জুলাই ২০২৪-এর ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশে রাষ্ট্র সংস্কারের এক মহাযজ্ঞ শুরু হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫’ জারি করা হয়েছে, যার অধীনে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি একটি জাতীয় গণভোট অনুষ্ঠিত হবে। এই গণভোটের মাধ্যমে দেশের সংবিধানে আমূল পরিবর্তনের বিষয়ে জনগণের সরাসরি মতামত নেওয়া হবে।
তথ্যানুযায়ী, গণভোটে মূলত ৪৮টি সাংবিধানিক সংস্কার প্রস্তাব এবং আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের ওপর জনগণের সম্মতি চাওয়া হবে। নিচে এই গণভোট এবং সংস্কার প্রস্তাবগুলোর একটি বিস্তারিত বিশ্লেষণ তুলে ধরা হলো:
১. গণভোটের প্রেক্ষাপট ও আইনি ভিত্তি
গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে প্রকাশিত জনগণের সার্বভৌম ক্ষমতার প্রতিফলন ঘটাতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এই উদ্যোগ নিয়েছে। ‘জাতীয় ঐকমত্য কমিশন’ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও জোটের সাথে আলোচনার ভিত্তিতে ‘জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫’ প্রণয়ন করে, যেখানে প্রায় ৮০টিরও বেশি সংস্কার প্রস্তাব রয়েছে। এর মধ্যে ৪৮টি প্রস্তাব সরাসরি সংবিধান সংস্কারের সাথে সম্পর্কিত।
২. গণভোটের মূল বিষয়সমূহ
গণভোটে ভোটারদের একটি ব্যালটে ‘হ্যাঁ’ অথবা ‘না’ ভোটের মাধ্যমে সংস্কার প্রস্তাবগুলোর ওপর রায় দিতে হবে। প্রধান বিষয়গুলো হলো:
তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান: নির্বাচনের সময় নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তন এবং নির্বাচন কমিশনসহ অন্যান্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠনের প্রস্তাব।
দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ: বর্তমান এক কক্ষবিশিষ্ট সংসদের পরিবর্তে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদীয় ব্যবস্থা (উচ্চকক্ষ ও নিম্নকক্ষ) প্রবর্তন। প্রস্তাব অনুযায়ী, ১০০ সদস্যের একটি উচ্চকক্ষ থাকবে, যেখানে সদস্যরা নির্বাচনের প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে মনোনীত হবেন।
ক্ষমতার ভারসাম্য (প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা): প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার একক প্রাধান্য কমিয়ে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতায় ভারসাম্য আনা। প্রস্তাব অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী সর্বোচ্চ দুই মেয়াদের বেশি দায়িত্ব পালন করতে পারবেন না। এছাড়া রাষ্ট্রপতি কারো পরামর্শ ছাড়াই প্রধান বিচারপতি এবং কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ দিতে পারবেন।
মৌলিক অধিকার ও রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি: সংবিধানে সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচারের পাশাপাশি বহু-ধর্মীয়, বহু-ভাষী ও বহু-সাংস্কৃতিক বাংলাদেশের স্বীকৃতি প্রদান।
৩. সংস্কার প্রস্তাবের বিস্তারিত বিশ্লেষণ (৪৮টি বিষয়)
যদিও সনদে ৮০টির বেশি সুপারিশ রয়েছে, তবে সংবিধানের বিশেষ ৪টি স্তম্ভের ওপর ভিত্তি করে ৪৮টি প্রস্তাবকে গণভোটের জন্য প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে:
সংবিধান সংশোধন পদ্ধতি (অনুচ্ছেদ ১৪২): সংবিধানের গুরুত্বপূর্ণ কিছু অনুচ্ছেদ (যেমন- অনুচ্ছেদ ৮, ৪৮, ৫৬ এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা) সংশোধনের জন্য ভবিষ্যতে সংসদের দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার পাশাপাশি গণভোট বাধ্যতামূলক করা।
বিচার বিভাগের স্বাধীনতা: প্রধান বিচারপতি নিয়োগের জন্য একটি স্বাধীন ‘জুডিশিয়াল অ্যাপয়েন্টমেন্ট কমিশন’ গঠন এবং জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে নিয়োগ নিশ্চিত করা।
সংসদে বিরোধী দলের অবস্থান: ডেপুটি স্পিকার এবং বেশ কিছু সংসদীয় কমিটির প্রধান বিরোধী দল থেকে নির্বাচিত হওয়ার বাধ্যবাধকতা নিশ্চিত করা।
নাগরিকের পরিচয় ও ভাষা: বিদ্যমান সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৬(২) সংশোধন করে ‘বাঙালি’ জাতির পরিবর্তে ‘বাংলাদেশি’ নাগরিক হিসেবে পরিচিতি নিশ্চিত করা এবং সকল ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর মাতৃভাষার স্বীকৃতি প্রদান।
জরুরি অবস্থা ও মৌলিক অধিকার: জরুরি অবস্থা ঘোষণার জন্য প্রধানমন্ত্রীর পরিবর্তে মন্ত্রিসভার অনুমোদন এবং ঐ অবস্থায় নাগরিকের জীবনের অধিকারসহ মৌলিক কিছু অধিকার অলঙ্ঘনীয় রাখা।
৪. নির্বাচনের সাথে একই দিনে ভোট
আগামী ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সাথেই এই গণভোট অনুষ্ঠিত হবে। ভোটাররা একদিকে যেমন তাদের সংসদ সদস্য নির্বাচন করবেন, অন্যদিকে সংবিধানের এই বড় পরিবর্তনগুলোতেও সম্মতি দেবেন। যদি সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ ‘হ্যাঁ’ ভোট দেয়, তবে নবনির্বাচিত সংসদ প্রথম ১৮০ দিনের মধ্যে এই সংস্কারগুলো কার্যকর করতে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।
এই গণভোটের মাধ্যমে বাংলাদেশে দীর্ঘদিনের একনায়কতান্ত্রিক প্রবণতা রোধ এবং একটি টেকসই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে এ নিয়ে কিছু দ্বিমত থাকলেও, জুলাই বিপ্লবের চেতনা বাস্তবায়নে এই সংস্কারকে ঐতিহাসিক পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

