জমি ও স্থাবর সম্পত্তি হস্তান্তরের ক্ষেত্রে ২০২৬ সালে গুরুত্বপূর্ণ একটি আইনি পরিবর্তন এসেছে। ১৮৮২ সালের Transfer of Property Act সংশোধনের জন্য আনা ‘ট্রান্সফার অব প্রপার্টি (সংশোধন) বিল-২০২৬’ জাতীয় সংসদে ৬ সেপ্টেম্বর পাস হয়েছে। নতুন ব্যবস্থায় বাবা-মা, দাদা-দাদি বা নানা-নানি সন্তান বা নাতি-নাতনিকে সম্পত্তি দান করার পরও দাতা জীবিত থাকা পর্যন্ত সেই সম্পত্তি ভোগদখলের অধিকার রাখতে পারবেন। একই ধরনের জীবনকালীন ভোগাধিকার স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সম্পত্তি দানের ক্ষেত্রেও রাখা হয়েছে।
এ পরিবর্তনের পাশাপাশি ২০২৬-২৭ অর্থবছর থেকে হেবা বা দান দলিলের করসংক্রান্ত ব্যবস্থাতেও পরিবর্তন এসেছে। ফলে জমি দান, হেবা, দলিল নিবন্ধন এবং পরবর্তী নামজারির ক্ষেত্রে জমির মালিকদের জন্য নতুন বিষয়গুলো জানা গুরুত্বপূর্ণ।
দান করলেই কি দাতা জমির দখল হারাবেন?
নতুন সংশোধনের সবচেয়ে আলোচিত বিষয় এটি। এতদিন কোনো ব্যক্তি সন্তান বা অন্য কাউকে সম্পত্তি দান করলে দাতার জীবদ্দশায় সেই সম্পত্তি ব্যবহারের অধিকার কীভাবে সংরক্ষিত থাকবে—এ বিষয়ে আইনে স্পষ্ট পৃথক ব্যবস্থা ছিল না। নতুন সংশোধনের উদ্দেশ্য হলো জীবনকালীন ভোগাধিকার সংরক্ষণ করে সম্পত্তি দানের একটি স্বতন্ত্র আইনি কাঠামো তৈরি করা।
অর্থাৎ, নির্দিষ্ট শর্তে এমনভাবে সম্পত্তি দান করা সম্ভব হবে যাতে মালিকানা হস্তান্তরের পাশাপাশি দাতার জীবদ্দশার ভোগাধিকারও সংরক্ষিত থাকে।
উদাহরণ হিসেবে ধরা যাক, একজন বাবা তাঁর বাড়ি বা জমি ছেলেকে দান করলেন। নতুন ব্যবস্থার আওতায় দলিলের কাঠামো অনুযায়ী বাবা জীবিত থাকা পর্যন্ত ওই সম্পত্তিতে বসবাস বা ভোগদখল করতে পারবেন। একইভাবে মা তাঁর সন্তানকে সম্পত্তি দান করলেও জীবনকালীন ভোগাধিকার সংরক্ষণের সুযোগ থাকবে।
দাদা-দাদি বা নানা-নানির ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য
বিষয়টি শুধু বাবা-মায়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সংসদে পাস হওয়া বিলের বর্ণনা অনুযায়ী, দাদা-দাদি কিংবা নানা-নানি নাতি-নাতনিকে সম্পত্তি দান করলেও দাতার জীবদ্দশায় ভোগাধিকার সংরক্ষণের সুযোগ থাকবে। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যেও দানের ক্ষেত্রে একই ধরনের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
এ কারণে নতুন আইনটি বিশেষ করে বয়স্ক সম্পত্তির মালিকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কেউ জীবিত অবস্থায় সন্তানকে সম্পত্তি দিয়ে দিতে চান, কিন্তু নিজের জীবনকালে বাড়ি বা জমি ব্যবহারের অধিকারও রাখতে চান—নতুন বিধান সেই বিষয়টি আইনগতভাবে কাভার করার উদ্দেশ্যে আনা হয়েছে।
গ্রহীতা আগে মারা গেলে কী হবে?
নতুন বিধানের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—দাতা জীবিত থাকা অবস্থায় গ্রহীতা মারা গেলেও দাতার জীবনকালীন ভোগাধিকার বজায় থাকবে।
এরপর গ্রহীতার মৃত্যুর পর সম্পত্তি কীভাবে উত্তরাধিকারীদের কাছে যাবে, তা প্রচলিত উত্তরাধিকার আইনের বিধান অনুযায়ী নির্ধারিত হবে। অর্থাৎ দাতা জীবিত থাকা অবস্থায় গ্রহীতা মারা গেলেই দাতার সংরক্ষিত ভোগাধিকার স্বয়ংক্রিয়ভাবে শেষ হয়ে যাবে না।
হেবা দলিলের ক্ষেত্রে কী পরিবর্তন?
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আলাদা করে বোঝা দরকার।
নতুন সংশোধনের কারণে মুসলিম আইনের অধীনে প্রচলিত হেবা ব্যবস্থা বাতিল বা নিষিদ্ধ হয়নি। সংসদে উপস্থাপিত ব্যাখ্যা অনুযায়ী, নতুন বিধান সাধারণ দান, মুসলিম আইনের অধীনে হেবা কিংবা আইনস্বীকৃত অন্যান্য সম্পত্তি হস্তান্তর পদ্ধতির ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলবে না।
অর্থাৎ ‘দান দলিল’ এবং ‘হেবা’কে একই জিনিস ধরে নেওয়া ঠিক হবে না। কোনো সম্পত্তি হস্তান্তরের ক্ষেত্রে কোন ধরনের দলিল প্রযোজ্য হবে, তার ওপর নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির আইনগত অবস্থা, সম্পত্তির ধরন এবং হস্তান্তরের উদ্দেশ্য।
২০২৬ সালে দান/হেবা দলিলে করের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ
২০২৬-২৭ অর্থবছরের কর কাঠামোয় সম্পত্তির হেবা বা দান দলিল নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, সম্পত্তির হেবা (দান) দলিল নিবন্ধনের ক্ষেত্রে উৎসে কর নয়, প্রযোজ্য ক্ষেত্রে দানকর বিবেচ্য হবে।
অন্যদিকে ২০২৬ সালের উৎসে কর বিধিমালা ১ জুলাই ২০২৬ থেকে কার্যকর হয়েছে এবং সম্পত্তি নিবন্ধনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট করসংক্রান্ত বিধান এতে রয়েছে।
তাই জমি বা বাড়ি দান করার আগে শুধু দলিল লেখকের কাছ থেকে আনুমানিক খরচ জেনে নেওয়া যথেষ্ট নয়। সংশ্লিষ্ট সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে প্রযোজ্য রেজিস্ট্রেশন ফি, কর, দানকর এবং অন্যান্য সরকারি ফি সম্পর্কে হালনাগাদ তথ্য নেওয়া উচিত।
নামজারিতে কী হবে?
দান বা হেবা দলিল নিবন্ধনের পর জমির রেকর্ডে পরিবর্তন আনতে নামজারি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।
সহজভাবে প্রক্রিয়াটি হতে পারে—
দান/হেবা দলিল → নিবন্ধন → দলিলের ভিত্তিতে নামজারি আবেদন → ভূমি অফিসে যাচাই → নামজারি খতিয়ান → ভূমি উন্নয়ন করের রেকর্ড হালনাগাদ।
শুধু রেজিস্ট্রি দলিল হাতে থাকলেই ভূমি রেকর্ডের সব কাজ সম্পন্ন হয়েছে—এমনটি ধরে নেওয়া ঠিক নয়।
এদিকে ভূমি ব্যবস্থাপনায় ডিজিটাল রূপান্তরের কাজও চলছে। ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে ভূমি ব্যবস্থাপনা অটোমেশন, ডিজিটাল জরিপ, জাতীয় ডিজিটাল ভূমি জোনিং এবং ডিজিটাল ভূমি ব্যবস্থাপনা নিয়ে চলমান প্রকল্পগুলো পর্যালোচনা করা হয়েছে। একই বৈঠকে ভূমি-সেবা আরও দ্রুত করার জন্য মাঠপর্যায়ে জনবল বাড়ানোর বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়।
নামজারি কি এখন বাধ্যতামূলকভাবে নতুন নিয়মে হবে?
এখানে সতর্ক থাকা প্রয়োজন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেক সময় বলা হচ্ছে, ‘২০২৬ সালের নতুন ভূমি আইনে নামজারির সম্পূর্ণ নিয়ম বদলে গেছে’। বাস্তবে বিষয়টি এত সরল নয়।
২০২৬ সালে ভূমি ব্যবস্থাপনায় নতুন আইন, সংশোধনী, বিধিমালা ও প্রশাসনিক নির্দেশনা—বিভিন্ন স্তরে পরিবর্তন এসেছে। তাই কোনো একটি ফেসবুক পোস্ট বা ভিডিও দেখে নামজারি, উত্তরাধিকার কিংবা দান দলিলের নিয়ম নির্ধারণ করা উচিত নয়।
বিশেষ করে জমির ক্ষেত্রে সিএস/এসএ/আরএস/বিএস খতিয়ান, দলিল, ওয়ারিশ, দখল, ভূমি উন্নয়ন কর এবং পূর্ববর্তী নামজারি—সবকিছু মিলিয়ে পরিস্থিতি যাচাই করতে হয়।
নতুন ব্যবস্থায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য
বিষয়টি একটি উদাহরণে বোঝা যায়।
ধরা যাক, একজন মা তাঁর বাড়ি মেয়েকে দান করলেন।
আগের সাধারণ পরিস্থিতি:
দান সম্পন্ন হওয়ার পর সম্পত্তির ব্যবহার ও দখল নিয়ে ভবিষ্যতে বিরোধ তৈরি হলে দলিলের ভাষা, প্রযোজ্য আইন এবং অন্যান্য নথি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠত।
নতুন জীবনকালীন ভোগাধিকার ব্যবস্থায়:
দলিলের শর্ত অনুযায়ী মা জীবিত থাকা পর্যন্ত সম্পত্তি ভোগ করার অধিকার সংরক্ষণ করতে পারবেন। অর্থাৎ দান করার পরও দাতার জীবনকালীন ব্যবহার/ভোগের বিষয়টি আইনি কাঠামোর মধ্যে আনার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
তবে মালিকানা ও ভোগাধিকার এক বিষয় নয়
এটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা।
মালিকানা (ownership) এবং ভোগাধিকার (usufruct/use or enjoyment right) একই জিনিস নয়।
কেউ সম্পত্তি অন্যের নামে হস্তান্তর করলেও নির্দিষ্ট আইনগত কাঠামোর মাধ্যমে নিজের জীবদ্দশায় সেটি ভোগ করার অধিকার সংরক্ষণ করতে পারেন। ফলে দলিলে কী লেখা হয়েছে, কী ধরনের হস্তান্তর করা হয়েছে এবং আইন অনুযায়ী তার প্রভাব কী—এসব বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তাই ‘দান করলাম, কিন্তু জমির মালিক আমিই থাকব’—এভাবে সরলীকরণ করা ঠিক হবে না। বরং বলা যায়, নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে দান সম্পন্ন করেও দাতার জীবনকালীন ভোগাধিকার সংরক্ষণের আইনি সুযোগ তৈরি হয়েছে।
দাতার জন্য কী সুবিধা হতে পারে?
নতুন ব্যবস্থার মূল উদ্দেশ্যের মধ্যে রয়েছে এমন একটি পরিস্থিতির সমাধান করা, যেখানে একজন বয়স্ক ব্যক্তি জীবদ্দশায় সন্তান বা নাতি-নাতনিকে সম্পত্তি দিতে চান, কিন্তু নিজের বসবাস বা ভোগের নিরাপত্তাও রাখতে চান।
এতে বিশেষ করে—
- বাবা-মায়ের জীবদ্দশায় বাড়ি ব্যবহারের অধিকার সংরক্ষণ,
- দাদা-দাদি বা নানা-নানির নাতি-নাতনিকে সম্পত্তি দেওয়ার ক্ষেত্রে জীবনকালীন ভোগাধিকার,
- স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে দানের ক্ষেত্রে দাতার ভোগাধিকার,
- গ্রহীতা আগে মারা গেলে দাতার সংরক্ষিত ভোগাধিকারের ধারাবাহিকতা
আইনের আওতায় আনার চেষ্টা করা হয়েছে।
উত্তরাধিকার নিয়ে কেন আলোচনা তৈরি হয়েছে?
বিলটি সংসদে পাস হওয়ার আগে এর কিছু বিধান নিয়ে আপত্তিও উত্থাপিত হয়েছে। সমালোচকদের একটি অংশের আশঙ্কা, দাতার দীর্ঘমেয়াদি ভোগাধিকার এবং পরবর্তী উত্তরাধিকার নির্ধারণের বিষয়টি ভবিষ্যতে কিছু ক্ষেত্রে জটিলতা তৈরি করতে পারে। অন্যদিকে বিলের পক্ষে সরকারি বক্তব্য হলো, এটি দাতার জীবনকালীন ভোগাধিকারকে স্পষ্ট আইনি স্বীকৃতি দেওয়ার উদ্দেশ্যে করা হয়েছে এবং প্রচলিত হেবা বা উত্তরাধিকার ব্যবস্থাকে সরাসরি বাতিল করার উদ্দেশ্য এতে নেই।
অর্থাৎ বিষয়টি নিয়ে আইনের নির্দিষ্ট ভাষা ও বাস্তব প্রয়োগ গুরুত্বপূর্ণ হবে।
জমি দান করার আগে যেসব বিষয় যাচাই করবেন
২০২৬ সালের পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে জমি বা বাড়ি দান করার আগে কয়েকটি বিষয় বিশেষভাবে দেখা জরুরি—
১. জমির বর্তমান খতিয়ান ও রেকর্ড কার নামে।
২. দাতার মালিকানার বৈধ উৎস কী।
৩. পূর্বে কোনো বায়না, বন্ধক, মামলা বা নিষেধাজ্ঞা আছে কি না।
৪. জমির ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধ করা হয়েছে কি না।
৫. দান নাকি হেবা—কোন পদ্ধতিতে হস্তান্তর করা হবে।
৬. দাতা জীবদ্দশায় ভোগাধিকার রাখতে চাইলে দলিলে সেটি কীভাবে আইনি কাঠামোয় লেখা হবে।
৭. প্রযোজ্য দানকর, নিবন্ধন ফি ও অন্যান্য সরকারি ফি কত।
৮. নিবন্ধনের পর নামজারি করা হয়েছে কি না।
৯. নামজারির পর ভূমি উন্নয়ন করের রেকর্ড হালনাগাদ হয়েছে কি না।
১০. একাধিক উত্তরাধিকারী থাকলে ভবিষ্যতে বিরোধের সম্ভাবনা আছে কি না।
শেষ কথা
২০২৬ সালের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনগুলোর একটি হলো সম্পত্তি দানের সঙ্গে দাতার জীবনকালীন ভোগাধিকারকে স্পষ্ট আইনি কাঠামোর মধ্যে আনার উদ্যোগ, যা ৬ সেপ্টেম্বর সংসদে পাস হওয়া সংশোধনী বিলে স্থান পেয়েছে। এর ফলে বাবা-মা বা অন্যান্য নির্দিষ্ট দাতা সন্তান, নাতি-নাতনি কিংবা স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সম্পত্তি হস্তান্তর করলেও নির্দিষ্ট শর্তে জীবিত থাকা পর্যন্ত সম্পত্তি ভোগ করার অধিকার সংরক্ষণ করতে পারবেন।
তবে এটিকে ‘সব দান দলিল বাতিল’, ‘হেবা বন্ধ’, ‘নামজারি বন্ধ’ বা ‘উত্তরাধিকার আইন পরিবর্তন’ হিসেবে প্রচার করা সঠিক হবে না। নতুন বিধানের মূল বিষয় হলো জীবনকালীন ভোগাধিকার সংরক্ষণ করে সম্পত্তি হস্তান্তরের আইনি স্বীকৃতি। আর দান বা হেবা দলিলের ক্ষেত্রে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের করব্যবস্থাও বিবেচনায় নিতে হবে।
নোট: এটি সাধারণ তথ্যভিত্তিক প্রতিবেদন। নির্দিষ্ট জমি দান, হেবা, নামজারি বা উত্তরাধিকার সংক্রান্ত মামলায় দলিল ও খতিয়ানের তথ্য দেখে ভূমি আইনজীবী/সংশ্লিষ্ট রেজিস্ট্রি ও ভূমি অফিসের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

