বিদেশে কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ থেকে যাওয়া কর্মীদের জন্য ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের ‘কল্যাণ ফি’ পুনর্নির্ধারণ করেছে সরকার। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, এতদিনের ৩ হাজার ৫০০ টাকার পরিবর্তে এখন থেকে ৫ হাজার ৫০০ টাকা কল্যাণ ফি দিতে হবে। অর্থাৎ একবারে ফি বাড়ছে ২ হাজার টাকা বা প্রায় ৫৭ দশমিক ১ শতাংশ।
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের কল্যাণ-১ শাখা থেকে ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে জারি করা পরিপত্রে এ সিদ্ধান্ত জানানো হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটের নোটিশ তালিকাতেও একই পরিপত্র প্রকাশিত হয়েছে।
১ অক্টোবর থেকে নতুন হারে ফি
পরিপত্র অনুযায়ী, নতুন নির্ধারিত কল্যাণ ফি ১ অক্টোবর ২০২৬ থেকে কার্যকর হবে। অর্থাৎ ১ অক্টোবর বা তার পরবর্তী সময়ে প্রযোজ্য ক্ষেত্রে আগের ৩ হাজার ৫০০ টাকার পরিবর্তে ৫ হাজার ৫০০ টাকা দিতে হবে।
| বিষয় | আগের হার | নতুন হার | বৃদ্ধি |
|---|---|---|---|
| ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ ফি | ৩,৫০০ টাকা | ৫,৫০০ টাকা | ২,০০০ টাকা |
| শতকরা বৃদ্ধি | — | — | প্রায় ৫৭.১% |
| কার্যকর | — | ১ অক্টোবর ২০২৬ | — |
প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৫ সালে ৩ হাজার ৫০০ টাকা নির্ধারণের পর দীর্ঘ সময় পর এই ফি পুনর্নির্ধারণ করা হলো।
কেন কল্যাণ ফি বাড়ানো হলো?
মন্ত্রণালয়ের পরিপত্রে ফি পুনর্নির্ধারণের পেছনে কয়েকটি বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—
- প্রবাসী কর্মীদের সেবামূলক কার্যক্রমের পরিধি ও পরিমাণ বৃদ্ধি;
- কর্মীদের সুরক্ষা ও সার্বিক কল্যাণ কার্যক্রম নিশ্চিত করা;
- বর্তমান মূল্যমান ও বাজারদরের সঙ্গে সমন্বয়;
- বৈদেশিক মুদ্রার মূল্যমানসহ পরিবর্তিত অর্থনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে কল্যাণ কার্যক্রমের ব্যয় সামঞ্জস্য করা।
অর্থাৎ সরকারের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, দীর্ঘ সময় আগের নির্ধারিত ফি দিয়ে ক্রমবর্ধমান কল্যাণমূলক কার্যক্রম পরিচালনার পরিবর্তে বর্তমান ব্যয় ও সেবার পরিধির সঙ্গে সামঞ্জস্য করতেই নতুন হার নির্ধারণ করা হয়েছে।
কারা এই ফি দেবেন?
ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের কল্যাণ ফি মূলত অভিবাসী বা বিদেশগামী বাংলাদেশি কর্মীদের কল্যাণ তহবিলের অন্যতম অর্থের উৎস। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, বহির্গমন বিধিমালা, ২০০২-এর ২০ ধারার আওতায় অভিবাসী কর্মীদের কাছ থেকে নির্ধারিত অর্থ নিয়ে কল্যাণ তহবিল গঠন করা হয়। এই তহবিল থেকে অভিবাসী কর্মী ও তাঁদের পরিবারের জন্য বিভিন্ন সহায়তা দেওয়া হয়।
পরিপত্রে ফিটি বিদেশগামী কর্মী, বিদেশে অবস্থানরত কর্মী বা বিমানবন্দর থেকে আদায়ের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে নতুন নিয়ম কার্যকর হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট প্রক্রিয়ায় ৩ হাজার ৫০০ টাকার পরিবর্তে ৫ হাজার ৫০০ টাকা বিবেচনা করতে হবে।
প্রবাসী কর্মীদের ওপর সরাসরি কী প্রভাব পড়বে?
সবচেয়ে সরাসরি প্রভাব পড়বে বিদেশ যাওয়ার প্রক্রিয়ায়। একজন কর্মীর ক্ষেত্রে শুধু এই নির্দিষ্ট ফিতেই আগের তুলনায় অতিরিক্ত ২ হাজার টাকা খরচ হবে।
বিদেশে যাওয়ার আগে একজন কর্মীর ভিসা, মেডিকেল, যাতায়াত, প্রশিক্ষণ, কাগজপত্র, বিমানভাড়া ও অন্যান্য বিভিন্ন ব্যয় থাকে। এর সঙ্গে কল্যাণ ফি ২ হাজার টাকা বাড়ায় অভিবাসন ব্যয়ের মোট পরিমাণও কিছুটা বাড়বে।
তবে এই বাড়তি অর্থ সরাসরি ব্যক্তিগত কোনো সেবা-চার্জ হিসেবে নয়; এটি ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের কল্যাণ তহবিলের সঙ্গে সম্পর্কিত। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, এই তহবিলের অর্থ অভিবাসী কর্মী ও তাঁদের পরিবারের কল্যাণে ব্যবহৃত হয়।
কল্যাণ তহবিলের অর্থ কোথায় কাজে লাগে?
ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড দীর্ঘদিন ধরে বিদেশগামী ও বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশি কর্মীদের বিভিন্ন কল্যাণমূলক কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, বোর্ডের তহবিলের অন্যতম উৎস হলো বিদেশগামী কর্মীদের কাছ থেকে পাওয়া কল্যাণ ফি।
এই ধরনের তহবিলের মাধ্যমে প্রবাসী কর্মী ও তাঁদের পরিবারের জন্য বিভিন্ন সহায়তা ও সেবা পরিচালিত হয়। ফলে ফি বাড়ানোর সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে একদিকে যেমন কর্মীদের অতিরিক্ত ব্যয়ের বিষয়টি সামনে এসেছে, অন্যদিকে সরকারের পক্ষ থেকে কল্যাণ সেবার ব্যয় ও পরিধি বৃদ্ধির বিষয়টিও যুক্তি হিসেবে দেখানো হয়েছে।
২০১৫ সালের হার থেকে ২০২৬ সালে বড় পরিবর্তন
নতুন সিদ্ধান্তটির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—আগের ৩ হাজার ৫০০ টাকা হারটি ২০১৫ সালে নির্ধারিত হয়েছিল। প্রায় ১১ বছর পর সেটি পরিবর্তন করে ৫ হাজার ৫০০ টাকা করা হলো।
অর্থাৎ দীর্ঘ সময় ধরে একই হারে আদায় করা কল্যাণ ফি বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, বাজারদর এবং প্রবাসী কল্যাণমূলক কার্যক্রমের ব্যয়ের সঙ্গে সমন্বয় করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
হিসাবটা সহজভাবে
ধরা যাক, একজন বিদেশগামী কর্মী বর্তমানে ৩ হাজার ৫০০ টাকা কল্যাণ ফি দিতেন।
নতুন নিয়মে:
৩,৫০০ টাকা → ৫,৫০০ টাকা
অতিরিক্ত দিতে হবে:
৫,৫০০ − ৩,৫০০ = ২,০০০ টাকা
বৃদ্ধির হার:
২,০০০ ÷ ৩,৫০০ × ১০০ ≈ ৫৭.১ শতাংশ
অর্থাৎ একজন কর্মীর নির্দিষ্ট কল্যাণ ফি বাবদ ব্যয় প্রায় ৫৭ শতাংশের বেশি বাড়ছে।
সরকারের সিদ্ধান্তের মূল কথা এক নজরে
ফি: ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ ফি
পুরোনো হার: ৩,৫০০ টাকা
নতুন হার: ৫,৫০০ টাকা
বৃদ্ধি: ২,০০০ টাকা
বৃদ্ধির হার: প্রায় ৫৭.১ শতাংশ
পুরোনো হার নির্ধারণ: ২০১৫ সালে
নতুন সিদ্ধান্তের তারিখ: ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
কার্যকর: ১ অক্টোবর ২০২৬
দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠান: ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড
মন্ত্রণালয়: প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়।
শেষ কথা
বিদেশগামী বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ ফি ৩ হাজার ৫০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৫ হাজার ৫০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। ফলে ১ অক্টোবর ২০২৬ থেকে নতুন হারে ফি প্রযোজ্য হবে। দীর্ঘদিন পর ফি পুনর্নির্ধারণের সরকারি ব্যাখ্যা হলো—প্রবাসী কর্মীদের কল্যাণ ও সুরক্ষামূলক কার্যক্রমের পরিধি বাড়া এবং বর্তমান বাজারমূল্য ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে ব্যয় সমন্বয় করা।
অন্যদিকে, বিদেশে যাওয়ার সামগ্রিক ব্যয়ের মধ্যে আরও ২ হাজার টাকা যুক্ত হওয়ায় নতুন সিদ্ধান্তটি কর্মীদের জন্য অতিরিক্ত আর্থিক চাপ তৈরি করবে—বিশেষ করে যাদের বিদেশ যাওয়ার প্রাথমিক ব্যয় ইতোমধ্যেই বেশি। ফলে নতুন হার কার্যকরের পর বিদেশগামী কর্মীদের মোট অভিবাসন ব্যয়ের হিসাব করার সময় এই পরিবর্তনটি অবশ্যই বিবেচনায় রাখতে হবে।

