নিজের পৈতৃক সম্পত্তির নামজারি করতে গিয়ে বণ্টননামা দলিলের জন্য অপেক্ষা করতে হচ্ছে না অনেক উত্তরাধিকারীকে। উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া জমির সব ওয়ারিশের নামে যৌথ নামজারি করার ক্ষেত্রে বণ্টননামা দলিল ছাড়াই আবেদন করার সুযোগ রয়েছে। ভূমি মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনার ফলে জমির রেকর্ড হালনাগাদে দীর্ঘদিনের একটি প্রচলিত জটিলতা সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া গেছে। তবে জমি ভাগ করে পৃথক খতিয়ান করতে চাইলে বণ্টননামা দলিলের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।
বাংলাদেশে পৈতৃক জমির মালিকানা ও নামজারি নিয়ে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি দীর্ঘদিনের। পরিবারের কোনো সদস্য মারা যাওয়ার পর তাঁর রেখে যাওয়া জমি একাধিক উত্তরাধিকারীর মধ্যে বণ্টিত হওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রে পারিবারিক সমঝোতা হয় না। আবার জমির ভাগ নিয়ে মতবিরোধ থাকায় বণ্টননামা দলিল তৈরি করাও সম্ভব হয় না। ফলে জমির রেকর্ড হালনাগাদ করতে গিয়ে সমস্যায় পড়েন উত্তরাধিকারীরা।
এ পরিস্থিতিতে উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া জমির যৌথ নামজারির নিয়ম জানা থাকলে অনেকের জন্য ভূমিসেবা গ্রহণ সহজ হতে পারে। তবে বিষয়টি বুঝতে হলে যৌথ নামজারি এবং পৃথক নামজারির পার্থক্য পরিষ্কারভাবে জানা জরুরি।
বণ্টননামা ছাড়াই কীভাবে নামজারি করা যায়?
ভূমি মন্ত্রণালয়ের ২০২৪ সালের ১৭ ডিসেম্বর জারি করা পরিপত্রে উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া সম্পত্তির নামজারি নিয়ে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এ নির্দেশনা অনুযায়ী, মৃত ব্যক্তির সব ওয়ারিশের নামে তাঁদের প্রাপ্য হিস্যা উল্লেখ করে একটি খতিয়ানে যৌথ নামজারি করার ক্ষেত্রে নিবন্ধিত বণ্টননামা দলিল বাধ্যতামূলক নয়।
অর্থাৎ, কোনো ব্যক্তি মৃত্যুর পর তাঁর রেখে যাওয়া জমির সব বৈধ ওয়ারিশ যদি যৌথভাবে নিজেদের নাম ভূমি রেকর্ডে অন্তর্ভুক্ত করতে চান, তাহলে কেবল বণ্টননামা দলিল নেই—এই কারণে তাঁদের আবেদন বাতিল করার কথা নয়।
এ ক্ষেত্রে ওয়ারিশ সনদসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিতে হবে। সংশ্লিষ্ট ভূমি অফিস আবেদন যাচাই করে মালিকানার ধারাবাহিকতা, উত্তরাধিকারীদের পরিচয় এবং তাঁদের প্রাপ্য হিস্যা বিবেচনা করবে।
এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বণ্টননামা ছাড়া যৌথ নামজারির সুযোগ থাকলেও জমির নির্দিষ্ট অংশ আলাদা করে প্রত্যেকের নামে পৃথক খতিয়ান করার বিষয়টি ভিন্ন।
যৌথ নামজারি ও পৃথক নামজারির মধ্যে পার্থক্য
পৈতৃক সম্পত্তির নামজারি করতে গিয়ে অনেকেই যৌথ নামজারি এবং পৃথক নামজারিকে একই বিষয় মনে করেন। কিন্তু বাস্তবে এ দুটির মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে।
যৌথ নামজারির ক্ষেত্রে সব ওয়ারিশের নাম একই খতিয়ানে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। সেখানে প্রত্যেকের আইনগত প্রাপ্য হিস্যা উল্লেখ থাকতে পারে। জমি আনুষ্ঠানিকভাবে ভাগ না হলেও উত্তরাধিকারীরা নিজেদের অংশ অনুযায়ী যৌথ মালিকানা বজায় রাখতে পারেন।
অন্যদিকে, পৃথক নামজারির ক্ষেত্রে প্রত্যেক ওয়ারিশের জমির নির্দিষ্ট অংশ আলাদা করে রেকর্ডভুক্ত করার প্রয়োজন হয়। জমি ভাগ করে পৃথক খতিয়ান তৈরির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নিয়ম অনুযায়ী নিবন্ধিত বণ্টননামা দলিল প্রয়োজন হয়।
তাই কেউ যদি দাবি করেন, এখন থেকে পৈতৃক জমির নামজারির জন্য কোনো অবস্থাতেই বণ্টননামা লাগবে না, তাহলে সেটি সঠিক ব্যাখ্যা হবে না। বরং সঠিক বিষয়টি হলো, যৌথ নামজারির জন্য বণ্টননামা সব ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক নয়।
একটি উদাহরণে বিষয়টি বুঝে নিন
ধরা যাক, একজন ব্যক্তি মৃত্যুর আগে ৯০ শতক জমি রেখে গেছেন। তাঁর তিনজন আইনগত ওয়ারিশ রয়েছেন। কিন্তু ওয়ারিশদের মধ্যে এখনো জমি ভাগ-বণ্টন হয়নি।
এ অবস্থায় তাঁরা যদি যৌথভাবে জমির রেকর্ড নিজেদের নামে হালনাগাদ করতে চান, তাহলে প্রযোজ্য নিয়ম অনুসরণ করে যৌথ নামজারির আবেদন করতে পারেন। এজন্য প্রথমেই জমি তিনটি আলাদা অংশে ভাগ করে বণ্টননামা দলিল তৈরি করা বাধ্যতামূলক নয়।
তবে তিনজনের প্রত্যেকের সমান ৩০ শতক জমি পাওয়ার বিষয়টি ধরে নেওয়া যাবে না। উত্তরাধিকার আইন অনুযায়ী তাঁদের প্রকৃত প্রাপ্য হিস্যা নির্ধারিত হবে।
আবার ওয়ারিশরা যদি জমির নির্দিষ্ট অংশ নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নিয়ে আলাদা আলাদা খতিয়ান করতে চান, তাহলে জমির বণ্টন আইনসম্মতভাবে সম্পন্ন করার প্রয়োজন হবে। সে ক্ষেত্রে নিবন্ধিত বণ্টননামা দলিলসহ প্রযোজ্য কাগজপত্র জমা দিতে হতে পারে।
নামজারির আবেদনে কী কী কাগজপত্র প্রয়োজন হতে পারে?
পৈতৃক সম্পত্তির নামজারির ক্ষেত্রে জমির মালিকানা ও উত্তরাধিকার প্রমাণের জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র প্রস্তুত রাখা উচিত। সাধারণত পরিস্থিতি অনুযায়ী নিচের নথিগুলো প্রয়োজন হতে পারে:
- মৃত ব্যক্তির মৃত্যু সনদ।
- সব বৈধ ওয়ারিশের নাম উল্লেখ করা ওয়ারিশ সনদ।
- আবেদনকারীর জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য।
- জমির পূর্ববর্তী খতিয়ান ও দাগ নম্বর।
- জমির মালিকানার ধারাবাহিকতা প্রমাণের জন্য প্রাসঙ্গিক দলিলপত্র।
- প্রয়োজন অনুযায়ী ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধের তথ্য।
- জমি ভাগ করে পৃথক খতিয়ান করতে চাইলে নিবন্ধিত বণ্টননামা দলিলসহ প্রাসঙ্গিক নথি।
সব আবেদনের ক্ষেত্রে প্রতিটি কাগজ একইভাবে বাধ্যতামূলক নয়। জমির রেকর্ড, মালিকানার ইতিহাস, আবেদনের ধরন এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের যাচাই অনুযায়ী অতিরিক্ত নথির প্রয়োজন হতে পারে।
কোনো ওয়ারিশের সম্মতি না থাকলে কী হবে?
উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া জমিতে একাধিক ওয়ারিশের অধিকার থাকতে পারে। তাঁদের মধ্যে কেউ জমি ভাগ করতে চাইলে এবং অন্য কেউ তাতে রাজি না হলে বিরোধ তৈরি হতে পারে।
এ ধরনের পরিস্থিতিতে যৌথ মালিকানার রেকর্ড হালনাগাদ এবং জমির সুনির্দিষ্ট অংশ ভাগ করে নেওয়ার বিষয়টি আলাদাভাবে বিবেচনা করতে হবে। কোনো ওয়ারিশকে বাদ দিয়ে অন্যদের নামে পুরো সম্পত্তি রেকর্ড করার চেষ্টা করা উচিত নয়।
মালিকানা, উত্তরাধিকারীদের পরিচয় বা প্রাপ্য হিস্যা নিয়ে বিরোধ থাকলে সংশ্লিষ্ট ভূমি অফিসে বিষয়টি জানাতে হবে। প্রয়োজন হলে আইনজীবীর পরামর্শ নিয়ে উপযুক্ত আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করা যেতে পারে।
নামজারি করতে কোথায় আবেদন করবেন?
উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া জমির নামজারির জন্য সরকারি অনলাইন ভূমিসেবা ব্যবস্থার মাধ্যমে আবেদন করা যায়। আবেদন করার আগে জমির খতিয়ান, দাগ নম্বর, পূর্ববর্তী মালিকানার তথ্য এবং ওয়ারিশ সনদ প্রস্তুত রাখা ভালো।
সরকারি ভূমিসেবা পোর্টাল: https://land.gov.bd/
আবেদনের সময় জমিটি যৌথভাবে নামজারি করতে চান, নাকি বণ্টনের মাধ্যমে পৃথক খতিয়ান করতে চান, তা পরিষ্কারভাবে উল্লেখ করা প্রয়োজন। এতে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সম্পর্কে ধারণা পাওয়া সহজ হবে।
নামজারি করলেই কি জমির চূড়ান্ত মালিকানা নিশ্চিত হয়?
এ বিষয়ে সতর্ক থাকা জরুরি। নামজারি হলো ভূমি রেকর্ড হালনাগাদের প্রশাসনিক প্রক্রিয়া। এটি নিজে থেকেই সব ধরনের মালিকানা বিরোধের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি করে না।
জমির মালিকানা নির্ধারণে মূল দলিল, উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত অধিকার, পূর্ববর্তী রেকর্ড এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক প্রমাণ গুরুত্বপূর্ণ। তাই নামজারি করার সময় সঠিক তথ্য ও প্রয়োজনীয় নথি জমা দেওয়া উচিত।
উত্তরাধিকারীদের জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ এই নিয়ম?
বণ্টননামা ছাড়াই যৌথ নামজারির সুযোগ থাকায় যেসব পরিবার এখনো জমি ভাগ করতে পারেনি, তারা প্রযোজ্য নিয়ম মেনে ভূমি রেকর্ড হালনাগাদের উদ্যোগ নিতে পারে। এতে বণ্টন নিয়ে সমঝোতা না হওয়া পর্যন্ত সব ক্ষেত্রে নামজারি বন্ধ রাখার প্রয়োজন পড়ে না।
একই সঙ্গে সব বৈধ ওয়ারিশের নাম এবং তাঁদের প্রাপ্য হিস্যা রেকর্ডে অন্তর্ভুক্ত করার সুযোগ উত্তরাধিকারীদের অধিকার সংরক্ষণে সহায়ক হতে পারে।
তবে এ সুবিধাকে জমি ভাগ করে পৃথক মালিকানা প্রতিষ্ঠার সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা যাবে না। জমির নির্দিষ্ট অংশ আলাদা করা, পৃথক খতিয়ান তৈরি কিংবা মালিকানা নিয়ে বিরোধ নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট আইন ও বিধি অনুসরণ করতে হবে।
শেষ কথা
পৈতৃক জমির নামজারিতে বণ্টননামা দলিল নিয়ে বিভ্রান্তি দূর করতে যৌথ নামজারি ও পৃথক নামজারির পার্থক্য জানা জরুরি। উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া জমির সব বৈধ ওয়ারিশের নামে যৌথ নামজারি করতে বণ্টননামা দলিল সব ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক নয়। কিন্তু জমি ভাগ করে পৃথক খতিয়ান তৈরি করতে চাইলে নিবন্ধিত বণ্টননামা প্রয়োজন হতে পারে।
তাই পৈতৃক সম্পত্তির নামজারি করতে গিয়ে শুধু বণ্টননামা দলিল নেই বলে আবেদন করা যাবে না—এমন ধারণা থেকে বিরত থাকুন। নিজের জমির অবস্থা যাচাই করে সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী আবেদন করুন এবং প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট ভূমি অফিসের পরামর্শ নিন।

