বাংলাদেশে সরকারি চাকরিজীবীদের বদলিজনিত কারণে এক জেলা থেকে অন্য জেলায় কর্মস্থল পরিবর্তন করা একটি স্বাভাবিক বিষয়। তবে পাসপোর্টের আবেদন করতে গিয়ে অনেকেই স্থায়ী ঠিকানা, বর্তমান ঠিকানা, কর্মস্থল এবং অনাপত্তি সনদ (এনওসি) নিয়ে জটিলতার মুখে পড়েন। বিশেষ করে, জাতীয় পরিচয়পত্র ও অন্যান্য সনদে এক জেলার ঠিকানা থাকলেও বর্তমানে অন্য জেলায় কর্মরত থাকলে কোন পাসপোর্ট অফিসে আবেদন করতে হবে, তা নিয়ে তৈরি হয় নানা প্রশ্ন।
সম্প্রতি এমনই একটি ঘটনা সামনে এসেছে। খুলনা জেলার স্থায়ী বাসিন্দা একজন সরকারি চাকরিজীবী বদলির কারণে বর্তমানে বাগেরহাটে কর্মরত রয়েছেন। চিকিৎসার প্রয়োজনে তাঁর পাসপোর্ট প্রয়োজন হওয়ায় কর্মস্থলের কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে এনওসি সংগ্রহ করেন তিনি। এরপর নিজ জেলা খুলনা থেকে পাসপোর্ট করার উদ্দেশ্যে অনলাইনে আবেদন করে সংশ্লিষ্ট অফিসে কাগজপত্র জমা দিতে গেলে তাঁকে বাগেরহাটে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেওয়া হয়।
এ ঘটনা ঘিরে প্রশ্ন উঠেছে—স্থায়ী ঠিকানা খুলনায় হলেও কর্মস্থল বাগেরহাট হলে পাসপোর্ট কোথা থেকে করতে হবে? বাগেরহাটের কর্তৃপক্ষের দেওয়া এনওসি দিয়ে কি খুলনা থেকে আবেদন করা সম্ভব?
এনআইডি ও শিক্ষাগত সনদে খুলনার ঠিকানা
আবেদনকারীর বক্তব্য অনুযায়ী, তাঁর জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি), জন্মনিবন্ধন ও শিক্ষাগত সনদসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ নথিতে খুলনার ঠিকানা উল্লেখ রয়েছে। এমনকি তাঁর চাকরিজীবনের শুরুও হয়েছিল খুলনায়। পরবর্তী সময়ে বদলির কারণে তাঁকে বাগেরহাটে কর্মস্থল পরিবর্তন করতে হয়।
এ অবস্থায় তাঁর ধারণা ছিল, যেহেতু সব গুরুত্বপূর্ণ নথিতে খুলনার ঠিকানা রয়েছে এবং তিনি খুলনার স্থায়ী বাসিন্দা, তাই নিজ জেলা থেকেই পাসপোর্টের আবেদন করতে পারবেন। কিন্তু আবেদন জমা দিতে গিয়ে ভিন্ন পরামর্শ পাওয়ায় বিষয়টি নিয়ে বিভ্রান্তিতে পড়েন তিনি।
বাস্তবে পাসপোর্ট আবেদনের ক্ষেত্রে স্থায়ী ঠিকানা গুরুত্বপূর্ণ হলেও কেবল স্থায়ী ঠিকানার ভিত্তিতে সব সময় পছন্দের পাসপোর্ট অফিস নির্বাচন করা যায় না। আবেদনকারীর বর্তমান ঠিকানা, সংশ্লিষ্ট অফিসের অধিক্ষেত্র এবং আবেদনে দেওয়া তথ্যও বিবেচ্য।
পাসপোর্ট আবেদনে স্থায়ী ঠিকানা নাকি বর্তমান ঠিকানা গুরুত্বপূর্ণ?
পাসপোর্টের আবেদন করার সময় স্থায়ী ও বর্তমান ঠিকানার তথ্য আলাদাভাবে দিতে হয়। স্থায়ী ঠিকানা বলতে আবেদনকারীর স্থায়ীভাবে সংশ্লিষ্ট ঠিকানার পরিচয় বোঝায়। অন্যদিকে, বর্তমান ঠিকানা হলো তিনি বর্তমানে যেখানে বসবাস করছেন সেই ঠিকানা।
কোনো ব্যক্তি খুলনার স্থায়ী বাসিন্দা হলেও চাকরির কারণে বাগেরহাটে বসবাস করতে পারেন। সে ক্ষেত্রে তাঁর স্থায়ী ঠিকানা খুলনা এবং বর্তমান ঠিকানা বাগেরহাট হওয়া স্বাভাবিক। তবে কেউ শুধু বাগেরহাটে চাকরি করেন বলেই তাঁর বর্তমান ঠিকানা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাগেরহাট হয়ে যায় না; বাস্তবে কোথায় বসবাস করছেন, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।
সাধারণভাবে দেশের ভেতরে পাসপোর্টের আবেদন সংশ্লিষ্ট বর্তমান ঠিকানার অধিক্ষেত্রভুক্ত পাসপোর্ট অফিসে জমা দেওয়ার নিয়ম অনুসরণ করা হয়। তাই অনলাইন আবেদন করার সময় বর্তমান ঠিকানার জেলা ও সংশ্লিষ্ট অফিস নির্বাচন করার বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য এনওসির ভূমিকা কী?
সরকারি চাকরিজীবীদের পাসপোর্ট আবেদনে অনাপত্তি সনদ বা এনওসি একটি গুরুত্বপূর্ণ নথি। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন অনুযায়ী পাসপোর্ট করার ক্ষেত্রে এ সনদ প্রয়োজন হতে পারে।
আলোচ্য ঘটনায় আবেদনকারী বাগেরহাটে কর্মরত অবস্থায় তাঁর কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে এনওসি পেয়েছেন। তবে এনওসি ইস্যু করা এবং নির্দিষ্ট পাসপোর্ট অফিসে আবেদন জমা দেওয়ার অনুমতি—এ দুটি বিষয় এক নয়।
অর্থাৎ, বাগেরহাটের কর্তৃপক্ষ এনওসি দিয়েছে বলেই আবেদনকারীকে অবশ্যই বাগেরহাট থেকে পাসপোর্ট করতে হবে, এমন সিদ্ধান্ত শুধু এই তথ্যের ভিত্তিতে দেওয়া যায় না। একইভাবে, এনওসি হাতে থাকলেই খুলনা থেকে আবেদন গ্রহণ করা বাধ্যতামূলক—এমনটিও বলা যায় না। সংশ্লিষ্ট পাসপোর্ট অফিসের অধিক্ষেত্র এবং প্রযোজ্য সরকারি নির্দেশনা অনুসারে বিষয়টি নির্ধারিত হবে।
খুলনা থেকে পাসপোর্ট করার সুযোগ আছে কি?
আবেদনকারীর স্থায়ী ঠিকানা খুলনায় হওয়ায় খুলনা থেকেই আবেদন করতে পারবেন কি না, সেটি তাঁর বর্তমান বসবাসের ঠিকানা ও সংশ্লিষ্ট অফিসের নিয়মের ওপর নির্ভর করবে।
যদি তিনি বাস্তবে বাগেরহাটে বসবাস করেন এবং তাঁর বর্তমান ঠিকানা বাগেরহাট হয়, তাহলে বাগেরহাটের সংশ্লিষ্ট পাসপোর্ট অফিসে আবেদন করাই সাধারণ নিয়মের সঙ্গে বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ।
অন্যদিকে, তিনি যদি বাস্তবে খুলনায় বসবাস করেন এবং বাগেরহাটে শুধু চাকরির দায়িত্ব পালন করেন, তাহলে খুলনা পাসপোর্ট অফিসে আবেদন গ্রহণ করা সম্ভব কি না, তা সংশ্লিষ্ট অফিসের কাছে যাচাই করা উচিত।
এ ক্ষেত্রে স্থায়ী ঠিকানা খুলনায় থাকার বিষয়টি উল্লেখ করে এবং কর্মস্থল বাগেরহাটে হওয়ার বিষয়টি ব্যাখ্যা করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিতভাবে জানতে চাওয়া যেতে পারে। প্রয়োজন হলে ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট দপ্তর থেকেও নির্দেশনা নেওয়া যেতে পারে।
অনলাইনে আবেদন করার সময় যেসব বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে
পাসপোর্টের আবেদন করার সময় ঠিকানা-সংক্রান্ত ভুল বা অসামঞ্জস্য এড়াতে কয়েকটি বিষয় মনে রাখা প্রয়োজন।
প্রথমত, বর্তমান ঠিকানা সঠিকভাবে উল্লেখ করতে হবে। আবেদনকারী যেখানে বাস্তবে বসবাস করেন, সেই ঠিকানার তথ্য দিতে হবে। শুধু পছন্দের পাসপোর্ট অফিসে আবেদন করার উদ্দেশ্যে ভিন্ন ঠিকানা দেওয়া উচিত নয়।
দ্বিতীয়ত, স্থায়ী ঠিকানা ও বর্তমান ঠিকানা আলাদাভাবে যাচাই করতে হবে। এনআইডি বা অন্যান্য নথিতে স্থায়ী ঠিকানা খুলনায় থাকলেও বর্তমান ঠিকানা ভিন্ন হতে পারে। আবেদনে দুটি ঠিকানা যথাযথভাবে উল্লেখ করা জরুরি।
তৃতীয়ত, এনওসির তথ্য যাচাই করতে হবে। এনওসিতে আবেদনকারীর পরিচয়, পদবি, কর্মস্থল এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় তথ্য সঠিক রয়েছে কি না, তা নিশ্চিত করা উচিত।
চতুর্থত, অফিস নির্বাচন করার আগে নিশ্চিত হতে হবে। অনলাইন আবেদন জমা দেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট পাসপোর্ট অফিসের অধিক্ষেত্র সম্পর্কে জেনে নেওয়া ভালো। এতে আবেদন জমা দিতে গিয়ে এক অফিস থেকে অন্য অফিসে যাওয়ার ভোগান্তি কমতে পারে।
চিকিৎসার প্রয়োজনে পাসপোর্ট প্রয়োজন হলে কী করবেন?
আলোচ্য আবেদনকারী চিকিৎসার প্রয়োজনে পাসপোর্ট করতে চান। এ ধরনের পরিস্থিতিতে অযথা সময় নষ্ট না করে প্রথমেই সংশ্লিষ্ট পাসপোর্ট অফিসের কাছে আবেদন গ্রহণের বিষয়ে পরিষ্কার নির্দেশনা নেওয়া প্রয়োজন।
এনওসি, জাতীয় পরিচয়পত্র, অনলাইন আবেদনের কপি এবং প্রযোজ্য অন্যান্য নথি প্রস্তুত রাখতে হবে। চিকিৎসাসংক্রান্ত কাগজপত্র প্রয়োজন অনুযায়ী সঙ্গে রাখা যেতে পারে। তবে চিকিৎসার প্রয়োজন থাকলেই ঠিকানা বা অফিস নির্বাচনের সাধারণ নিয়ম স্বয়ংক্রিয়ভাবে পরিবর্তিত হবে—এমন ধারণা করা ঠিক নয়।
পাসপোর্ট অফিস আবেদন গ্রহণ না করলে, কেন গ্রহণ করা হচ্ছে না এবং কোন অফিসে আবেদন জমা দিতে হবে, তা স্পষ্টভাবে জেনে নেওয়া উচিত। প্রয়োজনে ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তরের সরকারি পোর্টাল epassport.gov.bd থেকে তথ্য যাচাই করা যেতে পারে।
শেষ কথা
খুলনার স্থায়ী বাসিন্দা হয়েও বাগেরহাটে কর্মরত সরকারি চাকরিজীবীর পাসপোর্ট কোথা থেকে হবে, তা নির্ধারণে শুধু এনআইডির ঠিকানা কিংবা এনওসি কোন জেলা থেকে দেওয়া হয়েছে—এ দুটি বিষয়ই চূড়ান্ত নয়। আবেদনকারীর প্রকৃত বর্তমান ঠিকানা, সংশ্লিষ্ট পাসপোর্ট অফিসের অধিক্ষেত্র এবং প্রযোজ্য সরকারি নির্দেশনা একসঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।
আবেদনকারী বর্তমানে বাগেরহাটে বসবাস করলে বাগেরহাটের সংশ্লিষ্ট পাসপোর্ট অফিসে আবেদন করাই সাধারণত বেশি যুক্তিযুক্ত। তবে তিনি বাস্তবে খুলনায় বসবাস করলে এবং খুলনা অফিসের অধিক্ষেত্রের মধ্যে আবেদন গ্রহণযোগ্য হলে পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারে।
সুতরাং, পাসপোর্ট করতে গিয়ে ভোগান্তি এড়ানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো—অনলাইনে আবেদন করার আগে বর্তমান ঠিকানা ও সংশ্লিষ্ট অফিস নিশ্চিত করা এবং প্রয়োজনে পাসপোর্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে স্পষ্ট নির্দেশনা নেওয়া।

