দর দাম ২০২৬

ভারত-নেপালের চেয়েও ফলের দাম বেশি বাংলাদেশে, বাড়তি দামের বোঝা ক্রেতার ঘাড়ে

বাংলাদেশের বাজারে আমদানিনির্ভর ফলের দাম প্রতিবেশী ভারত ও নেপালের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। আপেল, আঙুর ও সাধারণ খেজুর—তিনটি বহুল ব্যবহৃত ফলের তুলনামূলক বাজারদর বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, একই ধরনের ফল কিনতে বাংলাদেশের ভোক্তাদের অনেক বেশি অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। ৪ অক্টোবর ২০২৬-এর প্রকাশিত তথ্য ও বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের উপস্থাপিত তুলনামূলক দামের ভিত্তিতে বিষয়টি সামনে এসেছে।

প্রকাশিত তুলনামূলক চিত্রে বাংলাদেশকে ফলের উচ্চমূল্যের বাজার হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। বিশেষ করে আমদানিনির্ভর ফলের ক্ষেত্রে শুল্ক-কর, আমদানি ব্যয়, সরবরাহ সংকট, পরিবহন ও বাজার ব্যবস্থাপনার খরচ শেষ পর্যন্ত খুচরা পর্যায়ে গিয়ে ভোক্তার ওপর চাপ তৈরি করছে।

আপেলের দামে বড় ব্যবধান

তুলনামূলক হিসাবে বাংলাদেশে প্রতি কেজি আপেলের দাম ২৮০ থেকে ৩৮০ টাকা। একই সময়ে ভারতে আপেলের দাম ১৫০ থেকে ২২০ টাকা এবং নেপালে ১৬০ থেকে ২৪০ টাকা।

অর্থাৎ, সর্বনিম্ন দামের হিসাবেও বাংলাদেশে আপেলের দাম ভারতের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণের কাছাকাছি এবং নেপালের তুলনায়ও উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। সর্বোচ্চ দামের ক্ষেত্রে ব্যবধান আরও বড়।

তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—দেশভেদে ফলের জাত, আকার, মান, আমদানির উৎস এবং বাজারের কোন পর্যায়ের দাম তুলনা করা হচ্ছে, তার ওপর প্রকৃত মূল্য কিছুটা পরিবর্তিত হতে পারে। ট্যারিফ কমিশনের তুলনামূলক তথ্যেও এ ধরনের পার্থক্য বিবেচনার কথা বলা হয়েছে।

আঙুরেও বাংলাদেশের বাজার সবচেয়ে ব্যয়বহুল

আঙুরের ক্ষেত্রে ব্যবধান আরও স্পষ্ট। কমিশনের উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতি কেজি আঙুরের দাম ৩০০ থেকে ৪৫০ টাকা।

অন্যদিকে ভারতে একই ফলের দাম ১৩০ থেকে ২০০ টাকা এবং নেপালে ১৫০ থেকে ২৩০ টাকা।

অর্থাৎ, বাংলাদেশের বাজারে আঙুর কিনতে ভারতীয় বাজারের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ বা তারও বেশি অর্থ লাগতে পারে। নেপালের সঙ্গেও রয়েছে বড় ব্যবধান।

খেজুরেও বেশি দাম বাংলাদেশে

সাধারণ খেজুরের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের ভোক্তাদের বেশি দাম দিতে হচ্ছে। তুলনামূলক হিসাবে বাংলাদেশে প্রতি কেজি সাধারণ খেজুরের দাম ২৫০ থেকে ৪৫০ টাকা।

ভারতে এর দাম ১৬০ থেকে ২৬০ টাকা এবং নেপালে ১৮০ থেকে ২৮০ টাকা।

অর্থাৎ সাধারণ খেজুরের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশে সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ—দুই দিক থেকেই দাম তুলনামূলক বেশি।

তুলনামূলক দাম এক নজরে

ফলবাংলাদেশভারতনেপাল
আপেল২৮০–৩৮০ টাকা১৫০–২২০ টাকা১৬০–২৪০ টাকা
আঙুর৩০০–৪৫০ টাকা১৩০–২০০ টাকা১৫০–২৩০ টাকা
সাধারণ খেজুর২৫০–৪৫০ টাকা১৬০–২৬০ টাকা১৮০–২৮০ টাকা

দাম প্রতি কেজি; জাত, মান ও বাজার পর্যায়ভেদে প্রকৃত খুচরা মূল্য পরিবর্তিত হতে পারে।

শুধু আমদানি মূল্য নয়, শুল্ক-করও বড় কারণ

ফলের দামের ব্যবধানের পেছনে সবচেয়ে আলোচিত কারণগুলোর একটি হলো আমদানির ওপর আরোপিত বিভিন্ন শুল্ক ও কর। বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, ফল আমদানিতে ২৫ শতাংশ কাস্টমস ডিউটি, ২০–৩০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক, ১৫ শতাংশ ভ্যাট, ৫ শতাংশ অগ্রিম আয়কর এবং ২০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্কসহ বিভিন্ন ধরনের কর আরোপিত হয়। ফলের ধরন অনুযায়ী অগ্রিম করও সর্বোচ্চ ৭ দশমিক ৫ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে। সব মিলিয়ে মোট কর-শুল্কের চাপ ৯৬ দশমিক ১০ শতাংশ থেকে ১২১ দশমিক ৭৮ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে।

এর অর্থ হলো, বিদেশ থেকে একটি ফল আমদানি করার মূল দামের সঙ্গে বড় অঙ্কের কর-শুল্ক যুক্ত হচ্ছে। এরপর পরিবহন, বন্দরের চার্জ, সংরক্ষণ, পচনজনিত ক্ষতি, পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ের ব্যয় এবং ব্যবসায়ীর মুনাফা যোগ হয়ে চূড়ান্ত দাম আরও বাড়ছে।

আমদানি মূল্য না বাড়লেও বাজারে কেন এত বেশি দাম?

এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠেছে—আন্তর্জাতিক বাজারে ফলের আমদানি মূল্য খুব বেশি না বাড়লেও বাংলাদেশের খুচরা বাজারে দাম এত বাড়ছে কেন?

সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে কাস্টমসের তথ্যের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নয় মাসে বিভিন্ন ফল আমদানি হয়েছে প্রায় ৪১ কোটি ২০ লাখ কেজি। ২০২৫ সালে একই ধরনের ফল আমদানির পরিমাণ ছিল প্রায় ৫৩ কোটি ৮৩ লাখ কেজি। অর্থাৎ সরবরাহ পরিস্থিতিতেও পরিবর্তন এসেছে।

ব্যবসায়ীদের বক্তব্য অনুযায়ী, কিছু ফলের মৌসুম শেষের দিকে চলে আসা, সরবরাহ সংকট, জাহাজ সংকট এবং আমদানি কমে যাওয়ার কারণে বাজারে চাপ তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি ও বন্দর-সংক্রান্ত অতিরিক্ত ব্যয়ও পরিবহন ও সরবরাহ ব্যয় বাড়িয়েছে।

রাজধানীর খুচরা বাজারে বাস্তব চিত্র আরও বেশি

ট্যারিফ কমিশনের তুলনামূলক দামের সঙ্গে রাজধানীর খুচরা বাজারের বাস্তব দামেরও পার্থক্য দেখা যাচ্ছে। ৪ অক্টোবর প্রকাশিত বিভিন্ন বাজার প্রতিবেদনে ঢাকায় মাল্টা, বেদানা, আপেল ও আঙুরের দাম আরও বেশি হওয়ার তথ্য এসেছে।

একটি বাজার প্রতিবেদনে দেখা যায়, প্রতি কেজি মাল্টা প্রায় ৪৫০–৫২০ টাকা, বেদানা ৫২০ টাকা, আপেল ৩৮০ টাকা, সবুজ আঙুর ৪৪০ টাকা এবং লাল আঙুর প্রায় ৬০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে।

অন্যদিকে সাম্প্রতিক সময়ে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির পর ফলের দাম বাড়ার কথাও ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন। সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে আপেল ৩৪০–৩৬০ টাকা, মাল্টা ও কমলা ৪২০–৪৫০ টাকা এবং লাল আঙুর ৪০০–৪৫০ টাকা পর্যন্ত বিক্রির তথ্য পাওয়া যায়।

ফল এখন অনেক পরিবারের বাজেটের বাইরে

ফল সাধারণত স্বাস্থ্যকর খাদ্যতালিকার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি এবং অসুস্থ রোগীদের খাদ্যতালিকায় আপেল, কমলা, মাল্টা, আঙুর বা বেদানার মতো ফল রাখা হয়। কিন্তু দাম বেড়ে যাওয়ায় অনেক নিম্ন ও মধ্যম আয়ের পরিবারের নিয়মিত ফল কেনার সক্ষমতা কমে যাচ্ছে।

সাম্প্রতিক বাজার পরিস্থিতি নিয়ে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে এমনকি রোগীর পথ্য হিসেবে ফল কেনাও অনেক পরিবারের জন্য কঠিন হয়ে পড়ার বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে।

ফলে বিষয়টি শুধু বাজারদর বা আমদানি ব্যয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে খাদ্যাভ্যাস, পুষ্টি এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ের বিষয়টিও জড়িত।

সরকারের পক্ষ থেকেও উদ্বেগ

ফলের অস্বাভাবিক মূল্য নিয়ে সরকারের পক্ষ থেকেও প্রশ্ন উঠেছে। ৪ অক্টোবর ফল ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থার প্রতিনিধিদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় বাণিজ্যমন্ত্রী মাল্টার অস্বাভাবিক মূল্য নিয়ে ব্যবসায়ীদের কাছে প্রশ্ন তোলেন। একই সঙ্গে বাজারে ফলের পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং মূল্য স্থিতিশীল রাখার বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।

এতে স্পষ্ট যে শুধু উচ্চ শুল্ক নয়, আমদানি থেকে খুচরা বিক্রি পর্যন্ত পুরো সরবরাহব্যবস্থাকে বিবেচনায় নিয়ে ফলের মূল্য বিশ্লেষণের প্রয়োজন রয়েছে।

দাম কমাতে কী করা যেতে পারে?

ফলের দাম নিয়ন্ত্রণে আনতে শুধু খুচরা বাজারে অভিযান পরিচালনা করলেই দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হবে না। বরং কয়েকটি জায়গায় একসঙ্গে কাজ করার প্রয়োজন রয়েছে।

প্রথমত, ফল আমদানির ওপর বিদ্যমান শুল্ক-কর কাঠামো পর্যালোচনা করা যেতে পারে। বিশেষ করে যেসব ফলে দেশের ভোক্তাদের বড় নির্ভরতা রয়েছে, সেগুলোর ক্ষেত্রে যৌক্তিক কর কাঠামো তৈরি করা প্রয়োজন।

দ্বিতীয়ত, আমদানির পরিমাণ ও সরবরাহ পরিস্থিতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা দরকার। কোনো একটি ফলের সরবরাহ হঠাৎ কমে গেলে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি হওয়ার সুযোগ থাকে।

তৃতীয়ত, বন্দরের চার্জ, পরিবহন ব্যয়, সংরক্ষণ ব্যয় ও মধ্যস্বত্বভোগীর স্তর কমানো গেলে আমদানি মূল্য ও খুচরা মূল্যের ব্যবধান কমানো সম্ভব হতে পারে।

চতুর্থত, বাজারে প্রকৃত আমদানি মূল্য, শুল্ক-কর, পাইকারি মূল্য ও খুচরা মূল্যের মধ্যে কতটা ব্যবধান রয়েছে, সেটি নিয়মিত প্রকাশ করা হলে বাজারে স্বচ্ছতা বাড়বে।

দেশি ফলের দিকে ঝুঁকতে পারেন ভোক্তারা

আমদানিনির্ভর ফলের দাম যখন তুলনামূলকভাবে বেশি, তখন মৌসুমি দেশি ফল ভোক্তাদের জন্য একটি বিকল্প হতে পারে। পেয়ারা, পেঁপে, কলা, আনারস, আমড়া, জাম্বুরা, ডাবসহ বিভিন্ন দেশি ফলে অনেক ক্ষেত্রে তুলনামূলক কম খরচে পুষ্টি পাওয়া যায়।

সাম্প্রতিক বাজার প্রতিবেদনেও দেখা যাচ্ছে, বিদেশি ফলের উচ্চমূল্যের কারণে ক্রেতাদের একটি অংশ দেশি ফলের দিকে ঝুঁকছেন।

তবে দীর্ঘমেয়াদে শুধু ভোক্তার খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন নয়—আমদানি ব্যয়, শুল্ক-কর, সরবরাহব্যবস্থা এবং বাজার ব্যবস্থাপনার কাঠামোগত সমস্যাগুলো সমাধান করাই মূল চ্যালেঞ্জ।

শেষ কথা

ভারত ও নেপালের তুলনায় বাংলাদেশে আপেল, আঙুর ও সাধারণ খেজুরের দাম বেশি—ট্যারিফ কমিশনের উপস্থাপিত তথ্য অন্তত সেই চিত্রই তুলে ধরছে। একই সঙ্গে রাজধানীর সাম্প্রতিক খুচরা বাজারে কিছু ফলের দাম কমিশনের তুলনামূলক দামের চেয়েও বেশি দেখা যাচ্ছে।

ফলের দাম বৃদ্ধির পেছনে উচ্চ শুল্ক-কর, সরবরাহ সংকট, আমদানি ব্যয়, জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয় এবং বাজার ব্যবস্থাপনা—একাধিক কারণ একসঙ্গে কাজ করছে। তাই সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে ফলের দাম আনতে হলে শুধু খুচরা পর্যায়ে মূল্য নিয়ন্ত্রণ নয়, বরং আমদানি থেকে ভোক্তার হাতে পৌঁছানো পর্যন্ত পুরো সরবরাহ শৃঙ্খলকে নজরদারির আওতায় আনা প্রয়োজন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *