পৈতৃক বা উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত সম্পত্তি নিয়ে পারিবারিক কলহ এবং আইনি জটিলতা নিরসনে সরকার সম্পত্তি বণ্টন এবং নামজারির প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ও সহজীকরণ এনেছে। এখন থেকে উত্তরাধিকারীদের মধ্যে আপোষ বণ্টননামা এবং ই-নামজারির মাধ্যমে দ্রুততম সময়ে জমির মালিকানা নিশ্চিত করা সম্ভব।
আপোষ বণ্টননামা: কেন এবং কীভাবে করবেন?
উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত সম্পত্তিতে একাধিক অংশীদার থাকলে ভবিষ্যতে বিরোধ এড়াতে ‘আপোষ বণ্টননামা’ দলিল রেজিস্ট্রি করা অত্যন্ত জরুরি। এটি সম্পন্ন করার ধাপগুলো হলো:
ঐক্যমত্য: প্রথমে সকল ওয়ারিশকে সম্পত্তির হিস্যা বা ভাগ বাটোয়ারার বিষয়ে একমত হতে হবে।
দলিল প্রস্তুত: সম্পত্তির তফসিল (বিবরণ) এবং প্রত্যেকের প্রাপ্ত অংশ উল্লেখ করে একটি খসড়া তৈরি করতে হবে।
রেজিস্ট্রেশন: স্ট্যাম্প পেপারে বণ্টননামা লিখে সকল ওয়ারিশের স্বাক্ষরের পর তা সংশ্লিষ্ট সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে জমা দিয়ে রেজিস্ট্রি করতে হবে।
খরচ: সম্পত্তির মূল্যের ওপর ভিত্তি করে রেজিস্ট্রেশন ফি, স্ট্যাম্প শুল্ক এবং ই-ফি পরিশোধ করতে হবে।
নামজারি বা মিউটেশন: ডিজিটাল যুগে ভোগান্তিহীন সেবা
জমির মালিকানা সরকারি রেকর্ডে অন্তর্ভুক্ত করাই হলো নামজারি। বর্তমানে ই-নামজারির মাধ্যমে ঘরে বসেই এই সেবা পাওয়া যাচ্ছে।
আবেদনের প্রক্রিয়া: ১. অনলাইনে বা সহকারী কমিশনার (ভূমি) অফিসে আবেদন করতে হবে। ২. আবেদনের সাথে বণ্টননামা দলিল, ওয়ারিশ সনদ, আগের খতিয়ানের কপি, খাজনার রশিদ এবং জাতীয় পরিচয়পত্র জমা দিতে হবে। ৩. আবেদন ফি ও নোটিশ জারি ফি পরিশোধের পর ভূমি অফিস প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই ও সরেজমিনে তদন্ত করবে। ৪. সব ঠিক থাকলে ডিসিআর (DCR) ফি প্রদানের মাধ্যমে নতুন খতিয়ান সংগ্রহ করা যাবে।
ভূমি মন্ত্রণালয়ের নতুন পরিপত্র: বণ্টননামা ছাড়াও হবে নামজারি
সম্প্রতি ভূমি মন্ত্রণালয় এক যুগান্তকারী পরিপত্র জারি করেছে। নতুন এই নির্দেশনা অনুযায়ী, বণ্টননামা দলিল না থাকলেও কেবল সকল ওয়ারিশের যৌথ আবেদনের ভিত্তিতে নামজারি করা সম্ভব হবে। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, দীর্ঘমেয়াদী আইনি সুরক্ষা এবং বিক্রয় বা হস্তান্তরের সুবিধার্থে শুরুতেই বণ্টননামা দলিল রেজিস্ট্রি করে নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ।
ভূমি সেবা ডিজিটাল হওয়ার ফলে এখন নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন হচ্ছে, যা সাধারণ মানুষের ভোগান্তি অনেকাংশেই কমিয়ে এনেছে।
নামজারি নিয়ে নতুন কি আইন আসছে?
নামজারি (Mutation) নিয়ে বর্তমানে বাংলাদেশ সরকার বেশ কিছু যুগান্তকারী পদক্ষেপ ও নতুন নীতিমালা কার্যকর করেছে। ২০২৫ এবং ২০২৬ সালের মধ্যে ভূমি ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসার কথা রয়েছে। নিচে নতুন আইনের প্রধান দিকগুলো তুলে ধরা হলো:
১. বন্টননামা ছাড়া যৌথ নামজারি (সবচেয়ে বড় পরিবর্তন)
ভূমি মন্ত্রণালয়ের নতুন পরিপত্র অনুযায়ী, উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত জমির ক্ষেত্রে এখন আর বন্টননামা দলিল থাকা বাধ্যতামূলক নয়।
যৌথ আবেদন: সকল ওয়ারিশ মিলে যদি একটি খতিয়ানে নাম তুলতে চান, তবে শুধু ওয়ারিশ সনদ দিয়েই নামজারি করা যাবে।
সুবিধা: এর ফলে পারিবারিক সমঝোতা না হওয়া পর্যন্ত নামজারি আটকে থাকবে না। তবে মনে রাখবেন, যদি প্রত্যেকে আলাদা আলাদা খতিয়ান (জমাভাগ) করতে চান, তবে আগের মতোই রেজিস্ট্রি করা বন্টননামা লাগবে।
২. অটোমেশন ও ই-নামজারি ২০২৬
২০২৬ সালের মধ্যে নামজারি প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণ ডিজিটাল বা ‘অটোমেশন’-এর আওতায় আনার কাজ চলছে।
স্মার্ট ভূমি সেবা: বর্তমানে অনলাইনে আবেদন করা গেলেও, নতুন ব্যবস্থায় আবেদনের পর সরকারি ডাটাবেজের সাথে দলিলাদি স্বয়ংক্রিয়ভাবে যাচাই হবে। এতে দালালের দৌরাত্ম্য এবং দুর্নীতি কমবে।
সময়সীমা: নামজারি সম্পন্ন করার জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা (২৮-৪৫ দিন) কঠোরভাবে মেনে চলার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
৩. ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৩-এর প্রভাব
এই নতুন আইনের কারণে নামজারি প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা বেড়েছে:
জাল দলিল বাতিল: যদি কোনো দলিল জাল বা ভুয়া প্রমাণিত হয়, তবে ওই দলিলের ভিত্তিতে করা নামজারি সরাসরি বাতিল হবে। অপরাধীর জেল ও জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে।
দখল যার জমি তার—এই নিয়ম বাতিল: এখন শুধু দখল থাকলেই নামজারি হবে না; উপযুক্ত দলিল এবং সঠিক মালিকানা থাকলেই কেবল নামজারি করা সম্ভব।
৪. নামজারি আবেদন আর খারিজ হবে না
সম্প্রতি সরকার একটি নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে, কোনো বৈধ ভূমি মালিকের নামজারি আবেদন সহজে বাতিল বা খারিজ করা যাবে না। নথিপত্রে কোনো ছোটখাটো ভুল থাকলে তা সংশোধনের সুযোগ দিতে হবে, কিন্তু ঢালাওভাবে আবেদন বাতিল করে দেওয়া যাবে না।
৫. বায়োমেট্রিক ও এনআইডি যাচাই
নামজারির ক্ষেত্রে এখন আবেদনকারীর জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) এবং ডাটাবেজে থাকা তথ্যের মিল থাকা বাধ্যতামূলক। এর ফলে একজনের জমি অন্যজন কৌশলে নামজারি করে নেওয়ার সুযোগ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।
সহজ কথায়: সরকার এখন নামজারি প্রক্রিয়াকে আরও সহজ এবং ডিজিটাল করছে যাতে সাধারণ মানুষ হয়রানির শিকার না হয়। বিশেষ করে ওয়ারিশি সম্পত্তির ক্ষেত্রে বন্টননামা ছাড়াই নামজারির সুযোগটি একটি বড় স্বস্তি।
