আজকের খবর ২০২৬

৬ জটিল রোগে আক্রান্তদের পাশে সরকার: এককালীন ৫০ হাজার টাকা সহায়তা পাচ্ছেন রোগীরা

দেশে ক্যান্সার, কিডনি এবং লিভার সিরোসিসের মতো মারাত্মক রোগের প্রাদুর্ভাব বেড়েই চলেছে। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, প্রতি বছর প্রায় ৩ লক্ষ মানুষ এই জটিল রোগগুলোতে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করছেন। দীর্ঘমেয়াদী এবং ব্যয়বহুল চিকিৎসার খরচ মেটাতে গিয়ে অনেক পরিবারই নিঃস্ব হয়ে পড়ছে। এই অসহায় রোগীদের সহায়তায় এগিয়ে এসেছে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়। সমাজসেবা অধিদফতরের মাধ্যমে বাস্তবায়িত একটি বিশেষ কর্মসূচির আওতায় এখন ৬টি জটিল রোগে আক্রান্ত রোগীদের এককালীন ৫০,০০০ (পঞ্চাস হাজার) টাকা আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হচ্ছে।

কোন কোন রোগের জন্য এই সহায়তা?

সরকারের এই সামাজিক নিরাপত্তা কার্যক্রমের আওতায় নিম্নলিখিত রোগীরা আবেদন করতে পারবেন:

১. ক্যান্সার

২. কিডনি রোগ (বিশেষ করে ডায়ালাইসিস নিচ্ছেন এমন রোগী)

৩. লিভার সিরোসিস

৪. স্ট্রোকে প্যারালাইজড (২৪ ঘণ্টার বেশি সময় ধরে পক্ষাঘাতগ্রস্ত)

৫. জন্মগত হৃদরোগ

৬. থ্যালাসেমিয়া

আবেদনের যোগ্যতা ও প্রক্রিয়া

এই আর্থিক সহায়তা পেতে হলে রোগীকে অবশ্যই বাংলাদেশের নাগরিক এবং দুঃস্থ হতে হবে। ভূমিহীন বা ০.৫০ একরের কম জমি আছে এমন ব্যক্তি এবং বয়োজ্যেষ্ঠ বা বিধবারা এক্ষেত্রে অগ্রাধিকার পাবেন।

প্রয়োজনীয় কাগজপত্র:

  • নিবন্ধিত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক কর্তৃক রোগের প্রত্যয়নপত্র।

  • বায়োপসি (ক্যান্সারের জন্য), ডায়ালাইসিস রিপোর্ট বা সংশ্লিষ্ট টেস্টের কাগজ।

  • জাতীয় পরিচয়পত্র বা জন্ম সনদের সত্যায়িত ফটোকপি।

আবেদনকারীকে সমাজসেবা অধিদফতরের নির্ধারিত আবেদন ফরম পূরণ করে সংশ্লিষ্ট উপজেলা বা শহর সমাজসেবা কার্যালয়ে দুই কপি জমা দিতে হবে। বছরের যেকোনো সময়ে এই আবেদন জমা দেওয়া যায়।

ইএফটির মাধ্যমে সরাসরি টাকা

২০২৪-২৫ অর্থবছর থেকে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে এবং রোগীদের ভোগান্তি কমাতে সরকার ইলেক্ট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফার (EFT) পদ্ধতির মাধ্যমে সরাসরি উপকারভোগীর কাছে টাকা পৌঁছে দিচ্ছে। এর আগে এই টাকা ক্রসিং চেকের মাধ্যমে প্রদান করা হতো।

ক্রমবর্ধনশীল বরাদ্দের পরিসংখ্যান

২০১৩-১৪ অর্থবছরে মাত্র ২.৮২৫ কোটি টাকা দিয়ে শুরু হওয়া এই কার্যক্রমের পরিধি কয়েক গুণ বেড়েছে। নিচের সারণিতে সাম্প্রতিক বছরগুলোর উন্নয়নের চিত্র দেখা হলো:

অর্থবছর বরাদ্দকৃত অর্থ (কোটি টাকা) উপকৃত রোগীর সংখ্যা
২০২২-২০২৩ ২০০ ৪০,০০০ জন
২০২৩-২০২৪ ২০০ ৪০,০০০ জন
২০২৪-২০২৫ ৩০০ ৬০,০০০ জন
২০২৫-২০২৬ ৩০০ ৬০,০০০ জন

সমাজসেবা অধিদফতরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রকৃত অভাবী রোগীরা যাতে বঞ্চিত না হয়, সেজন্য স্থানীয় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের সমন্বয়ে গঠিত জেলা কমিটি আবেদনগুলো গুরুত্বের সাথে যাচাই-বাছাই করছে। সরকারের এই উদ্যোগ অনেক পরিবারের জন্য আশার আলো হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ফরম ডাউনলোডআবেদন লিংক

বাংলাদেশের যে কোন নাগরিক আবেদন করতে পারবেন?

হ্যাঁ, বাংলাদেশের যে কোনো নাগরিক এই আর্থিক সহায়তার জন্য আবেদন করতে পারেন, তবে আবেদনের ক্ষেত্রে সমাজসেবা অধিদফতর কিছু সুনির্দিষ্ট যোগ্যতা এবং অগ্রাধিকারের মানদণ্ড নির্ধারণ করে দিয়েছে।

সহজ কথায়, নাগরিকত্ব ছাড়াও আপনাকে নিচের শর্তগুলো পূরণ করতে হবে:

১. রোগের ধরণ ও চিকিৎসকের প্রমাণপত্র

আবেদনকারীকে অবশ্যই ওই ৬টি রোগের (ক্যান্সার, কিডনি, লিভার সিরোসিস, স্ট্রোকে প্যারালাইজড, জন্মগত হৃদরোগ বা থ্যালাসেমিয়া) যেকোনো একটিতে আক্রান্ত হতে হবে। শুধু মৌখিক দাবিতে হবে না, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের দেওয়া টেস্ট রিপোর্ট (যেমন: বায়োপসি বা ডায়ালাইসিস রিপোর্ট) এবং প্রত্যয়নপত্র আবেদনের সাথে জমা দিতে হবে।

২. আর্থিক ও সামাজিক অবস্থা (আসল শর্ত)

যেহেতু এটি একটি কল্যাণমূলক কর্মসূচি, তাই সবাইকে এই টাকা দেওয়া সম্ভব হয় না। এখানে ‘গরীব ও দুঃস্থ’ রোগীদের অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। বাছাই কমিটি নিচের বিষয়গুলো বিবেচনা করে:

  • ভূমিহীন বা নিঃস্ব: যাদের বসতবাড়ি ছাড়া কোনো জমি নেই বা জমির পরিমাণ ০.৫০ একরের কম, তারা অগ্রাধিকার পান।

  • অসহায়ত্ব: যারা আর্থিক সংকটে চিকিৎসা চালাতে পারছেন না।

  • সামাজিক অবস্থা: শিশু, বয়োজ্যেষ্ঠ, বিধবা, তালাকপ্রাপ্তা বা পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন ব্যক্তিদের অগ্রাধিকার দেওয়া হয়।

৩. জাতীয় পরিচয়পত্র বা জন্ম সনদ

আবেদনকারীর অবশ্যই জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) থাকতে হবে। যদি রোগীর বয়স ১৮ বছরের কম হয়, তবে ডিজিটাল জন্ম সনদ এবং তার অভিভাবকের NID প্রয়োজন হবে।

৪. বাছাই প্রক্রিয়ায় উত্তীর্ণ হওয়া

আপনি আবেদন করলেই টাকা পাবেন এমন নয়। আপনার আবেদনটি উপজেলা বা শহর সমাজসেবা কার্যালয়ে জমা দেওয়ার পর একটি বাছাই কমিটি (জেলা কমিটি) যাচাই করবে আপনার দেওয়া তথ্যাদি এবং রোগের গুরুত্ব কতটুকু। তারা যদি আপনাকে ‘প্রকৃত দুঃস্থ ও যোগ্য’ মনে করেন, তবেই তালিকার অন্তর্ভুক্ত করা হবে।


সারসংক্ষেপ: বাংলাদেশের নাগরিক হওয়া প্রথম শর্ত, তবে অনুদান পাওয়ার জন্য আপনাকে আর্থিকভাবে অসচ্ছল এবং চিকিৎসকের সঠিক রিপোর্টধারী হতে হবে।

আবেদনপত্র দাখিলের নির্দেশনা দেখুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *