সাবেক অর্থসচিব জাকির আহমেদ খানের নেতৃত্বাধীন বেতন কমিশনের প্রতিবেদন জমা হওয়ার অপেক্ষায় আছে সরকার। আগামী ২১ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে প্রতিবেদনটি অর্থ উপদেষ্টার কাছে জমা দেওয়ার কথা রয়েছে। অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ জানিয়েছেন, প্রতিবেদন হাতে পেলেই দ্রুত প্রজ্ঞাপন জারির ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
কবে নাগাদ বাস্তবায়ন?
নতুন এই বেতন কাঠামো মূলত দুই ধাপে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করা হয়েছে:
আংশিক বাস্তবায়ন: ১ জানুয়ারি ২০২৬ থেকে।
পূর্ণ বাস্তবায়ন: ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দিন অর্থাৎ ১ জুলাই ২০২৬ থেকে।
বাজেট ও অর্থনৈতিক প্রভাব
নতুন এই কাঠামো বাস্তবায়নে বড় ধরনের আর্থিক সংস্থানের প্রয়োজন হবে। অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে:
চলতি ২০২৫-২৬ সংশোধিত বাজেটে অতিরিক্ত ২২ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হচ্ছে।
পুরো পে-স্কেল বাস্তবায়িত হলে সরকারের অতিরিক্ত প্রায় ৭০–৮০ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হবে।
প্রস্তাবিত বেতন কাঠামোর সম্ভাব্য চিত্র
কমিশন সূত্রে জানা গেছে, এবার নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীদের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন বেতনের অনুপাত ১:৮ রাখার সুপারিশ করা হয়েছে।
| বিবরণ | বর্তমান (২০১৫ স্কেল) | প্রস্তাবিত (সম্ভাব্য) |
| সর্বনিম্ন বেতন | ৮,২৫০ টাকা | ১৬,৫০০+ টাকা (দ্বিগুণের বেশি) |
| সর্বোচ্চ বেতন | ৭৮,০০০ টাকা | ১,২০,০০০+ টাকা |
উপকারভোগী ও প্রেক্ষাপট
বর্তমানে দেশে সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও এমপিওভুক্ত মিলিয়ে প্রায় ২২ লাখ কর্মকর্তা-কর্মচারী রয়েছেন। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে ২০১৫ সালের সর্বশেষ পে-স্কেল পরিবর্তনের দাবি দীর্ঘদিনের। সেই প্রেক্ষিতেই ২০২৫ সালের ২৭ জুলাই ২১ সদস্যের এই বেতন কমিশন গঠন করা হয়েছিল।
পরবর্তী ধাপ: কমিশনের প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পর সেটি উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে উপস্থাপন করা হবে। সেখানে চূড়ান্ত অনুমোদনের পর অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে আনুষ্ঠানিক প্রজ্ঞাপন জারি করা হবে।
নিম্নগ্রেডের কর্মচারীদের দাবীর প্রতিফলন কি ঘটবে?
নতুন পে-স্কেলে নিম্নগ্রেডের কর্মচারীদের দীর্ঘদিনের দাবির বড় ধরনের প্রতিফলন ঘটার জোরালো সম্ভাবনা রয়েছে। বেতন কমিশনের সুপারিশ এবং অর্থ উপদেষ্টার ইঙ্গিতগুলো বিশ্লেষণ করলে এর সপক্ষে বেশ কিছু শক্তিশালী যুক্তি দেখা যায়:
১. বৈষম্য হ্রাসে ‘বেতন অনুপাত’ পরিবর্তন
নিম্নগ্রেডের কর্মচারীদের প্রধান দাবি ছিল উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বেতনের বিশাল ব্যবধান কমিয়ে আনা। কমিশন এবার সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন বেতনের অনুপাত ১:৮ রাখার সুপারিশ করেছে। এর অর্থ হলো, নিচের দিকের গ্রেডগুলোতে বেতনের বৃদ্ধির হার ওপরের গ্রেডগুলোর তুলনায় শতাংশের হিসেবে বেশি হবে।
২. সর্বনিম্ন বেতন দ্বিগুণেরও বেশি হওয়া
বর্তমানে সরকারি চাকরিতে সর্বনিম্ন মূল বেতন ৮,২৫০ টাকা, যা বর্তমান বাজারদরে জীবনধারণের জন্য একেবারেই অপ্রতুল। প্রস্তাবিত কাঠামোতে এটি বাড়িয়ে ১৬,৫০০ টাকার বেশি করার কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ নিম্নস্তরের কর্মচারীদের মূল বেতন সরাসরি ১০০% বা তার বেশি বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, যা তাদের আর্থিক সংকটে বড় ধরনের স্বস্তি দেবে।
৩. জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য
অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, এবার বেতন নির্ধারণের ক্ষেত্রে গত কয়েক বছরের মুদ্রাস্ফীতি এবং দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিকে প্রধান মানদণ্ড হিসেবে ধরা হয়েছে। নিম্ন আয়ের কর্মচারীরা যেহেতু আয়ের সিংহভাগই খাদ্য ও নিত্যপণ্যে ব্যয় করেন, তাই তাদের ক্ষেত্রে ইনক্রিমেন্ট বা ভাতার হার তুলনামূলক বেশি রাখা হচ্ছে।
৪. নীতিগত অগ্রাধিকার
উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ একাধিকবার উল্লেখ করেছেন যে, সাধারণ কর্মচারী এবং নিম্ন আয়ের মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ানো সরকারের অন্যতম লক্ষ্য। প্রতিবেদনের সারাংশ অনুযায়ী, নিম্ন গ্রেডের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর বিষয়টিই এই কমিশনের অন্যতম “ফোকাস পয়েন্ট”।
৫. এমপিওভুক্ত ও স্বায়ত্তশাসিত কর্মীদের অন্তর্ভুক্তি
২২ লাখ সুবিধাভোগীর মধ্যে একটি বিশাল অংশ নিম্ন গ্রেডের এমপিওভুক্ত শিক্ষক ও কর্মচারী। তাদের বেতন কাঠামোতে বড় পরিবর্তন আনা হচ্ছে যাতে প্রান্তিক পর্যায়ের কর্মীরা সরাসরি উপকৃত হন।
সারসংক্ষেপ: যদিও পূর্ণাঙ্গ প্রজ্ঞাপন জারি না হওয়া পর্যন্ত সুনির্দিষ্ট অংক বলা কঠিন, তবে এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী—বেতন বৈষম্য কমানো এবং নিম্নগ্রেডের কর্মীদের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ানোই এই নতুন পে-স্কেলের মূল ভিত্তি।
