পে স্কেল নিউজ ২০২৬

নতুন পে-স্কেলে প্রথম ধাপে কত বাড়বে বেতন, বিশেষ সুবিধা বাদ দিলে নীট বৃদ্ধি কত—গ্রেডভিত্তিক হিসাব

সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন বেতন কাঠামো নিয়ে সবচেয়ে বেশি আলোচনার বিষয় এখন নতুন মূল বেতন, প্রথম ধাপে কত টাকা যোগ হবে এবং বিদ্যমান বিশেষ সুবিধা সমন্বয়ের পর প্রকৃত বা নীট বৃদ্ধি কত দাঁড়াবে। এ নিয়ে বিভিন্ন হিসাব ও চার্ট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ছে। তবে কোনো চার্টকে সরকারি প্রজ্ঞাপনের বিকল্প হিসেবে না দেখে সংশ্লিষ্ট প্রজ্ঞাপন ও অর্থ বিভাগের নির্দেশনার সঙ্গে মিলিয়ে দেখা গুরুত্বপূর্ণ।

সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের নতুন বেতন কাঠামোতে ২০টি গ্রেড বহাল রয়েছে। প্রথম গ্রেডের মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা এবং ২০তম গ্রেডের মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে ২০ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। নতুন কাঠামো ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের কথা জানানো হয়েছে।

চার্টে কী হিসাব দেখানো হয়েছে?

প্রদত্ত চার্টে পাঁচটি বিষয় পাশাপাশি দেখানো হয়েছে—

১. গ্রেড
২. নতুন মূল বেতন
৩. ১ম ধাপে বেতন বৃদ্ধি
৪. বিশেষ সুবিধা কর্তন
৫. নীট বেতন বৃদ্ধি

অর্থাৎ, শুধু নতুন মূল বেতন কত হলো—এটি দেখানোই চার্টটির উদ্দেশ্য নয়। বরং প্রথম ধাপে সম্ভাব্য বেতন বৃদ্ধির পর বিদ্যমান বিশেষ সুবিধা সমন্বয় করলে হাতে থাকা বৃদ্ধির পরিমাণ কত হতে পারে, সেটিও দেখানো হয়েছে।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ‘নীট বেতন বৃদ্ধি’ বলতে চার্টে মূল বেতন বৃদ্ধির সঙ্গে বিদ্যমান বিশেষ সুবিধা কর্তনের পর অবশিষ্ট বৃদ্ধিকে বোঝানো হয়েছে। এটি হাতে পাওয়া মোট নীট বেতন নয়; বরং প্রদত্ত হিসাব অনুযায়ী বেতন বৃদ্ধির নীট অংশ।


গ্রেড-১: নতুন মূল বেতন ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা

চার্ট অনুযায়ী গ্রেড-১-এর নতুন মূল বেতন ধরা হয়েছে ১,৫৬,০০০ টাকা। প্রথম ধাপে বেতন বৃদ্ধির হিসাব ৩১,২০০ টাকা। এর বিপরীতে বিশেষ সুবিধা কর্তন ধরা হয়েছে ৭,৮০০ টাকা।

ফলে হিসাবটি দাঁড়ায়—

৩১,২০০ – ৭,৮০০ = ২৩,৪০০ টাকা।

অর্থাৎ চার্টের হিসাবে গ্রেড-১-এর প্রথম ধাপে নীট বৃদ্ধি ২৩,৪০০ টাকা।

সরকারি নতুন কাঠামো সম্পর্কিত সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে গ্রেড-১-এর মূল বেতন ৭৮ হাজার থেকে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা হওয়ার তথ্যও এসেছে।

গ্রেড-২ ও ৩-এও উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি

চার্টে গ্রেড-২-এর নতুন মূল বেতন ১,৩২,০০০ টাকা। প্রথম ধাপে বৃদ্ধির হিসাব ২৬,৪০০ টাকা, বিশেষ সুবিধা কর্তন ৬,৬০০ টাকা এবং নীট বৃদ্ধি ১৯,৮০০ টাকা।

গ্রেড-৩-এর ক্ষেত্রে নতুন মূল বেতন ১,১৩,০০০ টাকা। প্রথম ধাপে বৃদ্ধি ২২,৬০০ টাকা, বিশেষ সুবিধা কর্তন ৫,৬৫০ টাকা এবং নীট বৃদ্ধি ১৬,৯৫০ টাকা।

অর্থাৎ উচ্চতর গ্রেডগুলোতে নতুন মূল বেতন বৃদ্ধির পাশাপাশি প্রথম ধাপেই উল্লেখযোগ্য অঙ্কের পার্থক্য তৈরি হচ্ছে।


গ্রেড-৪ থেকে ১০: ধাপে ধাপে কমছে বৃদ্ধির অঙ্ক

গ্রেড-৪-এ নতুন মূল বেতন ১ লাখ টাকা। প্রথম ধাপে বৃদ্ধি ২০,০০০ টাকা এবং বিশেষ সুবিধা কর্তন ৫,০০০ টাকা। ফলে চার্ট অনুযায়ী নীট বৃদ্ধি ১৫,০০০ টাকা।

গ্রেড-৫-এ নতুন মূল বেতন ৮৬,০০০ টাকা। প্রথম ধাপে বৃদ্ধি ১৭,২০০ টাকা, বিশেষ সুবিধা কর্তন ৪,৩০০ টাকা এবং নীট বৃদ্ধি ১২,৯০০ টাকা।

গ্রেড-৬-এ নতুন মূল বেতন ৭১,০০০ টাকা। প্রথম ধাপে বৃদ্ধি ১৪,২০০ টাকা, বিশেষ সুবিধা কর্তন ৩,৫৫০ টাকা এবং নীট বৃদ্ধি ১০,৬৫০ টাকা।

গ্রেড-৭-এ নতুন মূল বেতন ৫৮,০০০ টাকা। প্রথম ধাপে বৃদ্ধি ১১,৬০০ টাকা, বিশেষ সুবিধা কর্তন ২,৯০০ টাকা। নীট বৃদ্ধি দাঁড়ায় ৮,৭০০ টাকা।

গ্রেড-৮-এ নতুন মূল বেতন ৪৬,০০০ টাকা। প্রথম ধাপে বৃদ্ধি ৯,২০০ টাকা, বিশেষ সুবিধা কর্তন ২,৩০০ টাকা এবং নীট বৃদ্ধি ৬,৯০০ টাকা।

গ্রেড-৯-এ নতুন মূল বেতন ৪৪,০০০ টাকা। প্রথম ধাপে বৃদ্ধি ৮,৮০০ টাকা, বিশেষ সুবিধা কর্তন ২,২০০ টাকা এবং নীট বৃদ্ধি ৬,৬০০ টাকা।

গ্রেড-১০-এ নতুন মূল বেতন ৩২,০০০ টাকা। প্রথম ধাপে বৃদ্ধি ৮,০০০ টাকা, বিশেষ সুবিধা কর্তন ২,৮০০ টাকা এবং চার্ট অনুযায়ী নীট বৃদ্ধি ৫,২০০ টাকা।


১১ থেকে ২০তম গ্রেডে হিসাবটি আরও গুরুত্বপূর্ণ

নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামোর প্রভাব বোঝার ক্ষেত্রে ১১ থেকে ২০তম গ্রেডের হিসাব বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

চার্ট অনুযায়ী—

গ্রেডনতুন মূল বেতন১ম ধাপে বৃদ্ধিবিশেষ সুবিধা কর্তননীট বৃদ্ধি
১১২৫,০০০৬,২৫০১,৮৭৫৪,৩৭৫
১২২৪,০০০৬,৫০০১,৬২৫৪,৮৭৫
১৩২৪,০০০৬,৫০০১,৬২৫৪,৮৭৫
১৪২৩,৫০০৬,৬৫০১,৬৫০৫,০০০
১৫২২,৮০০৬,৫৫০১,৬০০৪,৯৫০
১৬২১,৯০০৬,৩০০১,৫০০৪,৮০০
১৭২১,৮০০৬,২০০১,৫০০৪,৭০০
১৮২১,০০০৬,১০০১,৫০০৪,৬০০
১৯২০,৫০০৬,০০০১,৫০০৪,৫০০
২০২০,০০০৫,৮৯৫১,৫০০৪,৩৯৫

নোট: উপরের সংখ্যাগুলো ব্যবহারকারীর দেওয়া চার্টের হিসাব অনুযায়ী উপস্থাপন করা হয়েছে।


গ্রেড-২০-এ নতুন মূল বেতন ২০ হাজার টাকা

চার্টের সর্বশেষ সারিতে রয়েছে গ্রেড-২০। এখানে নতুন মূল বেতন ধরা হয়েছে ২০,০০০ টাকা।

প্রথম ধাপে বেতন বৃদ্ধির পরিমাণ দেখানো হয়েছে ৫,৮৯৫ টাকা। বিশেষ সুবিধা কর্তনের পর নীট বৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ৪,৩৯৫ টাকা।

এটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ নতুন কাঠামোতে সর্বনিম্ন গ্রেডের মূল বেতন ৮,২৫০ টাকা থেকে ২০ হাজার টাকায় উন্নীত করার তথ্য সাম্প্রতিক প্রকাশিত প্রতিবেদনে এসেছে।


‘প্রথম ধাপে বৃদ্ধি’ আর ‘চূড়ান্ত বৃদ্ধি’ এক নয়

নতুন পে-স্কেল নিয়ে অনেকের মধ্যে বিভ্রান্তির অন্যতম কারণ হলো প্রথম ধাপের বেতন বৃদ্ধি এবং পূর্ণাঙ্গ নতুন বেতনকে একই বিষয় মনে করা।

প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, নতুন বেতন কাঠামো ধাপে ধাপে কার্যকর হওয়ার কথা বলা হয়েছে। একটি সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে প্রথম ধাপে ৯ম ও তদূর্ধ্ব গ্রেডে বর্ধিত মূল বেতনের ৪০ শতাংশ এবং ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডে ৫০ শতাংশ কার্যকর হওয়ার কথা; পরবর্তী ধাপে এ হার বাড়বে এবং ২০২৭ সালের ১ জুলাই থেকে পূর্ণাঙ্গ বর্ধিত মূল বেতন কার্যকর হওয়ার কথা।

সুতরাং কোনো কর্মচারী নতুন পে-স্কেলের চূড়ান্ত মূল বেতন দেখে প্রথম মাসেই একই পরিমাণ টাকা বেতন হিসেবে পাওয়ার হিসাব করলে ভুল হতে পারে।


বিশেষ সুবিধা কর্তনের বিষয়টি কেন গুরুত্বপূর্ণ?

বর্তমানে পাওয়া বিশেষ সুবিধা বা অন্যান্য সমন্বয় নতুন বেতন কাঠামো কার্যকরের সময় কীভাবে সমন্বিত হবে—এটি কর্মচারীদের প্রকৃত মাসিক বৃদ্ধির হিসাবের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

চার্টে এই কারণেই আলাদা একটি কলামে ‘বিশেষ সুবিধা কর্তন’ দেখানো হয়েছে। এরপর প্রথম ধাপের বেতন বৃদ্ধি থেকে ওই অঙ্ক বাদ দিয়ে ‘নীট বেতন বৃদ্ধি’ দেখানো হয়েছে।

যেমন গ্রেড-৮-এর ক্ষেত্রে—

প্রথম ধাপের বৃদ্ধি = ৯,২০০ টাকা
বিশেষ সুবিধা কর্তন = ২,৩০০ টাকা
নীট বৃদ্ধি = ৬,৯০০ টাকা

একইভাবে গ্রেড-৭-এর ক্ষেত্রে—

১১,৬০০ – ২,৯০০ = ৮,৭০০ টাকা।

অর্থাৎ শুধু ‘বেতন কত বাড়ছে’ বললে পূর্ণ চিত্র পাওয়া যায় না। সংশ্লিষ্ট সুবিধা ও সমন্বয়গুলোও হিসাবের মধ্যে আনতে হবে।


তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা

প্রদত্ত ছবির চার্টটি গ্রেডভিত্তিক হিসাবের একটি উপস্থাপন। এটিকে সরাসরি সরকারি প্রজ্ঞাপনের মূল বেতন-ভাতা হিসাব হিসেবে ব্যবহার করার আগে অর্থ বিভাগের প্রকাশিত মূল আদেশের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা উচিত।

কারণ সরকারি বেতন কাঠামোর ক্ষেত্রে শুধু মূল বেতন নয়—বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ভাতা, শিক্ষা সহায়ক সুবিধা, টিফিন/অন্যান্য ভাতা, জিপিএফ, কর, কর্তন, পেনশনযোগ্য বেতন এবং বাস্তবায়নের ধাপ—এসবের ওপরও চূড়ান্ত হাতে পাওয়া অর্থ নির্ভর করে।

অর্থ বিভাগের ওয়েবসাইটে ২০২৬ সালের বেতন কাঠামো ও সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রজ্ঞাপন/নোটিশ প্রকাশের ধারাবাহিকতা রয়েছে।


সার্বিক বিশ্লেষণ

প্রদত্ত চার্টের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—নতুন মূল বেতন এবং কর্মচারীর প্রকৃত বেতন বৃদ্ধির হিসাবকে আলাদা করে দেখানো হয়েছে।

চার্ট অনুযায়ী সর্বোচ্চ গ্রেডে প্রথম ধাপের নীট বৃদ্ধি ২৩,৪০০ টাকা, আর সর্বনিম্ন গ্রেডে ৪,৩৯৫ টাকা। মাঝের গ্রেডগুলোতে এই বৃদ্ধি ধাপে ধাপে পরিবর্তিত হয়েছে।

অন্যদিকে, নতুন জাতীয় বেতন কাঠামোর প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী ২০টি গ্রেড বহাল রেখে সর্বোচ্চ মূল বেতন ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা এবং সর্বনিম্ন মূল বেতন ২০ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। বাস্তবায়নও একাধিক ধাপে করার কথা বলা হয়েছে।

তাই সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হবে শুধু নতুন বেতন স্কেলের চূড়ান্ত মূল বেতন জানা নয়; বরং কোন তারিখ থেকে কত শতাংশ কার্যকর হবে, বিশেষ সুবিধা কীভাবে সমন্বয় হবে, কোন ভাতা কখন কার্যকর হবে এবং পে-ফিক্সেশনের পর iBAS++-এ কীভাবে নতুন বেতন নির্ধারিত হবে—এসব বিষয় একসঙ্গে দেখা।

সারকথা: প্রদত্ত চার্টটি নতুন পে-স্কেলের প্রথম ধাপে বেতন বৃদ্ধির একটি সহজ হিসাব তুলে ধরেছে। তবে ব্যক্তিভেদে প্রকৃত মাসিক বেতন নির্ধারণের সময় মূল বেতনের পাশাপাশি প্রযোজ্য ভাতা ও কর্তন বিবেচনা করতে হবে। তাই চার্টের ‘নীট বৃদ্ধি’কে সরাসরি ‘হাতে পাওয়া নীট বেতন’ হিসেবে ধরে নেওয়া ঠিক হবে না।

Source File

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *