আজকের খবর ২০২৬

স্বেচ্ছাশ্রম বা ব্যক্তি উদ্যোগে সরকারি খাল খনন এবং মাটি বিক্রির অনুমতি: ভূমি মন্ত্রণালয়ের নতুন পরিপত্র জারি

দেশব্যাপী খালের নাব্যতা ফিরিয়ে আনা, জলাবদ্ধতা দূরীকরণ এবং স্থানীয় পর্যায়ে মাটি ও বালুর চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে স্বেচ্ছাশ্রম বা ব্যক্তি উদ্যোগে সরকারি খাল খননের অনুমতি দিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিপত্র জারি করেছে ভূমি মন্ত্রণালয়। গত ১১ মে ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দ (২৮ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ) তারিখে ভূমি মন্ত্রণালয়ের সায়রাত-২ শাখা থেকে এই পরিপত্রটি প্রকাশ করা হয়।

সিনিয়র সচিব এ এস এম সালেহ্ আহমেদ স্বাক্ষরিত এই পরিপত্রে স্থানীয় পর্যায়ে সরকারি খাল পুনঃখনন প্রক্রিয়া সহজ করতে এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে ৯টি সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা (ক থেকে ঝ) প্রদান করা হয়েছে।

কেন এই উদ্যোগ?

পরিপত্রে বলা হয়েছে, দেশব্যাপী খাল খনন সরকারের অগ্রাধিকার কর্মসূচির অংশ। দীর্ঘ সময় খনন না করায় এবং কিছু অংশ বেদখল হওয়ার কারণে দেশের অধিকাংশ খাল ভরাট হয়ে নাব্যতা হারাচ্ছে। এর ফলে সৃষ্টি হচ্ছে কৃত্রিম জলাবদ্ধতা, যা জনজীবনে দুর্ভোগ বাড়াচ্ছে।

পাশাপাশি, ইটভাটা, উন্নয়ন কার্যক্রম, সড়ক নির্মাণ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মাঠ ভরাট এবং কবরস্থান ও ঈদগাহের সংস্কারের কাজে স্থানীয়ভাবে মাটি ও বালুর ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। এই দুটি বিষয়কে সমন্বয় করে, জনসাধারণের সুবিধার্থে সম্পূর্ণ নিজস্ব খরচে স্বেচ্ছাশ্রম বা ব্যক্তি উদ্যোগে খাল থেকে মাটি ও বালি অপসারণের সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে সরকার।

পরিপত্রের মূল নির্দেশনাসমূহ:

  • আবেদন আহ্বান: উপজেলা নির্বাহী অফিসার (UNO) খালের মাটি ও বালি (ড্রেজ মেটেরিয়াল) অপসারণের জন্য আগ্রহী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে আবেদন আহ্বান করবেন।

  • যৌথ প্রাক্কলন (Estimate) তৈরি: আবেদন আহ্বানের আগেই উপজেলা প্রকৌশলী, উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (PIO) এবং সার্ভেয়ারের সমন্বয়ে খালের খননযোগ্য দৈর্ঘ্য, প্রস্থ, গভীরতা এবং মোট ঘনফুট মাটির পরিমাণ নির্ধারণ করে একটি প্রাক্কলন প্রস্তুত করতে হবে।

  • খননকারী নির্বাচন ও লটারি: প্রাক্কলন অনুযায়ী আগ্রহী একাধিক ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান আবেদন করলে আলোচনার মাধ্যমে বা লটারির সাহায্যে খননকারী নির্বাচন করা হবে। বড় খালের ক্ষেত্রে সেকশন বা অংশ ভাগ করে একাধিক আবেদনকারীকে দায়িত্ব দেওয়া যাবে।

  • বিনামূল্যে মাটি ব্যবহারের সুযোগ: খননকারী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান উত্তোলিত মাটি ও বালি সম্পূর্ণ বিনামূল্যে নিজেদের প্রয়োজনে ব্যবহার বা বিক্রয় করতে পারবেন। এজন্য সরকার, উপজেলা পরিষদ বা অন্য কোনো সংস্থাকে কোনো মূল্য পরিশোধ করতে হবে না।

  • নিরাপদ দূরত্ব ও প্রত্যয়ন: খননকৃত মাটি বা বালি খালের তীর থেকে অন্তত ১০ মিটার দূরে সরিয়ে নিতে হবে। নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করে উপজেলা কর্তৃপক্ষ থেকে প্রত্যয়নপত্র গ্রহণ করা বাধ্যতামূলক।

  • ক্ষতিপূরণ ও বিরোধ নিষ্পত্তি: অনুমোদিত প্রাক্কলনের বাইরে গিয়ে খনন করার ফলে যদি পার্শ্ববর্তী কোনো সম্পত্তির ক্ষতি হয়, তবে সংশ্লিষ্ট খননকারীকে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। কোনো বিরোধ সৃষ্টি হলে ইউএনও (UNO) এর সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত বলে গণ্য হবে।

  • তদারকি: উপজেলা কানুনগো, সার্ভেয়ার বা সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন ভূমি কর্মকর্তা মাঠ পর্যায়ে খনন কাজ সঠিকভাবে হচ্ছে কিনা তা নিয়মিত তদারকি করবেন।

  • ব্যতিক্রম: সরকারি কোনো সংস্থা কর্তৃক ইতিমধ্যে খননের জন্য নির্ধারিত বা চলমান কোনো উন্নয়ন প্রকল্পের আওতাভুক্ত খাল এই নির্দেশনার বাইরে থাকবে।

অবিলম্বে কার্যকর করার নির্দেশ

জনস্বার্থে জারিকৃত এই নির্দেশনাটি অবিলম্বে কার্যকর করার জন্য দেশের সকল বিভাগীয় কমিশনার এবং জেলা প্রশাসকদের (ডিসি) অনুলিপি পাঠানো হয়েছে। এছাড়া মন্ত্রিপরিষদ সচিব, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য মন্ত্রণালয়ের সচিবদেরও এই পরিপত্রের বিষয়ে অবহিত করা হয়েছে।

ভূমি মন্ত্রণালয়ের এই যুগান্তকারী সিদ্ধান্তের ফলে একদিকে যেমন সরকারের কোনো অর্থ ব্যয় ছাড়াই স্থানীয় খালের নাব্যতা ফিরে আসবে, অন্যদিকে গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন ও আবাসন খাতের জন্য প্রয়োজনীয় মাটি ও বালুর সংকট অনেকাংশে দূর হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

সোর্স

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *