প্রাচীনকাল থেকেই ভূমি ব্যবহারের বিনিময়ে সরকারকে খাজনা দেওয়ার রীতি প্রচলিত। তবে আধুনিক ভূমি ব্যবস্থাপনায় ‘খাজনা’ শব্দটি পরিবর্তিত হয়ে এখন ‘ভূমি উন্নয়ন কর’ হিসেবে পরিচিত। বর্তমানে ভূমি উন্নয়ন কর কেবল সরকারি রাজস্ব নয়, বরং জমির মালিকানা প্রমাণের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দলিলে পরিণত হয়েছে।
সূচীপত্র
ভূমি উন্নয়ন কর কেন দেবেন?
জমির ভোগদখল বজায় রাখার জন্য প্রতি শতাংশ জমির বিপরীতে সরকারকে প্রতি বছর যে নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ প্রদান করা হয়, তাকেই ভূমি উন্নয়ন কর বলে। এই কর পরিশোধের পর প্রাপ্ত ‘দাখিলা’ বা রশিদ জমির মালিকানার একটি শক্তিশালী প্রমাণ। আইন অনুযায়ী, দাতা কর প্রদানের পর দাখিলা পাওয়ার অধিকার রাখেন এবং এটি না দেওয়া আইনের লঙ্ঘন।
কৃষি জমির জন্য বিশেষ সুবিধা: ২৫ বিঘা পর্যন্ত কর মওকুফ
সাধারণ কৃষকদের সুবিধার্থে সরকার কৃষি জমির ক্ষেত্রে বড় ছাড় দিয়েছে। বর্তমানে ২৫ বিঘা (৮.২৫ একর) পর্যন্ত কৃষি জমির জন্য কোনো ভূমি উন্নয়ন কর দিতে হয় না। তবে এক্ষেত্রে নির্ধারিত ফরমে সহকারী কমিশনার (ভূমি) বা এসি ল্যান্ডের নিকট থেকে ‘বিবরণী ভাঙার’ আদেশ নিতে হয়। এছাড়া প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র চাষীদের হাঁস-মুরগি বা ডেইরি ফার্মের ক্ষেত্রেও বিশেষ সুবিধা রয়েছে।
বিবিধ কর হার: আবাসিক ও বাণিজ্যিক
অকৃষি জমির ক্ষেত্রে ব্যবহারের ধরন অনুযায়ী করের হার ভিন্ন হয়:
আবাসিক এলাকা: ঢাকা, চট্টগ্রামসহ মহানগরী এলাকায় শতাংশ প্রতি কর ২২ টাকা, জেলা সদরে ৭ টাকা এবং অন্যান্য পৌর এলাকায় ৬ টাকা।
বাণিজ্যিক এলাকা: মহানগরীতে প্রতি শতাংশ ১২৫ টাকা এবং জেলা সদরে ২২ টাকা।
বাগান: চা, রাবার বা ফলের বাগান (১ একরের বেশি) হলে প্রতি শতাংশে ১ টাকা ১০ পয়সা হারে কর ধার্য হয়।
বিশেষ ক্ষেত্র: ৫টির কম হস্তচালিত তাঁত বা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান (মসজিদ, মন্দির, কবরস্থান) জেলা প্রশাসকের অনুমোদন সাপেক্ষে কর মওকুফ পেতে পারে।
বকেয়া কর ও জরিমানার হিসাব
অনেকের ধারণা তিন বছরের বেশি বকেয়া হলে তা আর আদায় করা যায় না, যা সম্পূর্ণ ভুল। বকেয়া ভূমি উন্নয়ন করের ওপর বার্ষিক ৬.২৫% হারে জ্যামিতিক সুদ যোগ হয়। উদাহরণস্বরূপ, যদি কারো প্রতি বছর ১০০ টাকা কর হয় এবং তা ৬ বছর বকেয়া থাকে, তবে সুদসহ তাকে মোট ৬৯৩.৭৫ টাকা পরিশোধ করতে হবে।
সতর্কতা: কর বকেয়া থাকলে সরকার ‘রেন্ট সার্টিফিকেট’ মামলার মাধ্যমে জমি নিলাম করার ক্ষমতা রাখে। যদি নিলামে কোনো ক্রেতা না পাওয়া যায়, তবে সরকার মাত্র ১ টাকা প্রতীকী মূল্যে ওই জমি খাস খতিয়ানভুক্ত করতে পারে।
সচেতনতা ও প্রতিকার
জমির পরিমাণ ২৫ বিঘার বেশি হলে তা ৯০ দিনের মধ্যে এসি ল্যান্ড অফিসে জানাতে হয়। তথ্য গোপন করলে ১০০০ টাকা জরিমানাসহ জমি বাজেয়াপ্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। আবার জমি বিক্রি বা উত্তরাধিকার সূত্রে জমি কমে গেলে ‘বিবরণী ভাঙার’ আবেদন করা জরুরি।
যদি কোনো ভূমি কর্মকর্তা ভুলবশত অতিরিক্ত কর ধার্য করেন, তবে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি ১৫ দিনের মধ্যে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) বা জেলা প্রশাসকের কাছে আপিল করতে পারেন। জেলা প্রশাসকের সিদ্ধান্তে সন্তুষ্ট না হলে বিভাগীয় কমিশনার এবং সর্বশেষ ভূমি আপিল বোর্ড পর্যন্ত যাওয়ার সুযোগ রয়েছে।
ভূমি বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, অনাকাঙ্ক্ষিত ঝামেলা ও জমি নিলাম হওয়া এড়াতে প্রতি বছরই নিয়মিত ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধ করা উচিত।
জমির খাজনা না দিলে কি হয়?
জমির খাজনা বা ভূমি উন্নয়ন কর সঠিক সময়ে পরিশোধ না করলে আপনি আইনগত ও মালিকানাগত বেশ কিছু জটিলতার সম্মুখীন হতে পারেন। আপনার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে এর পরিণামগুলো নিচে সহজভাবে তুলে ধরা হলো:
১. সার্টিফিকেট মামলা ও জমি নিলাম
ভূমি উন্নয়ন কর বকেয়া পড়লে সরকার তা আদায়ের জন্য রেন্ট সার্টিফিকেট মামলা দায়ের করতে পারে। এই মামলার চূড়ান্ত পর্যায়ে বকেয়া টাকা আদায়ের লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট জমিটি নিলামে বিক্রি করে দেওয়ার বিধান রয়েছে।
২. জমি খাস হয়ে যাওয়া
নিলামে যদি কোনো উপযুক্ত ক্রেতা পাওয়া না যায়, তবে সরকার মাত্র এক টাকা প্রতীকী মূল্যে ওই জমিটি কিনে নিতে পারে। এর ফলে আপনার মালিকানাধীন জমিটি সরকারি খাস জমিতে পরিণত হবে এবং সরকার পরবর্তীতে তা ভূমিহীনদের মধ্যে বণ্টন করে দিতে পারবে।
৩. জ্যামিতিক হারে সুদ প্রদান
খাজনা বকেয়া থাকলে আপনাকে কেবল মূল টাকা দিলেই হয় না, বরং তার সাথে প্রতি বছরের জন্য ৬.২৫ শতাংশ (৬.২৫%) হারে জ্যামিতিক সুদ যুক্ত হয়। দীর্ঘ সময় খাজনা না দিলে সুদের পরিমাণ মূল করের চেয়েও অনেক বেশি হয়ে দাঁড়ায়, যা আপনার জন্য বড় আর্থিক বোঝা হয়ে উঠতে পারে।
৪. মালিকানা প্রমাণে জটিলতা
ভূমি উন্নয়ন কর প্রদানের পর প্রাপ্ত ‘দাখিলা’ বা রশিদ জমির মালিকানা প্রমাণের একটি অন্যতম প্রধান দলিল। নিয়মিত খাজনা না দিলে আপনার কাছে হালনাগাদ দাখিলা থাকবে না, যার ফলে জমি কেনা-বেচা, ব্যাংক ঋণ গ্রহণ বা উত্তরাধিকার সূত্রে নামজারির ক্ষেত্রে আপনি চরম ভোগান্তিতে পড়বেন।
৫. নামজারিতে বাধা
আপনি যদি জমি ক্রয় করেন কিন্তু পূর্বের মালিকের বকেয়া খাজনা পরিশোধ না করেন, তবে আপনার নামে জমির নামজারি (Mutation) করা সম্ভব হবে না। যতক্ষণ না পর্যন্ত বকেয়া কর পরিশোধ করে বিবরণী ঠিক করা হচ্ছে, ততক্ষণ সরকারি রেকর্ডে আপনার মালিকানা পূর্ণতা পাবে না।
সারসংক্ষেপ:
| পরিণাম | বিস্তারিত |
| সুদ | বার্ষিক ৬.২৫% হারে জ্যামিতিক সুদ। |
| মামলা | বকেয়া আদায়ের জন্য রেন্ট সার্টিফিকেট মামলা। |
| নিলাম | বকেয়া না দিলে জমি নিলামে বিক্রির ঝুঁকি। |
| খাস জমি | নিলামে ক্রেতা না থাকলে সরকার কর্তৃক জমি অধিগ্রহণ। |
| দলিল | হালনাগাদ দাখিলা না থাকলে মালিকানা প্রমাণে দুর্বলতা। |
