পেনশনে থাকা অবস্থায় কোনো সরকারি কর্মচারীর মৃত্যু হলে তাঁর পরিবারের সদস্যরা বাংলাদেশ কর্মচারী কল্যাণ বোর্ডের বিভিন্ন সুবিধা পাওয়ার সুযোগ রাখেন। বিশেষ করে মৃত পেনশনভোগীর স্ত্রী বা পরিবার দাফন ও অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া অনুদান এবং নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ হলে মাসিক কল্যাণ অনুদানের জন্য আবেদন করতে পারেন। তবে কোন সুবিধা কতদিন পাওয়া যাবে—এ বিষয়ে অবসরের তারিখ, মৃত্যুর সময় বয়স এবং অন্যান্য নির্ধারিত শর্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশ কর্মচারী কল্যাণ বোর্ডের (বিকেকেবি) বর্তমান তথ্য অনুযায়ী, সরকারি ও বোর্ডের তালিকাভুক্ত স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের কর্মরত, অক্ষম, অবসরপ্রাপ্ত ও মৃত কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং তাঁদের পরিবারের সদস্যরা নির্দিষ্ট কল্যাণমূলক সেবার আওতাভুক্ত।
দাফন-কাফনের জন্য ৫০ হাজার টাকা
পেনশনভোগী বা অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারী মারা গেলে তাঁর পরিবার দাফন বা অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া অনুদানের জন্য আবেদন করতে পারে। বর্তমানে এ অনুদানের পরিমাণ ৫০ হাজার টাকা।
বাংলাদেশ কর্মচারী কল্যাণ বোর্ডের বর্তমান সেবা তথ্যে বলা হয়েছে, সরকারি কর্মচারী চাকরিরত অবস্থায় অথবা অবসরের পর ৭৫ বছর বয়সের মধ্যে মৃত্যুবরণ করলে তাঁর পরিবার—অথবা পরিবারের অনুপস্থিতিতে যিনি দাফন/সৎকারের ব্যয়ভার বহন করেছেন—নির্ধারিত শর্তে এই অনুদান পেতে পারেন।
অর্থাৎ, শুধু চাকরিতে থাকা কর্মচারীর মৃত্যুর ক্ষেত্রেই দাফন অনুদান সীমাবদ্ধ নয়; অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারীর মৃত্যুর ক্ষেত্রেও এর সুযোগ রয়েছে।
১৯ আগস্ট ২০২৫ থেকে অনুদানের হার বেড়েছে
দাফন অনুদানের বর্তমান ৫০ হাজার টাকা নিয়ে অনেকের মধ্যে বিভ্রান্তি রয়েছে। কারণ আগে এই অনুদানের পরিমাণ কম ছিল।
বাংলাদেশ কর্মচারী কল্যাণ বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ১৯ আগস্ট ২০২৫-এর আগে কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী মারা গেলে তাঁর পরিবারের জন্য দাফন অনুদান ছিল ৩০ হাজার টাকা। আর ১৯ আগস্ট ২০২৫ বা তার পরবর্তী সময়ে মৃত্যু হলে দাফন অনুদানের পরিমাণ ৫০ হাজার টাকা।
তাই বর্তমানে প্রযোজ্য নিয়মে যোগ্য কোনো পেনশনভোগী মারা গেলে তাঁর পরিবার ৫০ হাজার টাকার দাফন/অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া অনুদানের জন্য আবেদন করতে পারে।
স্ত্রী কি মাসিক ৩ হাজার টাকা কল্যাণ অনুদান পাবেন?
এখানেই সবচেয়ে বেশি ভুল তথ্য ছড়ায়। অনেক সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বলা হয়, পেনশনভোগী স্বামী মারা গেলেই তাঁর স্ত্রী আজীবন বা নির্দিষ্টভাবে মাসিক ৩ হাজার টাকা পাবেন। বাস্তবে বিষয়টি শর্তসাপেক্ষ।
বর্তমান সরকারি তথ্য অনুযায়ী, কোনো কর্মচারী চাকরিরত অবস্থায় মারা গেলে অথবা অবসর গ্রহণের তারিখ থেকে ১০ বছরের মধ্যে মারা গেলে তাঁর পরিবার মাসিক কল্যাণ অনুদানের জন্য যোগ্য হতে পারে। এই অনুদানের বর্তমান হার মাসিক ৩ হাজার টাকা।
বোর্ডের নিয়ম অনুযায়ী, মাসিক কল্যাণ অনুদান সর্বোচ্চ ১৫ বছর অথবা কর্মচারীর অবসর গ্রহণের তারিখ থেকে ১০ বছর পর্যন্ত—যেটি আগে হয়—সেই সময়সীমায় প্রদান করা হয়।
একটি উদাহরণ
ধরা যাক, কোনো সরকারি কর্মচারী ২০২৬ সালে অবসর নিলেন। অবসরের পর ১০ বছরের মধ্যে, অর্থাৎ ২০৩৬ সালের আগে তাঁর মৃত্যু হলে তাঁর পরিবার নির্ধারিত শর্ত পূরণ সাপেক্ষে মাসিক কল্যাণ অনুদানের সুবিধা পাওয়ার সুযোগ রাখবে।
অন্যদিকে, অবসরের ১০ বছর পার হওয়ার পর তাঁর মৃত্যু হলে শুধু এই কারণে পরিবার মাসিক কল্যাণ অনুদানের নতুন দাবি করতে পারবে—এমনটি বলা যাবে না।
তাই দাফন অনুদান এবং মাসিক কল্যাণ অনুদানকে একই নিয়মে দেখা যাবে না।
দাফন অনুদান পেতে ১০ বছরের শর্ত কি আছে?
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ও পার্থক্য রয়েছে। পুরোনো বিভিন্ন নথি বা পোস্টে অবসরের পর ১০ বছরের শর্তের সঙ্গে দাফন অনুদানের তথ্য পাওয়া যায়। কিন্তু বাংলাদেশ কর্মচারী কল্যাণ বোর্ডের বর্তমান অনলাইন সেবা তথ্যে সরকারি কর্মচারীর চাকরিরত বা অবসর-পরবর্তী মৃত্যুর ক্ষেত্রে ৭৫ বছর বয়সের সীমা উল্লেখ করা হয়েছে।
অন্যদিকে মাসিক কল্যাণ অনুদানের ক্ষেত্রে অবসরের পর ১০ বছরের শর্ত স্পষ্টভাবে প্রযোজ্য।
সুতরাং, কোনো পেনশনভোগীর স্ত্রী তাঁর স্বামীর মৃত্যুর পর কোন কোন সুবিধা পাবেন, তা নির্ধারণের সময় দাফন অনুদান ও মাসিক কল্যাণ অনুদানের শর্ত আলাদাভাবে বিবেচনা করতে হবে।
সাধারণ চিকিৎসা অনুদানও কি পাওয়া যায়?
বাংলাদেশ কর্মচারী কল্যাণ বোর্ডের অধীনে সাধারণ চিকিৎসা অনুদানসহ বিভিন্ন কল্যাণমূলক সেবা রয়েছে। তবে পেনশনভোগীর মৃত্যুর পর তাঁর স্ত্রী স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রতিবছর চিকিৎসা অনুদান পাবেন—এমন সিদ্ধান্ত শুধু দাফন ও মাসিক কল্যাণ অনুদানের নিয়ম থেকে বলা যায় না।
চিকিৎসা অনুদানের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সেবার পৃথক যোগ্যতা, আবেদন পদ্ধতি ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র রয়েছে। তাই কোনো পরিবার এ সুবিধা দাবি করতে চাইলে সংশ্লিষ্ট অফিস বা বাংলাদেশ কর্মচারী কল্যাণ বোর্ডের নির্ধারিত নিয়ম অনুসরণ করা উচিত। বোর্ডের ওয়েবসাইটে কল্যাণ, যৌথবীমা, দাফন অনুদান এবং চিকিৎসা অনুদানসহ বিভিন্ন সেবার পৃথক নির্দেশনা রয়েছে।
স্ত্রীকে কী করতে হবে?
পেনশনভোগী স্বামীর মৃত্যুর পর স্ত্রী বা বৈধ আবেদনকারীকে সংশ্লিষ্ট সুবিধার জন্য আবেদন করতে হবে। বাংলাদেশ কর্মচারী কল্যাণ বোর্ডের অনলাইন ব্যবস্থায় অবসরপ্রাপ্ত বা মৃত কর্মচারীর জন্য নিবন্ধন ও আবেদন করার ব্যবস্থা রয়েছে। সেখানে কর্মচারীর অবসর গ্রহণের তারিখ, মৃত্যুর তারিখ, জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য এবং আবেদনকারীর তথ্যসহ প্রয়োজনীয় তথ্য দিতে হয়।
দাফন অনুদানের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের মধ্যে কর্মচারী ও আবেদনকারীর জাতীয় পরিচয়পত্রের কপি এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য দলিল থাকতে পারে। পরিবারের অনুপস্থিতিতে অন্য কেউ দাফনের ব্যয় বহন করলে নির্ধারিত কর্তৃপক্ষের প্রত্যয়নও প্রয়োজন হতে পারে।
টাকা কীভাবে দেওয়া হয়?
বাংলাদেশ কর্মচারী কল্যাণ বোর্ডের সেবা ব্যবস্থায় অনুমোদিত অনুদানের অর্থ আবেদনকারীর ব্যাংক হিসাবে EFT-এর মাধ্যমে সরাসরি পাঠানোর ব্যবস্থা রয়েছে। সরকারি সেবা তথ্য অনুযায়ী এসব সেবার জন্য কোনো সেবা মূল্য বা ফি নেওয়ার কথা নেই।
বর্তমানে অনলাইনে আবেদন প্রক্রিয়াও চালু রয়েছে। বোর্ডের ওয়েবসাইটের অভ্যন্তরীণ ই-সেবা থেকে কল্যাণ, যৌথবীমা ও দাফন/অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া অনুদানের অনলাইন সেবায় প্রবেশ করা যায়।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো এক নজরে
পেনশনভোগী সরকারি কর্মচারী মারা গেলে তাঁর পরিবারকে বিষয়গুলো এভাবে মনে রাখা উচিত—
দাফন/অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া অনুদান:
বর্তমান হার ৫০,০০০ টাকা। ৭৫ বছর বয়সের মধ্যে মৃত্যুর ক্ষেত্রে নির্ধারিত শর্ত পূরণ সাপেক্ষে প্রযোজ্য।
মাসিক কল্যাণ অনুদান:
বর্তমান হার মাসে ৩,০০০ টাকা। তবে অবসর গ্রহণের তারিখ থেকে ১০ বছরের মধ্যে মৃত্যুসহ নির্ধারিত শর্ত পূরণ করতে হবে।
পুরোনো দাফন অনুদানের হার:
১৯ আগস্ট ২০২৫-এর আগে মৃত্যু হলে ৩০ হাজার টাকা এবং ১৯ আগস্ট ২০২৫ বা পরে মৃত্যু হলে ৫০ হাজার টাকা প্রযোজ্য।
আবেদন:
নির্ধারিত অনলাইন ব্যবস্থায় আবেদন করা যায় এবং প্রয়োজনীয় তথ্য ও কাগজপত্র দিতে হয়।
শেষ কথা
পেনশনে থাকা অবস্থায় স্বামী মারা গেলে তাঁর স্ত্রী একেবারেই কোনো সরকারি কল্যাণ সুবিধা পাবেন না—এ ধারণা সঠিক নয়। বরং বাংলাদেশ কর্মচারী কল্যাণ বোর্ডের বর্তমান নিয়মে যোগ্যতা ও নির্ধারিত শর্ত পূরণ করলে দাফন/অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া বাবদ ৫০ হাজার টাকা পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে অবসরের পর ১০ বছরের মধ্যে মৃত্যু হলে পরিবার মাসিক ৩ হাজার টাকা কল্যাণ অনুদানেরও যোগ্য হতে পারে।
তবে প্রতিটি পরিবারের পরিস্থিতি এক নয়। বিশেষ করে স্বামীর অবসরের তারিখ, মৃত্যুর তারিখ, মৃত্যুর সময় বয়স এবং কর্মচারীর চাকরির ধরন যাচাই করে সুবিধা নির্ধারণ করা হয়। তাই শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্টের ওপর নির্ভর না করে মৃত পেনশনভোগীর সংশ্লিষ্ট অফিস এবং বাংলাদেশ কর্মচারী কল্যাণ বোর্ডের সর্বশেষ নির্দেশনা অনুযায়ী আবেদন করাই সবচেয়ে নিরাপদ।
সারকথা: পেনশনভোগী স্বামী মারা গেলে স্ত্রী শর্ত পূরণ সাপেক্ষে দাফন-কাফনের জন্য ৫০ হাজার টাকা পেতে পারেন; আর অবসরের ১০ বছরের মধ্যে মৃত্যু হলে মাসিক ৩ হাজার টাকা কল্যাণ অনুদানেরও সুযোগ রয়েছে।

