প্রাথমিক থেকে স্নাতক শিক্ষা

‘বড়’ নাকি ‘বড়ো’—কোন বানানটি শুদ্ধ? বাংলা একাডেমির অভিধান ও প্রচলিত ব্যবহারে যা জানা জরুরি

বাংলা লেখালেখিতে ‘বড়’ নাকি ‘বড়ো’—কোন বানানটি প্রমিত, তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা রয়েছে। দৈনন্দিন লেখালেখি, সংবাদপত্র, সাহিত্যচর্চা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘বড়’ বানানটির ব্যবহার বেশি দেখা যায়। অন্যদিকে, বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধানে ‘বড়ো’ বানানটি অন্তর্ভুক্ত থাকায় অনেকের মনে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে—তাহলে ‘বড়’ লেখা কি ভুল?

ভাষাবিষয়ক লেখক ড. মোহাম্মদ আমীনের উপস্থাপিত বিশ্লেষণে বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। তাঁর বক্তব্যের মূল কথা হলো, ‘বড়’ বানানকে সরাসরি ভুল বলা সমীচীন নয়। কারণ, প্রচলিত ব্যবহার, বিভিন্ন অভিধানের ভুক্তি এবং বানানবিধির প্রয়োগ বিবেচনা না করে কোনো একটি বানানকে ভুল ঘোষণা করা উচিত নয়।

‘বড়’ ও ‘বড়ো’: বিতর্কের মূল কারণ কী?

বাংলা ভাষায় কোনো শব্দের উচ্চারণ, প্রচলিত বানান এবং অভিধানে স্বীকৃত রূপের মধ্যে কখনো কখনো পার্থক্য দেখা যায়। ‘বড়’ ও ‘বড়ো’ শব্দের ক্ষেত্রেও সেই প্রশ্ন সামনে এসেছে।

সাধারণভাবে কোনো ব্যক্তি, বস্তু, বয়স, আকার কিংবা গুরুত্ব বোঝাতে আমরা ‘বড়’ শব্দটি ব্যবহার করি। যেমন—বড় বাড়ি, বড় ভাই, বড় সমস্যা, বড় সিদ্ধান্ত ও বড় প্রতিষ্ঠান। এসব ক্ষেত্রে ‘বড়’ বানানটি বাংলা লেখালেখিতে বহুল পরিচিত।

অন্যদিকে, ‘বড়ো’ বানানটিও বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধানে স্থান পেয়েছে বলে ড. মোহাম্মদ আমীন উল্লেখ করেছেন। ফলে অভিধানভিত্তিক বানান অনুসরণ করতে গিয়ে অনেকে ‘বড়ো’ লিখছেন।

এখানে মূল প্রশ্ন শুধু কোন বানানটি বেশি ব্যবহৃত হয়, তা নয়; বরং কোন বানানকে কোন ভিত্তিতে প্রমিত বা অপ্রমিত বলা হচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলা একাডেমির অভিধানে ‘বড়ো’ কেন গুরুত্বপূর্ণ?

বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধান বাংলা শব্দের অর্থ, বানান ও ব্যবহার নির্ধারণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রামাণ্য গ্রন্থ। ড. মোহাম্মদ আমীনের আলোচনায় বলা হয়েছে, এই অভিধানে ‘বড়ো’ বানানটি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে, কিন্তু ‘বড়’ বানানটি স্বতন্ত্র ভুক্তি হিসেবে রাখা হয়নি।

অভিধানের এই উপস্থাপনাকে গুরুত্ব দিয়ে কেউ ‘বড়ো’ লিখতে পারেন। তবে একটি অভিধানে কোনো রূপের অন্তর্ভুক্তি এবং অন্য একটি বানানকে সর্বক্ষেত্রে ভুল ঘোষণা করা এক বিষয় নয়। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট অভিধানের সংস্করণ, বানানবিষয়ক নির্দেশনা এবং অন্যান্য প্রামাণ্য অভিধানের তথ্যও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।

ড. মোহাম্মদ আমীন জানিয়েছেন, তিনি বর্তমানে ‘বড়ো’ লেখেন। তবে তাঁর ব্যাখ্যায়, এর পেছনে একমাত্র উদ্দেশ্য ‘বড়’ বানানকে ভুল প্রমাণ করা নয়; বরং বাংলা একাডেমি প্রকাশিত অভিধানের ভুক্তি অনুসরণ করে সমতা প্রতিষ্ঠার একটি দৃষ্টিভঙ্গিও রয়েছে।

‘বড়’ লিখলে কি ভুল হবে?

ড. মোহাম্মদ আমীনের বক্তব্য অনুযায়ী, ‘বড়’ লিখলেই তা ভুল হয়ে যায়—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর যথেষ্ট ভিত্তি নেই। তাঁর যুক্তি হলো, বিভিন্ন অভিধানে ‘বড়’ বানানটির প্রচলন এবং দীর্ঘদিনের ব্যবহারকে উপেক্ষা করে একে সরাসরি ভুল বলা ঠিক হবে না।

বাংলা ভাষায় প্রচলিত বানান ও প্রমিত বানান নিয়ে আলোচনা করতে গেলে কয়েকটি বিষয় আলাদা করে দেখা দরকার:

  • প্রচলিত ব্যবহার: সাধারণ লেখালেখি ও সাহিত্যচর্চায় কোন রূপটি বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে।
  • অভিধানগত স্বীকৃতি: প্রামাণ্য অভিধানে শব্দটির কোন বানান অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
  • বানানবিধি: সংশ্লিষ্ট শব্দের বানান নির্ধারণে কোনো নির্দিষ্ট নিয়ম বা নির্দেশনা রয়েছে কি না।
  • প্রাতিষ্ঠানিক রীতি: কোনো সংবাদমাধ্যম, প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা সরকারি দপ্তর নিজস্ব সম্পাদনা-রীতি অনুসরণ করছে কি না।

এই বিষয়গুলো একসঙ্গে বিবেচনা করলে বোঝা যায়, একটি বানান বেশি প্রচলিত হওয়া, অভিধানে অন্তর্ভুক্ত থাকা এবং নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের রীতি অনুযায়ী লেখা—এগুলো পরস্পর সম্পর্কিত হলেও সম্পূর্ণ অভিন্ন বিষয় নয়।

লেখক, সাংবাদিক ও শিক্ষার্থীরা কোনটি লিখবেন?

যাঁরা নিয়মিত বাংলা লেখেন, তাঁদের জন্য সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি হলো লেখার ধরন ও প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের বানানরীতি অনুসরণ করা।

১. সংবাদপত্র ও অনলাইন নিউজ পোর্টাল: প্রতিষ্ঠানের নির্ধারিত বানানরীতি থাকলে সেটি অনুসরণ করা উচিত। একই লেখায় অকারণে ‘বড়’ ও ‘বড়ো’—দুই রূপের ব্যবহার এড়িয়ে চললে সম্পাদনার সামঞ্জস্য বজায় থাকে।

২. একাডেমিক লেখা ও গবেষণাপত্র: সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান বা প্রকাশকের নির্দেশিকা এবং ব্যবহৃত প্রামাণ্য অভিধান অনুসরণ করা ভালো।

৩. সাহিত্য ও সৃজনশীল লেখা: লেখক তাঁর নির্বাচিত বানানরীতি ধারাবাহিকভাবে অনুসরণ করতে পারেন। তবে সম্পাদিত প্রকাশনার ক্ষেত্রে প্রকাশকের রীতি প্রাধান্য পেতে পারে।

৪. সাধারণ পাঠক ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যবহারকারী: ‘বড়’ লিখেছেন বলেই কাউকে ভুল বাংলা লিখেছেন বলে অভিযুক্ত করার আগে সংশ্লিষ্ট বানানরীতি ও অভিধানের তথ্য যাচাই করা উচিত।

বানান নিয়ে বিতর্কে সতর্কতা কেন প্রয়োজন?

ভাষা পরিবর্তনশীল। সময়ের সঙ্গে শব্দের উচ্চারণ, ব্যবহার ও বানানের রীতিতে পরিবর্তন আসতে পারে। একই সঙ্গে প্রমিত বানান নির্ধারণে অভিধান ও প্রাতিষ্ঠানিক নির্দেশনারও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।

তাই শুধু কোনো একটি অভিধানে একটি বানান পাওয়া গেলেই অন্য সব প্রচলিত রূপকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভুল বলে দেওয়া ঠিক নয়। আবার কোনো বানান বহুল প্রচলিত হলেই সেটি সব প্রাতিষ্ঠানিক বা একাডেমিক প্রেক্ষাপটে সমানভাবে গ্রহণযোগ্য—এমন সিদ্ধান্তও নেওয়া যায় না।

‘বড়’ ও ‘বড়ো’ বিতর্কে এই পার্থক্যটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ড. মোহাম্মদ আমীনের বক্তব্যের তাৎপর্য হলো, বানান নিয়ে মতভেদ থাকলেও যুক্তি, অভিধান ও বানানবিধির ভিত্তিতে আলোচনা করা প্রয়োজন; ব্যক্তিগত পছন্দকে একমাত্র মানদণ্ড বানানো উচিত নয়।

শেষ কথা

‘বড়’ নাকি ‘বড়ো’—এই প্রশ্নের উত্তর দিতে গেলে বাংলা একাডেমির আধুনিক বাংলা অভিধানের ভুক্তি, অন্যান্য অভিধানের তথ্য, প্রচলিত ব্যবহার এবং সংশ্লিষ্ট বানানবিধি একসঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। ড. মোহাম্মদ আমীনের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ‘বড়’ বানানকে সরাসরি ভুল বলা উচিত নয়।

লেখালেখিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো নির্ভরযোগ্য উৎস অনুসরণ করা, একই লেখায় বানানের সামঞ্জস্য বজায় রাখা এবং ভিন্ন বানান ব্যবহারকারীকে অযথা ভুল আখ্যা না দেওয়া। বাংলা ভাষার শুদ্ধতা রক্ষার পাশাপাশি ভাষা নিয়ে যুক্তিনির্ভর ও সহনশীল আলোচনা চালিয়ে যাওয়াও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

সুতরাং, ‘বড়’ ও ‘বড়ো’ নিয়ে মতভেদ থাকলে কাউকে দোষারোপ না করে প্রামাণ্য অভিধান ও নির্দিষ্ট বানানরীতি যাচাই করাই সবচেয়ে যুক্তিসংগত পথ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *