আজকের খবর ২০২৬

‘ভূমি দৃষ্টি ২০২৬’: প্রযুক্তির আওতায় ভূমি অফিস, জিও-ফেন্সিংয়ে নজরদারি হবে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উপস্থিতি

ভূমি অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কর্মস্থলে প্রকৃত উপস্থিতি নিশ্চিত করতে এবার প্রযুক্তিনির্ভর তদারকি ব্যবস্থা চালু করেছে ভূমি মন্ত্রণালয়। ‘ভূমি দৃষ্টি’ নামের নতুন মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে জিও-ফেন্সিং প্রযুক্তি ব্যবহার করে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উপস্থিতি যাচাই এবং কেন্দ্রীয় ড্যাশবোর্ডে তা পর্যবেক্ষণ করা হবে। ইতোমধ্যে ছয় জেলায় পরীক্ষামূলকভাবে এ কার্যক্রম শুরু হয়েছে।

কী এই ‘ভূমি দৃষ্টি’?

‘ভূমি দৃষ্টি’ মূলত ভূমি প্রশাসনের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উপস্থিতি ও ছুটি ব্যবস্থাপনার একটি সমন্বিত ডিজিটাল ব্যবস্থা। সরকারি প্ল্যাটফর্মের তথ্য অনুযায়ী, অবস্থান যাচাই করে মোবাইল অ্যাপে হাজিরা নিবন্ধন এবং ড্যাশবোর্ডের মাধ্যমে তদারকি করা হবে।

১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ভূমি মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে অ্যাপটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়। মন্ত্রণালয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, এর উদ্দেশ্য শুধু হাজিরা নেওয়া নয়; বরং মাঠপর্যায়ের ভূমিসেবায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং কর্মঘণ্টার যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা।

জিও-ফেন্সিংয়ে কীভাবে হবে হাজিরা?

‘ভূমি দৃষ্টি’র সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি হলো জিও-ফেন্সিং। এর মাধ্যমে প্রতিটি ভূমি অফিসের চারপাশে একটি নির্দিষ্ট ভার্চুয়াল ভৌগোলিক সীমানা নির্ধারণ করা হবে।

কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারীর মোবাইল ফোন ওই নির্ধারিত এলাকার মধ্যে থাকলেই অ্যাপে হাজিরা দেওয়ার সুযোগ সক্রিয় হবে। ফলে অফিসের বাইরে অবস্থান করে কর্মস্থলের হাজিরা দেওয়ার সুযোগ সীমিত করার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

অর্থাৎ, সাধারণভাবে প্রক্রিয়াটি হবে—

কর্মস্থলে পৌঁছানো → জিও-ফেন্সের মধ্যে অবস্থান শনাক্ত → মোবাইল অ্যাপে চেক-ইন → কর্মদিবস শেষে চেক-আউট → কেন্দ্রীয় ড্যাশবোর্ডে তথ্য সংরক্ষণ।

শুধু হাজিরা নয়, থাকবে কেন্দ্রীয় ড্যাশবোর্ড

নতুন ব্যবস্থায় ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অনলাইনে উপস্থিতির তথ্য পর্যবেক্ষণের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। প্রশাসনিক প্যানেলে সাধারণ পর্যবেক্ষণ, ব্যবস্থাপনা, পরিচালন, তথ্য বিশ্লেষণ এবং সিস্টেম সেটিংস—এ ধরনের একাধিক অংশ রাখা হয়েছে।

এর মাধ্যমে অফিসের সীমানা নির্ধারণ, উপস্থিতি পর্যালোচনা, সতর্কবার্তা নিষ্পত্তি এবং দৈনিক ও মাসিক প্রতিবেদন তৈরির সুবিধা থাকবে বলে জানানো হয়েছে।

অফিসের বাইরে গেলে কী হবে?

ভূমি অফিসের কর্মকর্তাদের কাজের প্রয়োজনে অনেক সময় সরেজমিনে যেতে হয়। সে বিষয়টিও ব্যবস্থায় রাখা হয়েছে। অনুমোদিত সাইট ভিজিট ও মাঠপর্যায়ের কাজের তথ্য অ্যাপের মাধ্যমে ব্যবস্থাপনা করা যাবে। একই সঙ্গে ছুটির আবেদন ও ছুটির হিসাব ব্যবস্থাপনার সুবিধাও রাখা হয়েছে।

অর্থাৎ, অফিসের বাইরে থাকা মানেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে অনুপস্থিত হিসেবে গণ্য করার পরিবর্তে অনুমোদিত অফিসিয়াল ভিজিটের জন্য আলাদা ব্যবস্থাপনা রাখা হয়েছে।

ব্যাকগ্রাউন্ড লোকেশনও ব্যবহারের বিধান

ভূমি দৃষ্টি অ্যাপের প্রকাশিত গোপনীয়তা নীতিতে বলা হয়েছে, চেক-ইন ও চেক-আউটের সময় কর্মস্থলের জিও-ফেন্সের মধ্যে শারীরিক উপস্থিতি যাচাই করতে সুনির্দিষ্ট অবস্থান তথ্য নেওয়া হয়।

এ ছাড়া অনুমোদিত ফিল্ড বা সাইট ভিজিটের ক্ষেত্রে অফিসিয়াল রুট ট্রেইল বজায় রাখা এবং কর্মী জিও-ফেন্স থেকে বের হলে স্বয়ংক্রিয় চেক-আউট শনাক্ত করার জন্য ব্যাকগ্রাউন্ড লোকেশন ব্যবহার করা যেতে পারে।

প্রাথমিকভাবে ছয় জেলার ৯১৯ কর্মকর্তা-কর্মচারী

এখনই পুরো দেশের সব ভূমি অফিসকে ব্যবস্থাটির আওতায় আনা হয়নি। বর্তমানে ঢাকা, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, বগুড়া, রাজশাহী ও চট্টগ্রাম—এই ছয় জেলায় পাইলট প্রকল্প চলছে।

ভূমি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, পাইলট প্রকল্পে ৬১০টি কার্যালয়ের ৯১৯ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। পাইলটিংয়ের অভিজ্ঞতা পর্যালোচনা করে পর্যায়ক্রমে দেশের বিভাগ, জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ের ভূমি অফিসে এটি সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।

কেন এই প্রযুক্তিনির্ভর তদারকি?

ভূমি প্রশাসনের মাঠপর্যায়ের কার্যালয়গুলো ইউনিয়ন থেকে জেলা পর্যন্ত বিস্তৃত। ফলে প্রতিটি অফিসে সরেজমিনে নিয়মিত গিয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উপস্থিতি যাচাই করা প্রশাসনের জন্য সময়সাপেক্ষ।

ভূমি মন্ত্রণালয়ের বক্তব্য হলো, অবস্থানভিত্তিক অনলাইন যাচাইয়ের মাধ্যমে এই তদারকি সহজ করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে নির্ধারিত কর্মস্থলে সেবা প্রদানকারী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উপস্থিতি নিশ্চিত হলে নাগরিকদের ভূমিসেবা পাওয়ার প্রক্রিয়াও আরও নিয়মতান্ত্রিক হতে পারে।

উপস্থিতি থেকে জবাবদিহিতার দিকে

‘ভূমি দৃষ্টি’র গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—এটি কেবল একটি ডিজিটাল হাজিরা ব্যবস্থা হিসেবে সীমাবদ্ধ নয়। উপস্থিতি, চেক-ইন, চেক-আউট, ছুটি, সাইট ভিজিট এবং সতর্কবার্তার মতো তথ্যকে একটি কেন্দ্রীয় ব্যবস্থার আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে।

ফলে ভবিষ্যতে কোনো ভূমি অফিসে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উপস্থিতি সম্পর্কে প্রশ্ন উঠলে কাগজের হাজিরা খাতা বা মৌখিক তথ্যের পরিবর্তে ডিজিটাল রেকর্ড ব্যবহার করে বিষয়টি যাচাই করার সুযোগ তৈরি হবে।

কর্মীদের জন্য কী পরিবর্তন আসতে পারে?

নতুন ব্যবস্থায় ভূমি অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য কয়েকটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে—

  • নির্ধারিত কর্মস্থলের মধ্যে থেকেই চেক-ইন করতে হবে।
  • কর্মদিবস শেষে চেক-আউটের তথ্য সংরক্ষিত হবে।
  • অফিসিয়াল কাজে বাইরে গেলে সাইট ভিজিট ব্যবস্থার ব্যবহার করতে হবে।
  • ছুটির তথ্য ডিজিটাল ব্যবস্থার মাধ্যমে পরিচালিত হবে।
  • উপস্থিতি ও সংশ্লিষ্ট তথ্য কেন্দ্রীয় ড্যাশবোর্ডে পর্যালোচনা করা যাবে।
  • অনুমোদিত ফিল্ড ভিজিটের ক্ষেত্রে অবস্থানভিত্তিক তথ্য ব্যবহারের ব্যবস্থা থাকবে।

সামনে সারাদেশে সম্প্রসারণ

বর্তমান পাইলট প্রকল্পের ফলাফল গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ছয় জেলার অভিজ্ঞতার ভিত্তিতেই প্রযুক্তিগত ও প্রশাসনিক সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় সংশোধন করা হবে। এরপর পর্যায়ক্রমে দেশের অন্যান্য ভূমি অফিসকে এর আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে।

সার্বিকভাবে, ‘ভূমি দৃষ্টি ২০২৬’ ভূমি প্রশাসনে কর্মস্থলভিত্তিক উপস্থিতি তদারকিকে কাগজের হাজিরা থেকে অবস্থানভিত্তিক ডিজিটাল ব্যবস্থার দিকে নিয়ে যাচ্ছে। জিও-ফেন্সিং, মোবাইল অ্যাপ, কেন্দ্রীয় ড্যাশবোর্ড, সাইট ভিজিট ও ডিজিটাল ছুটি ব্যবস্থাপনা—সব মিলিয়ে ভূমি অফিসের দৈনন্দিন প্রশাসনিক কার্যক্রমে প্রযুক্তির ব্যবহার আরও বাড়ছে।

তবে এর বাস্তব প্রভাব নির্ভর করবে পাইলট প্রকল্পের ফলাফল, প্রযুক্তিগত নির্ভরযোগ্যতা, মাঠপর্যায়ে যথাযথ ব্যবহার এবং প্রশাসনিকভাবে তথ্য ব্যবহারের ওপর। বর্তমানে সরকারি তথ্য অনুযায়ী এটি ছয় জেলার পাইলট পর্যায়ে রয়েছে; সারাদেশে পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন এখনো ধাপে ধাপে হওয়ার কথা।

সংক্ষেপে: ‘ভূমি দৃষ্টি’ চালুর ফলে ভূমি অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রযুক্তির মাধ্যমে উপস্থিতি ও সংশ্লিষ্ট কর্মতৎপরতা তদারকির একটি নতুন ব্যবস্থা কার্যকর হয়েছে। প্রথম ধাপে ৬ জেলায় ৯১৯ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী এতে যুক্ত হয়েছেন এবং পাইলটিং সফল হলে ব্যবস্থা পর্যায়ক্রমে সারাদেশে সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *