্ত প্রজ্ঞাপন বা গ্যাজেট প্রকাশের পর সঠিক ধাপ ও টাকার পরিমাণ নিশ্চিত হওয়া যাবে। তবে ইনক্রিমেন্ট ফ্যাক্টর পদ্ধতি কার্যকর হলে আপনার বেতন তুলনামূলক অনেক বেশি বৃদ্ধি পাবে।
