হিন্দু উত্তরাধিকার আইন। হিন্দু আইন হিন্দুদের ধর্মীয় এবং ব্যক্তিগত আইন। এ আইন যারা জন্মসূত্রে হিন্দু, হিন্দু। ধর্মে দীক্ষিত, হিন্দু পিতা মাতার অবৈধ সন্তান এবং যে ক্ষেত্রে পিতা খ্রীষ্টান এবং মাতা হিন্দু সেই ক্ষেত্রে অবৈধ সন্তান যদি মায়ের নিকট হিন্দু আচার অনুযায়ী লালিত পালিত হয়, তবে এসব ক্ষেত্রে হিন্দু আইন প্রযােজ্য। বৌদ্ধ, জৈন, শিখ এবং সাঁওতালরা হিন্দু ধর্মভূক্ত না। হলেও তাদের নিজস্ব প্রথা সম্মত আইন ছাড়া অন্যান্য ক্ষেত্রে হিন্দু আইন দ্বারা পরিচালিত। কিন্তু জুরিসপ্রুডেন্স অনুযায়ী হিন্দু আইন হচ্ছে হিন্দু ধর্মের একটি শাখা। 

সেকারণে হিন্দু। আইনকে সর্বতােভাবে পার্থিব আইন বলা যায় না। হিন্দু ধর্ম পৃথিবীর প্রাচীনতম ধর্ম । এ ধর্মের সূত্রপাত কখন হয়েছে তা কোন ঐতিহাসিকই সঠিকভাবে প্রকাশ করতে সমর্থ হন নাই। এ ধর্মের প্রবর্তক কে বা কারা তারও কোন ইতিহাস পাওয়া যায় না। তবে অনুমিত হয় যে হিন্দুদের ধর্ম শাস্ত্র বেদ-এর উদ্ভব হতে হিন্দু ধর্মের সূত্রপাত হয়। হিন্দু শব্দটি কোন হিন্দু শাস্ত্রে উল্লেখ নাই। আইন বিজ্ঞানীদের মতে হিন্দু আইন হিন্দুদের ব্যক্তিগত আইন। কারণ হিন্দুগণ ব্যক্তিগত জীবনে তাদের সনাতনী প্রথা পুরােপুরিভাবে অনুসরণে সক্ষম। হয়েছে। তাই আদিকাল থেকে হিন্দুগণ সনাতন পন্থী বিধায় হিন্দু ধর্ম সনাতন ধর্ম নামে খ্যাত। সনাতন শব্দের অর্থ ইংরেজীতে Traditional এবং বাংলাতে শাশ্বত অর্থাৎ চিরন্তন। তাই সনাতন ধর্মের অস্তিত্ব সম্বন্ধে বলা হয়েছে যা অতীতে ছিল, বর্তমানে চলছে এবং ভবিষ্যতে চলবে। 

হিন্দু উত্তরাধিকার আইনের সাধারণ নিয়মসমূহ 

১। পিণ্ড মতবাদ হিন্দু আইনের দায়ভাগ পদ্ধতির মূল ভিত্তি। হিন্দু আইনে দুইটি প্রধান মতপন্থীর মিতাক্ষরা অন্যটি দায়ভাগ দুইটি মতপন্থীর কারণে উত্তরাধিকার আইনের নিয়মাবলীও পৃথক। স্মৃতিশাস্ত্রে উল্লেখ আছে যে যারা মৃত ব্যক্তির সপিণ্ড, তারা মৃত ব্যক্তির ত্যাজ্য সম্পত্তির অধিকারী হবে। সপিণ্ড শব্দের অর্থ লইয়া ব্যাখ্যাকার পণ্ডিত বিজ্ঞানেশ্বর এবং জীমূতবাহনের মধ্যে মত পার্থক্য দেখা দেয়। বিজ্ঞানেশ্বরের মতে পিণ্ডের অর্থ শরীর। মৃত ব্যক্তির শরীরের সহিত গার্য সম্পর্ক তারাই মৃত বসিপ তার ব্যক্তির ত্যাজ্য সম্পত্তির উত্তরাধিকার অর্থাৎ মৃত ব্যক্তি দের সঙ্গে কী সম্প ভিষ্টিতে তার উত্তরাধিকার হবে।

অপরপক্ষে দায়ভাগ রচয়িতা পণ্ডিত জীমূতবাহন সুপিয়ে গু ছেন zে শ্রাদ্ধে যারা শাস্ত্র মতে পিণ্ডদানের অধিকারী তারাই মৃত ব্যক্তি সপ কে কি হবার যােগ্য। বিজ্ঞ পণ্ডিতদ্বয়ের সপিণ্ড কথার ভিন্ন ব্যাখ্যা হোটেলে হেলিত ” উত্তরাধিকার আইন মিতাক্ষরা হতে ভিন্ন।

হিন্দুদের কেহ মারা গেলে শ্রাদ্ধের সময় মৃত ব্যক্তিসহ পিতা কে রে তুঙ্গে উচ্চ তিন পুরুষের আত্মাদের আহ্বান করে শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করতে হয়। এই সুৰ ছলে কে শ্রাদ্ধ উহাকে আদ্য শ্রদ্ধও বলে। যে সমুদয় মৃত আহাদের উদ্দেশ্যেৰো নিতে হয় থাকে তাকে পিণ্ডদান বলে।

২। হিন্দু কোন পুরুষ মারা গেলে তার উত্তরাধিকারী নিয়ে নিন কোন স্ত্রীলোক (সম্পূর্ণ স্বত্ত্বের অধিকারিণী) রেখে মারা গেলে তার উত্তরাধিকার নিয়ে বলে হতে পৃথক।

৩। দায়ভাগ উত্তরাধিকার রূপে সম্পত্তি পাবার কেবল একটাই নিন করা হ উত্তরাধিকার রূপে সম্পত্তি পাবার কেবল একটাই নিয়ম স্বীকার করে তা হলো উত্তরাধীকারী। যেমন- রাম ও কানাই দুই ভ্রাতা যৌথ পরিবারভূক্ত এবং তাদের পর সম্পত্তিতে প্রত্যেকের সম অংশ। এমতাবস্থায় রাম একটি পুত্র রেখে মারা গেলে তার কে তার পুত্র উত্তরাধিকার সূত্রে পাবে। ভ্রাতা কানাই রামের কোন সম্পত্তি ওয়ারিশ হবে না। পিতার মৃত্যুতে পুত্রের সম্পত্তি পাওয়াকে বলা যায় উত্তরাধিকার সূত্রে সম্পত্তি পাওয়া।

পক্ষান্তরে মিতাক্ষরা মতে সম্পত্তি প্রাপ্তির ক্ষেত্রে দুইটি নিন মানিয়া চলে যেমন : কানাই দুই ভ্রাতা মিতাক্ষরা শাসিত অঞ্চলে যৌথ পরিবারভূক্ত হিসাবে সব রত; পূর্ব পুরুষের নিকট হতে ২০ বিঘা জমি প্রাপ্ত হয়েছে। রাম তার ব্যবসা করে নিজ নামে আরো ৩০ বিঘা জমি অর্জন করিয়া এক পুত্র রেখে পরলােকগমন করে। এমতাবস্থায় রামে স্ব উপার্জিত ৩০ বিঘা জমি তার পুত্র উত্তরাধিকার সূত্রে পাবে এবং পূর্ব পুরুষগত ২০ মি জমিতে কানাইর অংশ যৌথ পরিবারের উত্তরজীবী রামের পুত্র এবং তা কই সম অংশ পাবে। এ নিয়মকেই বলা হয় উত্তরজীবী সূত্রে সম্পত্তি পাওয়া।

দায়ভাগ মতে উরেজীবী সূত্রে সম্পত্তি পাওয়ার নিয়মকে স্বীকার করে না। তবে দুটি ক্ষেত্রে উহার ব্যতিক্রম আছে। যেমন

হিন্দু সম্পত্তি আইন

বিধবা কমলা মারা গেলে তার অংশ মায়া জীবনস্বত্বে অর্থাৎ ষােল আনা সম্পত্তি পাবে। মায়া মারা গেলে তার জীবন স্বত্বের সম্পত্তি স্বামী রমেশের নিকটবর্তী সপিণ্ডদের উপর বর্তাবে।

আবার যদি রমেশ দুই কন্যা উত্তরাধিকারী রেখে মারা যায় তা হলে প্রত্যেক কন্যার ; অংশ করে জীবনসতে পাবে। পরে এক কন্যা মারা গেলে অপর কন্যা উত্তরজীবী সূত্রে খােল আনা পাবে এবং ঐ কন্যার মৃত্যুর পর তার পিতা রমেশের নিকটবর্তী সপিণ্ড পাবে। | ৪। মিতাক্ষরা মতবাদের আওতাধীনে আবার চারিটি উপমতপন্থী রয়েছে। যেমন বেনারস, মিথিলা, বােষে এবং মাদ্রাজ স্কুল। বাংলাদেশে বেনারস ও মিথিলা উপমতপন্থী অনুযায়ী ৫ শ্রেণীর মহিলারা পুরুষদের নিকট হতে উত্তরাধিকার সূত্রে সম্পত্তি পাওয়ার হকদার। তারা হল বিধবা, কন্যা, মাতা, পিতামহী ও প্রপিতামহী। উক্ত উপমতপন্থী অনুযায়ী সহােদর ভগ্নী উত্তরাধিকার হয় না। কিন্তু বােরে এবং মাদ্রাজ উপমতপন্থী মতে ভগ্নী উত্তরাধিকারিণী হয়।

৫। কোন পুরুষ ব্যক্তি যখন উত্তরাধিকার সূত্রে সম্পত্তি পায় তা যে মহিলা অথবা পুরুষ যার নিকট হতেই প্রাপ্ত হউক না কেন, সে ঐ সম্পত্তি সম্পূর্ণ বা নিবৃঢ় স্বত্তে পায়। অপর পক্ষে কোন মহিলা যখন উত্তরাধিকার সূত্রে কোন সম্পত্তি পায়, তা যে মহিলা বা পুরুষ যার নিকট হতেই পাক না কেন, সে ঐ সম্পত্তি সীমিত বা জীবনস্বত্ত্বে পাবে। 

জীবনস্বত্ব মৃত্যুর সাথে বিলুপ্ত হয়। তখন যার থেকে জীবনস্বত্ব পেয়েছিল তার নিকটবর্তী সপিণ্ডগণ উক্ত সম্পত্তির ওয়ারিশ হবে। এরূপ ওয়ারিশদেরকে ভাবি উত্তরাধিকারী বা রিভারশনার বলে। | বাংলাদেশ, ভারত এবং পাকিস্তানে হিন্দুদের মধ্যে দু’ধরণের উত্তরাধিকার পদ্ধতি চালু রয়েছে। যথা- দায়ভাগ পদ্ধতি এবং মিতাক্ষরা পদ্ধতি। দায়ভাগ পদ্ধতি বাংলাদেশ এবং ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ও আসামে প্রচলিত আছে। পাকিস্তানে এবং ভারতের অন্যান্য প্রদেশে মিতাক্ষরা পদ্ধতি প্রযােজ্য হয়ে থাকে। দায়ভাগ মতে পিণ্ডদানের অধিকারী ব্যক্তি মাত্রই মৃত ব্যক্তির উত্তরাধিকারী। যারা পিণ্ড দিতে পারে তারাই মৃত ব্যক্তির ত্যাজ্য সম্পত্তির ওয়ারিশ বলে গন্য হয়। পিণ্ড দাতাদেরকে তিনটি ভাগে ভাগ করা যায়। 

যেমন (ক) সপিণ্ড (খ) সাকুল্য (গ) সমানােদক। | মিতাক্ষরা আইনে মৃত ব্যক্তির রক্তের সম্পর্কের নৈকট্যের ভিত্তিতে উত্তরাধিকারী নির্ণীত হয়। এরা তিন শ্রেণীর । যথা- (ক) সপিণ্ড (খ) সমানােদক (গ) বন্ধু। 

দায়ভাগ আইনে উত্তর প্রজন্ম তথা উত্তরাধিকারীর (Succession) কথা বলা হয়েছে। পক্ষান্তর মিতাক্ষরা আইনে উক্তরজীবি (Survivorship)।

মিতাক্ষরা যৌথ পারিবারিক সম্পত্তিতে Coparcener গণের স্বত্ব একত্রিত থাকে। বাটোয়ারামূলে একজন Coparcener তার অংশ নির্দিষ্ট করলেও অন্যান্য Coparcerner গণের অংশ নির্দিষ্ট হয় না [17 DLR (SC) 126] । পিতা কর্তৃক সম্পত্তির বাটোয়ারা হয়ে যাওয়ার পর যদি কোন পুত্রসন্তান জন্মগহণ করে, তবে সেই পুত্র নূতন করে পূর্বের বাটোয়ারা দাবী করতে পারে না [9 DLR 577]।

দায়ভাগ আইনে পিতা, পুত্র বা পুত্রের পুত্র একই সঙ্গে কোন সম্পত্তিতে ওয়ারিশ হতে পারে না এবং কোন Coparcener সৃষ্টি হয় না। পিতার বর্তমানে কেহ কোন প্রকার অংশ দাবী করতে পারে না।

পিতার মৃত্যুর পর পিতার সােপার্জিত সম্পত্তি এবং পৈত্রিক সম্পত্তির সােল আনা অংশে পুত্রগণ উত্তরাধিকার সূত্রে স্বত্ত্বাধিকারী হয় এবং প্রত্যেকে তাদের অংশ বাটোয়ারা মূলে মালিকানা স্বত্ব প্রাপ্ত হয়।

৬। শেষপূর্ণ মালিক এবং নিন্মতম নব্য মালিক (Last full owner and Fresh stock of decent): 

যে ব্যক্তি তাহার মৃত্যুর পূর্বে কোন সম্পত্তির ষােল আনা রকমে মালিক বা স্বত্ত্বাধিকারী হলে সেই সম্পত্তি বাবদ তাহাকে বলা হয় পূর্ণ স্বত্ত্বাধিকারী বা Last full owner এবং সম্পত্তির পূর্ণ স্বত্ত্বাধিকারীর মাধ্যমে কোন সন্তান বা বংশের উদ্ভব হলে সম্পত্তির সেই পূর্ণ সত্ত্বাধিকারী।

৭। পুরুষ এবং নারীর উত্তরাধিকার : পুরুষ লােক মারা গেলে তার উত্তরাধিকার নির্ণয়ের নিয়মাবলী কোন স্ত্রী লােক স্ত্রীধন রেখে মারা গেলে তার উত্তরাধিকার নির্ণয়ের নিয়মাবলী হতে পৃথক। স্ত্রীধনের অর্থ, যে সম্পত্তিতে কোন স্ত্রীলােক, সম্পূর্ণ সত্বের অধিকারিণী । 

কোন পুরুষ যে সম্পত্তির স্বত্বাধিকারী, সে সম্পত্তিতে তাহার স্বত্ব নিরংকুশ। অর্থাৎ হিন্দু পুরুষ তার সম্পত্তি যেকোনভাবে ভােগদখল করতে পারে এবং কারণে অকারণে হস্তান্তর করতে পারে। সে তার সম্পত্তি পুরীতে অতিথিশালা নির্মাণের জন্য দান করতে পারে। আবার রক্ষিতা রেখে তার সম্পত্তির সমস্ত আয় ব্যয় করতে পারে। তার উত্তরাধিকারের ধারাও স্বাভাবিক। অর্থাৎ প্রথমে তার পুত্র পৌত্রেরা সেই সম্পত্তি পায়। কোন হিন্দু মহিলার সম্পত্তির অদিকার দুইভাগে বিভক্ত। প্রথম ভাগে সেই সম্পত্তি পড়ে যা সে উত্তরাধিকারী রূপে পায়। এই সম্পত্তিতে তার অধিকার অত্যন্ত সীমিত। আইনগত আবশ্যকতা ভিন্ন সে এই সম্পত্তি হস্তান্তর করতে পারে না। দ্বিতীয় প্রকার যে সম্পত্তির সে স্বত্তাধিকারিণী হতে পারে, আইনে তাকে বলে স্ত্রীধন। ইহাতে তার অধিকার প্রায় নিরংকুশ। সে ঐ সম্পত্তির যথেচ্ছ ভােগ বা হস্তান্তর করতে পারে। কিন্তু তার উত্তরাধিকারের ধারা ভিন্নরূপ।

৮। নারী উত্তরাধিকারী : বাংলাদেশ, বেনারস ও মিথিলা স্কুল হতে শুধুমাত্র পাঁচ শ্রেণীর নারী পুরুষদের নিকট হতে উত্তারাধিকারসূত্রে সম্পত্তি পাওয়ার অধিকারী, যথা- (১) বিধবা, (২) কন্যা, (৩) মাতা, (৪) পিতামহী এবং (৫) প্রপিতামহী ।

হিন্দু উত্তরাধিকার (সংশােধন আইন ১৯২৯ এর দ্বারা কন্যা, দৌহিত্রী এবং বােনও এ তালিকায় সংযােজিত হয়েছে। তবে তাহাদিগকে মিতাক্ষরা আইন দ্বারা শাসিত হতে হবে। মাদ্রাজ স্কুল ১৯২৯ সনের আইন উল্লেখিত তিনজনসহ অধিকতর নারী সদস্যকে উত্তরাধিকারী হিসাবে স্বীকৃতি দেয়। বােম্বে স্কুল অনুযায়ী তাদের সংখ্যা আরাে বেশী ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *