জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে দেশের অভ্যন্তরীণ নৌপথে যাত্রী পরিবহনের ভাড়া পুনর্নির্ধারণ করেছে সরকার। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, প্রথম ১০০ কিলোমিটার পর্যন্ত জনপ্রতি প্রতি কিলোমিটারের ভাড়া ২ টাকা ৯৫ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৩ টাকা ১৭ পয়সা করা হয়েছে। আর ১০০ কিলোমিটারের বেশি দূরত্বের ক্ষেত্রে প্রতি কিলোমিটারে জনপ্রতি ভাড়া ২ টাকা ৫২ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ২ টাকা ৭১ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে।
একই সঙ্গে নৌযানে যাত্রী পরিবহনের সর্বনিম্ন জনপ্রতি ভাড়া ৩২ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩৫ টাকা করা হয়েছে। নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের জারি করা প্রজ্ঞাপনে এসব তথ্য জানানো হয়েছে। প্রজ্ঞাপনটি ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে প্রকাশিত হলেও এতে বলা হয়েছে, জনস্বার্থে পুনর্নির্ধারিত ভাড়া ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ থেকে কার্যকর হবে।
প্রথম ১০০ কিলোমিটারে প্রতি কিলোমিটারে ২২ পয়সা বৃদ্ধি
সরকারের নতুন ভাড়া কাঠামোতে প্রথম ১০০ কিলোমিটার দূরত্বের জন্য জনপ্রতি প্রতি কিলোমিটারে ২২ পয়সা ভাড়া বাড়ানো হয়েছে।
আগে এ দূরত্বের জন্য ভাড়া ছিল ২ টাকা ৯৫ পয়সা। নতুন নির্ধারিত হার অনুযায়ী তা হয়েছে ৩ টাকা ১৭ পয়সা।
অর্থাৎ—
পুরোনো ভাড়া: ২.৯৫ টাকা/কিমি
বৃদ্ধি: ০.২২ টাকা/কিমি
নতুন ভাড়া: ৩.১৭ টাকা/কিমি
ফলে কোনো যাত্রী প্রথম ১০০ কিলোমিটারের মধ্যে নির্দিষ্ট কোনো নৌপথে ভ্রমণ করলে আগের তুলনায় প্রতি কিলোমিটারে ২২ পয়সা বেশি ভাড়া প্রযোজ্য হবে।
উদাহরণ
ধরা যাক, কোনো নৌপথের দূরত্ব ৫০ কিলোমিটার। শুধু কিলোমিটারভিত্তিক নতুন হার দিয়ে হিসাব করলে—
৫০ × ৩.১৭ = ১৫৮.৫০ টাকা।
আগের হারে একই ৫০ কিলোমিটারের হিসাব ছিল—
৫০ × ২.৯৫ = ১৪৭.৫০ টাকা।
অর্থাৎ এই উদাহরণে কিলোমিটারভিত্তিক ভাড়া ১১ টাকা বাড়বে।
তবে প্রকৃত যাত্রীভাড়া নির্ধারণের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট নৌপথ, প্রযোজ্য ভাড়া কাঠামো এবং সর্বনিম্ন ভাড়ার বিধান বিবেচনা করতে হবে।
১০০ কিলোমিটারের বেশি দূরত্বে নতুন ভাড়া ২.৭১ টাকা
দীর্ঘ দূরত্বের নৌযাত্রীদের জন্যও ভাড়া বাড়ানো হয়েছে। ১০০ কিলোমিটারের বেশি দূরত্বের ক্ষেত্রে জনপ্রতি প্রতি কিলোমিটারে ভাড়া ২ টাকা ৫২ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ২ টাকা ৭১ পয়সা করা হয়েছে।
এ ক্ষেত্রে প্রতি কিলোমিটারে ভাড়া বেড়েছে ১৯ পয়সা।
অর্থাৎ—
| বিষয় | আগের হার | নতুন হার | বৃদ্ধি |
|---|---|---|---|
| প্রথম ১০০ কিমি | ২.৯৫ টাকা/কিমি | ৩.১৭ টাকা/কিমি | ২২ পয়সা |
| ১০০ কিমির বেশি | ২.৫২ টাকা/কিমি | ২.৭১ টাকা/কিমি | ১৯ পয়সা |
| সর্বনিম্ন ভাড়া | ৩২ টাকা | ৩৫ টাকা | ৩ টাকা |
এই নতুন হার লঞ্চসহ যাত্রী পরিবহনকারী সংশ্লিষ্ট নৌযানের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে। সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে নতুন হারকে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
সর্বনিম্ন যাত্রীভাড়া বেড়ে ৩৫ টাকা
নতুন প্রজ্ঞাপনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনগুলোর একটি হলো সর্বনিম্ন যাত্রীভাড়া ৩২ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩৫ টাকা করা।
অর্থাৎ খুব স্বল্প দূরত্বের যাত্রার ক্ষেত্রে কিলোমিটারভিত্তিক হিসাব ৩৫ টাকার নিচে এলেও নির্ধারিত সর্বনিম্ন ভাড়ার কারণে জনপ্রতি কমপক্ষে ৩৫ টাকা ভাড়া প্রযোজ্য হবে।
আগে যেখানে সর্বনিম্ন ভাড়া ছিল ৩২ টাকা, এখন সেখানে যাত্রীকে অন্তত ৩৫ টাকা দিতে হবে।
কেন বাড়ানো হলো নৌযানের ভাড়া?
সরকারি প্রজ্ঞাপনে ভাড়া পুনর্নির্ধারণের কারণ হিসেবে জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি উল্লেখ করা হয়েছে।
সম্প্রতি জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির পর সড়ক ও নৌপরিবহন খাতে পরিচালন ব্যয় বেড়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে নৌযানের যাত্রীভাড়াও পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে। সংবাদ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পর নৌযান মালিকদের সঙ্গে আলোচনার প্রেক্ষাপটেই নতুন ভাড়া নির্ধারণ করা হয়।
নৌযান পরিচালনায় ডিজেলসহ জ্বালানি একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যয় হওয়ায় জ্বালানির মূল্য পরিবর্তনের প্রভাব নৌপরিবহন খাতের পরিচালন ব্যয়ের ওপর পড়ে। নতুন ভাড়া সেই ব্যয় বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে নির্ধারণ করা হয়েছে।
ভাড়ার তালিকা টার্মিনাল ও নৌযানে প্রদর্শন বাধ্যতামূলক
শুধু ভাড়া বাড়ানো নয়, নতুন ভাড়ার হার যাত্রীদের সামনে দৃশ্যমান রাখার বিষয়েও প্রজ্ঞাপনে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, নির্ধারিত ভাড়ার হার সব নদীবন্দরের টার্মিনাল এবং নৌযানের দৃশ্যমান স্থানে আবশ্যিকভাবে প্রদর্শন করতে হবে।
এর ফলে যাত্রীরা নৌযানে ওঠার আগে অথবা টার্মিনালে অবস্থান করেই নির্ধারিত ভাড়া সম্পর্কে জানতে পারবেন।
এ বিষয়ে ২৯ সেপ্টেম্বর সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনাল পরিদর্শনের সময় নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রীও নির্ধারিত ভাড়ার তালিকা দৃশ্যমান স্থানে প্রদর্শন এবং অতিরিক্ত ভাড়া আদায় না করার নির্দেশ দিয়েছেন বলে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।
অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করা যাবে না
নতুন ভাড়া কার্যকর হওয়ার পর নির্ধারিত হারের বাইরে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের সুযোগ নেই। নৌযানে যাত্রীদের কাছ থেকে নির্ধারিত ভাড়ার বেশি অর্থ নেওয়া হলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছেন নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী।
তাই যাত্রীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, যাত্রার আগে টার্মিনাল বা নৌযানে প্রদর্শিত সরকার নির্ধারিত ভাড়ার তালিকা দেখে ভাড়া সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া।
আগের ভাড়া সংক্রান্ত আদেশ রহিত
নতুন প্রজ্ঞাপনে নৌযানের ভাড়া নির্ধারণসংক্রান্ত ইতঃপূর্বে জারি করা সব প্রজ্ঞাপন ও আদেশ রহিত করার কথা বলা হয়েছে। ফলে সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে নতুন পুনর্নির্ধারিত ভাড়াই কার্যকর ভাড়া হিসেবে বিবেচিত হবে।
২৪ সেপ্টেম্বর থেকে কার্যকর—প্রজ্ঞাপন প্রকাশ ২৯ সেপ্টেম্বর
এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে লক্ষণীয়। প্রজ্ঞাপনটির তারিখ ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ হলেও সেখানে বলা হয়েছে, জনস্বার্থে পুনর্নির্ধারিত ভাড়া ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ থেকে কার্যকর হবে। সাম্প্রতিক সংবাদ প্রতিবেদনগুলোতেও ২৪ সেপ্টেম্বরকে কার্যকরের তারিখ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
অর্থাৎ প্রজ্ঞাপন প্রকাশের তারিখ এবং কার্যকর হওয়ার তারিখ এক নয়—যাত্রীদের ক্ষেত্রে কার্যকর তারিখ হিসেবে ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ উল্লেখ করা হয়েছে।
যাত্রীদের জন্য নতুন ভাড়ার সারাংশ
নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী নৌযানে যাত্রী পরিবহনে—
প্রথম ১০০ কিলোমিটার:
প্রতি কিলোমিটারে জনপ্রতি ৩ টাকা ১৭ পয়সা।
১০০ কিলোমিটারের বেশি:
প্রতি কিলোমিটারে জনপ্রতি ২ টাকা ৭১ পয়সা।
সর্বনিম্ন যাত্রীভাড়া:
জনপ্রতি ৩৫ টাকা।
আগের সর্বনিম্ন ভাড়া:
৩২ টাকা।
সর্বনিম্ন ভাড়া বৃদ্ধি:
৩ টাকা।
কার্যকর তারিখ:
২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬।
ভাড়ার তালিকা:
নদীবন্দরের টার্মিনাল ও নৌযানের দৃশ্যমান স্থানে প্রদর্শন বাধ্যতামূলক।
শেষ কথা
জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে নৌযানে যাত্রী পরিবহনের নতুন ভাড়া কাঠামো কার্যকর হওয়ায় দেশের বিভিন্ন নৌপথে চলাচলকারী যাত্রীদের পরিবহন ব্যয় বাড়বে। বিশেষ করে প্রথম ১০০ কিলোমিটারে প্রতি কিলোমিটারে ২২ পয়সা এবং ১০০ কিলোমিটারের বেশি দূরত্বে ১৯ পয়সা বৃদ্ধির কারণে দূরত্ব যত বাড়বে, মোট ভাড়ার পার্থক্যও তত বাড়বে। একই সঙ্গে স্বল্প দূরত্বের যাত্রীদের জন্য সর্বনিম্ন ভাড়া ৩২ টাকা থেকে ৩৫ টাকা হওয়ায় ন্যূনতম যাত্রা ব্যয়ও বেড়েছে।
সরকারি প্রজ্ঞাপনের মূল উদ্দেশ্য হলো জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে নৌযানের যাত্রীভাড়া নতুন করে নির্ধারণ করা এবং নির্ধারিত ভাড়া টার্মিনাল ও নৌযানে প্রকাশ্যভাবে প্রদর্শনের মাধ্যমে ভাড়া আদায়ে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা।

