ভূমি বা জমিজমা সংক্রান্ত বিষয়ে আমাদের দেশে জটিলতার শেষ নেই। আর এই জটিলতার মূলে থাকে সঠিক তথ্যের অভাব। জমি কেনাবেচা, উত্তরাধিকার সূত্রে মালিকানা লাভ কিংবা খাজনা দেওয়ার মতো প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপে দুটি শব্দ সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়—’দাগ নম্বর’ এবং ‘খতিয়ান নম্বর’। ভূমি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জমিজমার হিসাব-নিকাশে এই দুটি হলো সবচেয়ে মৌলিক বিষয়। সহজ ভাষায় বলতে গেলে, দাগ নম্বর হলো জমির শারীরিক পরিচয়, আর খতিয়ান নম্বর হলো জমির মালিকানার দলিল।
নিচে জমির এই দুই অপরিহার্য উপাদানের বিস্তারিত তুলে ধরা হলো:
দাগ নম্বর: জমির শারীরিক সীমানা ও অবস্থান
একটি মৌজা বা গ্রামের মানচিত্রে (নকশা) প্রতিটি আলাদা জমির খণ্ডকে সুনির্দিষ্টভাবে চেনার জন্য যে নম্বর দেওয়া হয়, তাকেই দাগ নম্বর বলে। একটি বড় এলাকাকে যখন জরিপের মাধ্যমে ছোট ছোট খণ্ডে বিভক্ত করা হয়, তখন প্রতিটি খণ্ড বা প্লট একটি করে দাগ নম্বর পায়। নকশা বা ম্যাপে আপনার কাঙ্ক্ষিত জমিটি ঠিক কোথায় অবস্থিত এবং এর চারপাশের সীমানা কতটুকু, তা এই দাগ নম্বর দিয়েই নিশ্চিত করা হয়।
খতিয়ান নম্বর: মালিকানার আইনি রেকর্ড
দাগ নম্বর যেখানে জমির অবস্থান নির্দেশ করে, খতিয়ান নম্বর সেখানে জমির মালিকানার রেকর্ড বা স্বত্ব প্রকাশ করে। এক বা একাধিক দাগের জমি নিয়ে একজন বা একাধিক মালিকের নামে ভূমি প্রশাসন যে অফিসিয়াল হিসাবের বই বা রেকর্ড তৈরি করে, তাকেই খতিয়ান (Record of Rights বা সংক্ষেপে RoR) বলা হয়। এই খতিয়ান নম্বরের মাধ্যমেই জানা যায় ওই জমির প্রকৃত মালিক কে, তার অংশ বা হিস্যা কতটুকু এবং জমিটির শ্রেণী কী।
দাগ ও খতিয়ানের পারস্পরিক সম্পর্ক
ভূমি ব্যবস্থাপনায় এই দুটি নম্বর একে অপরের পরিপূরক। এদের সম্পর্কটি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, একটি খতিয়ানের অধীনে অনেকগুলো দাগ নম্বর থাকতে পারে।
যেমন: আপনার নামে করা একটি নির্দিষ্ট খতিয়ানে আপনার বসতবাড়ির জমি (দাগ নম্বর ১) এবং ফসলি জমি (দাগ নম্বর ২)—উভয়ই অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে। অর্থাৎ, মালিক একজনই কিন্তু তার জমি ভিন্ন ভিন্ন দাগে ছড়িয়ে থাকতে পারে।
জরিপ ভেদে নম্বরের পরিবর্তন: ক্রেতাদের জন্য বড় সতর্কতা
ভূমি জরিপ একটি চলমান প্রক্রিয়া। বাংলাদেশে সময় সময় বিভিন্ন ধরণের জরিপ হয়েছে। যেমন:
সিএস (CS): ক্যাডাস্ট্রাল সার্ভে (সবচেয়ে পুরোনো)
এসএ (SA): স্টেট অ্যাকুইজিশন সার্ভে
আরএস (RS): রিভিশনাল সার্ভে
বিএস/সিটি জরিপ (BS/City Survey): আধুনিক বা বর্তমান জরিপ
জরিপের ধরন এবং সময় অনুযায়ী একই জমির দাগ ও খতিয়ান নম্বর বদলে যেতে পারে। যেমন, সিএস জরিপে যে জমিটি ‘৫০’ নম্বর দাগে ছিল, আরএস বা বিএস জরিপে সেটি বিভক্ত হয়ে বা অন্য কোনো কারণে নতুন নম্বর পেতে পারে। তাই ভূমি বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, জমি কেনার সময় বা মালিকানা যাচাইয়ের সময় পূর্ববর্তী সব জরিপের (চেইন অব ডকুমেন্টস) দাগ ও খতিয়ান নম্বর মিলিয়ে দেখা অত্যন্ত জরুরি।
কেন এই দুটি নম্বর জানা বাধ্যতামূলক?
ভূমি অফিসে যেকোনো জমির যাবতীয় তথ্য, পর্চা (খতিয়ানের নকল) সংগ্রহ কিংবা নামজারি (মিউটেশন) করতে এই দুটি নম্বর ছাড়া এক কদমও এগোনো সম্ভব নয়।
জমি শনাক্তকরণে: দাগ নম্বর আপনাকে নিখুঁতভাবে জমিটি খুঁজে পেতে এবং এর সীমানা নির্ধারণে সাহায্য করে।
মালিকানা নিশ্চিতকরণে: খতিয়ান নম্বর আপনাকে আশ্বস্ত করে যে আপনি সঠিক ও বৈধ মালিকের কাছ থেকে জমিটি কিনছেন, যার ফলে প্রতারিত হওয়ার ঝুঁকি থাকে না।
পরিশেষে, জমিজমা সংক্রান্ত যেকোনো বড় সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে, কিংবা খাজনা (ভূমি উন্নয়ন কর) দেওয়ার সময় সঠিক দাগ ও খতিয়ান নম্বর জেনে নেওয়া প্রত্যেক নাগরিকের প্রধান দায়িত্ব। এই দুই নম্বরের সঠিক মেলবন্ধনই পারে আপনাকে যেকোনো ধরণের দীর্ঘমেয়াদী ভূমি বিরোধ বা আইনি জটিলতা থেকে মুক্ত রাখতে।
