আজকের খবর ২০২৬

বিশেষ প্রতিবেদন: দেবোত্তর সম্পত্তি কি ‘শত্রু সম্পত্তি’ হতে পারে? আইনের ব্যাখ্যা ও বাস্তবতা

বাংলাদেশের ভূমি ব্যবস্থাপনায় ‘অর্পিত সম্পত্তি’ (পূর্বতন শত্রু সম্পত্তি) একটি জটিল বিষয়। বিশেষ করে হিন্দু সম্প্রদায়ের ধর্মীয় উদ্দেশ্যে উৎসর্গকৃত ‘দেবোত্তর সম্পত্তি’ অনেক ক্ষেত্রে শত্রু সম্পত্তির তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় দীর্ঘকাল ধরে আইনি বিতর্ক ও সামাজিক অসন্তোষ বিরাজ করছে। তবে আইন বিশেষজ্ঞ এবং উচ্চ আদালতের বিভিন্ন পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, প্রকৃত দেবোত্তর সম্পত্তি কখনোই শত্রু বা অর্পিত সম্পত্তি হিসেবে গণ্য হওয়ার কথা নয়।

দেবোত্তর সম্পত্তির আইনি মর্যাদা

হিন্দু আইন অনুযায়ী, দেবোত্তর সম্পত্তি কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়; এর প্রকৃত মালিক স্বয়ং ‘দেবতা’। দেবতা একটি ‘আইনগত সত্তা’ (Juridical Person), যার মৃত্যু নেই এবং যিনি দেশত্যাগ করেন না।

আইন যা বলে: ১. মালিকানা: দেবোত্তর সম্পত্তির মালিক কোনো মানুষ নন যে তিনি বিদেশে চলে গেলে সম্পত্তিটি ‘শত্রু’ বা ‘অর্পিত’ হবে। সেবায়েত বা মোহন্ত কেবল এই সম্পত্তির ব্যবস্থাপক বা জিম্মাদার মাত্র। ২. হস্তান্তর অযোগ্যতা: দেবোত্তর সম্পত্তি সাধারণত চিরস্থায়ী দান। এটি বিক্রি বা ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করা আইনত নিষিদ্ধ।

শত্রু সম্পত্তি আইনের অপপ্রয়োগ

১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধের পর প্রবর্তিত ‘ডিফেন্স অফ পাকিস্তান রুলস’ (সংক্ষেপে ১৬৯ ধারা) অনুযায়ী, যারা দেশ ত্যাগ করে শত্রু রাষ্ট্রে (ভারত) চলে গিয়েছিলেন, তাদের সম্পত্তিকে শত্রু সম্পত্তি হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে, মন্দিরের দেবোত্তর সম্পত্তিকেও এই তালিকায় ঢোকানো হয়েছে।

যুক্তি কেন এটি ভুল:

  • দেবতা দেশান্তরী হন না: যেহেতু সম্পত্তির মালিক দেবতা, এবং দেবতা বাংলাদেশেই অবস্থান করছেন, তাই মালিক দেশত্যাগ করেছেন—এই অজুহাতে দেবোত্তর সম্পত্তিকে শত্রু সম্পত্তি বলা আইনত অসম্ভব।

  • সেবায়েতের অনুপস্থিতি: যদি কোনো মন্দিরের সেবায়েত বা জিম্মাদার ভারতে চলে যান, তবে বড়জোর তার সেবায়েতি স্বত্ব বা ব্যবস্থাপনার অধিকার খর্ব হতে পারে, কিন্তু সম্পত্তির মূল চরিত্র (দেবোত্তর) পরিবর্তন হয়ে সেটি সরকারের মালিকানায় বা ‘অর্পিত’ তালিকায় যেতে পারে না।

উচ্চ আদালতের নির্দেশনা ও বর্তমান অবস্থা

বাংলাদেশের উচ্চ আদালত বিভিন্ন রায়ে স্পষ্ট করেছেন যে, দেবোত্তর সম্পত্তি কোনোভাবেই অর্পিত সম্পত্তির তালিকায় থাকতে পারে না। অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যর্পণ আইন, ২০০১-এর বিভিন্ন সংশোধনীতেও দেবোত্তর সম্পত্তি ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের জমি অবমুক্ত করার প্রক্রিয়া সহজ করার কথা বলা হয়েছে।

বর্তমানে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে ‘ক’ ও ‘খ’ তফসিলভুক্ত জমি নিয়ে যে বিতর্ক রয়েছে, সেখানে দেবোত্তর সম্পত্তির প্রমাণ (দলিল বা সিএস/এসএ রেকর্ড) দাখিল করতে পারলে ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে তা অবমুক্ত করা সম্ভব।

উপসংহার

ভূমি আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, দেবোত্তর সম্পত্তিকে শত্রু সম্পত্তি হিসেবে তালিকাভুক্ত করা ছিল ব্রিটিশ বা পাকিস্তানি আমলের আইনের অপপ্রয়োগ। বর্তমান স্বাধীন বাংলাদেশে ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অধিকার রক্ষায় এবং মন্দিরের পবিত্রতা বজায় রাখতে এই সম্পত্তিগুলোকে যথাযথভাবে চিহ্নিত করে তালিকা থেকে বাদ দেওয়া জরুরি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *