অনলাইন দলিল রেজিস্ট্রেশন

মালিক মারা গেলে ‘পাওয়ার অফ অ্যাটর্নি’ বাতিল: মৃত ব্যক্তির পাওয়ারে জমি কেনা হতে পারে বড় বিপদ

জমি কেনাবেচার ক্ষেত্রে ‘পাওয়ার অফ অ্যাটর্নি’ বা আমমোক্তারনামা একটি প্রচলিত পদ্ধতি। কিন্তু সাধারণ মানুষের মধ্যে একটি বড় ভুল ধারণা রয়েছে যে—মালিকের কাছ থেকে একবার পাওয়ার পেয়ে গেলে তিনি বেঁচে থাকুক বা মারা যান, জমি বিক্রি করতে কোনো বাধা নেই। দেশের বিদ্যমান আইন বলছে ভিন্ন কথা। মূল মালিকের মৃত্যুর পর তার দেওয়া পাওয়ার অফ অ্যাটর্নি ব্যবহার করে জমি বিক্রি করা সম্পূর্ণ অবৈধ এবং দণ্ডনীয় অপরাধ।

আইন কী বলে?

পাওয়ার অফ অ্যাটর্নি কোনো স্থায়ী মালিকানা নয়; এটি মূলত একটি নির্দিষ্ট কাজ করার ‘অনুমতি’ বা ‘লাইসেন্স’ মাত্র। আমমোক্তারনামা আইন অনুযায়ী:

  • যিনি পাওয়ার দিয়েছেন (দাতা) তিনি যদি মারা যান, তবে ওই পাওয়ারটি মুহূর্তেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল (Cancel) হয়ে যায়।

  • দাতা যদি স্বেচ্ছায় পাওয়ার প্রত্যাহার বা বাতিল করেন, তাহলেও সেটির কোনো কার্যকারিতা থাকে না।

সহজ কথায়, মৃত ব্যক্তির আত্মা যেমন দেহ ত্যাগ করে, তেমনি দাতার মৃত্যুর সাথে সাথে তার দেওয়া পাওয়ারের আইনি প্রাণও শেষ হয়ে যায়।

ক্রেতার জন্য চরম ঝুঁকি

অনেকে ভাবেন, পাওয়ারের মাধ্যমে জমি কিনে রেজিস্ট্রি ও নামজারি (মিউটেশন) করে ফেললে বা দখলে গেলেই মালিকানা নিশ্চিত। কিন্তু মৃত মালিকের পাওয়ার দিয়ে করা এই বিক্রয় দলিল আইনগতভাবে ‘অকার্যকর’ বা ‘Void’

এর ফলাফল ভয়াবহ হতে পারে: ১. মামলার মুখে পতন: মৃত ব্যক্তির আসল উত্তরাধিকারীরা (ওয়ারিশ) যদি আদালতে মামলা করেন, তবে ক্রেতা কোনোভাবেই টিকতে পারবেন না। ২. দলিল বাতিল: আদালত এ ধরনের দলিল বাতিলের আদেশ দেবেন এবং জমি আবার আসল উত্তরাধিকারীদের কাছে ফিরে যাবে। ৩. আর্থিক ক্ষতি: অবৈধ উপায়ে জমি কিনে ক্রেতা শুধু জমিই হারাবেন না, বরং তার বিনিয়োগ করা অর্থও ঝুঁকির মুখে পড়বে।


প্রতারণা থেকে বাঁচতে করণীয়

জমি কেনার আগে ক্রেতাদের জন্য কিছু জরুরি সতর্কবার্তা দিয়েছেন আইন বিশেষজ্ঞরা:

  • জীবিত থাকার প্রমাণ: জমি বিক্রির দিন দাতা (আসল মালিক) জীবিত আছেন কি না, তা শতভাগ নিশ্চিত হোন।

  • কাগজপত্র যাচাই: মালিকের মৃত্যু সনদ এবং ইউনিয়ন পরিষদ বা কাউন্সিলর অফিস থেকে ওয়ারিশ সনদ সংগ্রহ করে তথ্য মিলিয়ে নিন।

  • আইনি পদক্ষেপ: যদি কেউ জানতে পারেন মৃত ব্যক্তির পাওয়ার ব্যবহার করে জমি বিক্রি হয়েছে, তবে দ্রুত দেওয়ানি আদালতে টাইটেল স্যুট (Title Suit) বা দলিল বাতিলের মামলা করতে হবে। প্রয়োজনে জালিয়াতির জন্য ফৌজদারি মামলাও করা যেতে পারে।

  • এসি ল্যান্ড অফিসে যোগাযোগ: অবৈধ রেকর্ডের বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট ভূমি অফিসে (AC Land) লিখিত আপত্তি দাখিল করুন।

বিশেষ সতর্কতা: জমি কেনার সময় বিক্রেতা যদি সরাসরি মালিক না হয়ে ‘পাওয়ার হোল্ডার’ হন, তবে কোনোভাবেই তাড়াহুড়ো করবেন না। মনে রাখবেন, একটি ভুল সিগনেচার আপনার সারাজীবনের সঞ্চয় ধূলিসাৎ করে দিতে পারে।

কখন পাওয়ার অব এর্টানি করা হয়?

পাওয়ার অফ অ্যাটর্নি (Power of Attorney) বা আমমোক্তারনামা হলো একটি আইনি দলিল, যার মাধ্যমে একজন ব্যক্তি (দাতা) অন্য একজন ব্যক্তিকে (গ্রহীতা) তার পক্ষে নির্দিষ্ট কোনো কাজ করার আইনি ক্ষমতা অর্পণ করেন।

সাধারণত নিচের পরিস্থিতিগুলোতে পাওয়ার অফ অ্যাটর্নি করা হয়:

১. বিদেশে বা দূরে অবস্থান করলে

যদি কোনো ব্যক্তি প্রবাসে থাকেন বা দেশের এমন কোনো দূরে থাকেন যেখান থেকে নিয়মিত নিজের সম্পত্তি দেখাশোনা করা বা দলিল সই করা সম্ভব নয়, তখন তিনি তার বিশ্বস্ত কাউকে পাওয়ার অফ অ্যাটর্নি দিতে পারেন।

২. শারীরিক অসুস্থতা বা বার্ধক্যজনিত কারণে

মালিক যদি গুরুতর অসুস্থ হন, হাসপাতালে ভর্তি থাকেন বা এমন বৃদ্ধ হন যে তার পক্ষে চলাফেরা করে আদালতের কাজ বা জমি কেনাবেচা করা সম্ভব নয়, তখন তিনি প্রতিনিধি নিয়োগ করেন।

৩. জমি উন্নয়ন বা আবাসন প্রকল্পের জন্য (অপ্রত্যাহারযোগ্য পাওয়ার)

যখন কোনো জমির মালিক কোনো ডেভেলপার কোম্পানিকে ফ্ল্যাট নির্মাণের জন্য জমি দেন, তখন নির্মাণ কাজ ও ফ্ল্যাট বিক্রির ক্ষমতা দেওয়ার জন্য অপ্রত্যাহারযোগ্য পাওয়ার অফ অ্যাটর্নি করা বাধ্যতামূলক।

৪. আদালতের মামলা পরিচালনার জন্য

নিজের পক্ষে মামলা লড়া, আইনজীবী নিয়োগ করা বা আদালতে হাজিরা দেওয়ার জন্য অন্য কাউকে দায়িত্ব দিতে এই দলিল করা হয়।

৫. ব্যবসায়িক ও আর্থিক লেনদেন

ব্যবসায়িক চুক্তি স্বাক্ষর, ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনা বা ট্যাক্স সংক্রান্ত কাজ নিজের অনুপস্থিতিতে সম্পন্ন করার জন্য পাওয়ার অফ অ্যাটর্নি দেওয়া হয়।


পাওয়ার অফ অ্যাটর্নির প্রধান প্রকারভেদ

প্রকার বিবরণ
সাধারণ (General) PoA একাধিক কাজ বা ব্যাপক ক্ষমতা দেওয়ার জন্য। যেমন- জমি রক্ষণাবেক্ষণ ও খাজনা দেওয়া।
বিশেষ (Special) PoA নির্দিষ্ট একটি কাজের জন্য। যেমন- শুধু একটি নির্দিষ্ট জমি বিক্রির জন্য।
অপ্রত্যাহারযোগ্য (Irrevocable) PoA স্থাবর সম্পত্তি বিক্রয় বা উন্নয়ন (Land Development)-এর জন্য, যা দাতা চাইলেই হুট করে বাতিল করতে পারেন না।

জরুরি কিছু নিয়ম:

  • রেজিস্ট্রেশন: জমি সংক্রান্ত পাওয়ার অফ অ্যাটর্নি অবশ্যই রেজিস্ট্রি করতে হবে।

  • বাতিল হওয়া: দাতা মারা গেলে পাওয়ার অফ অ্যাটর্নি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যায় (যদি না সেটি আইন অনুযায়ী বিশেষ কোনো শর্তযুক্ত থাকে)।

  • সতর্কতা: যাকে পাওয়ার দিচ্ছেন, তিনি যেন অত্যন্ত বিশ্বস্ত হন; কারণ তার করা কাজের আইনি দায়ভার আপনার ওপরই বর্তাবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *