মানবদেহে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সংযোজন সংক্রান্ত বিদ্যমান আইন রহিত করে সংশোধনসহ নতুন ‘মানবদেহে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সংযোজন আইন, ২০২৬’ প্রণয়ন করা হয়েছে । শুক্রবার (১০ এপ্রিল) জাতীয় সংসদ কর্তৃক গৃহীত এই আইনটি রাষ্ট্রপতির সম্মতিলাভের পর গেজেট আকারে প্রকাশ করা হয় । উল্লেখ্য যে, এই আইনটি গত ১৯ নভেম্বর ২০২৫ তারিখ থেকে কার্যকর হয়েছে বলে গণ্য করা হবে ।
অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ও দাতার সংজ্ঞা
নতুন এই আইনে ‘অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ’ বলতে কিডনি, হৃৎপিণ্ড, ফুসফুস, অন্ত্র, যকৃত, অগ্ন্যাশয়, অস্থি, অস্থিমজ্জা, চক্ষু, চর্ম ও টিস্যুসহ মানবদেহে সংযোজনযোগ্য যে-কোনো অংশকে বোঝানো হয়েছে । এছাড়া দাতার ক্ষেত্রে ‘নিকট আত্মীয়’র পরিধি বিস্তৃত করা হয়েছে, যার মধ্যে রক্ত-সম্পর্কিত চাচা, ফুফু, মামা, খালা থেকে শুরু করে নানা-নানি, দাদা-দাদি এবং এমনকি সৎ ভাই-বোনও অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন ।
বিশেষ সংযোজন: নিঃস্বার্থবাদী দাতা ও সোয়াপ ট্রান্সপ্ল্যান্ট
আইনটিতে প্রথমবারের মতো ‘নিঃস্বার্থবাদী দাতা (Emotional Donor)’ এবং ‘অসামঞ্জস্য জোড়া অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বিনিময় (Swap Transplant)’ এর বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে:
নিঃস্বার্থবাদী দাতা: কোনো ব্যক্তি আর্থিক প্রলোভন ছাড়া স্বেচ্ছায় এবং সজ্ঞানে দীর্ঘদিনের পরিচিত গ্রহীতাকে অঙ্গ দান করতে পারবেন, যদি তিনি সংশ্লিষ্ট কমিটির সুপারিশ প্রাপ্ত হন ।
সোয়াপ ট্রান্সপ্ল্যান্ট: যদি কোনো রোগীর দাতার সাথে অঙ্গের মিল না থাকে (Mismatch), তবে তিনি অন্য কোনো দাতা-গ্রহীতা জুটির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ অঙ্গ বিনিময় করতে পারবেন ।
ব্রেইন ডেথ ও ক্যাডাভেরিক দান
বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের সমন্বয়ে গঠিত কমিটি কোনো ব্যক্তিকে ‘ব্রেইন ডেথ’ ঘোষণা করতে পারবেন । ব্রেইন ডেথ ঘোষিত ব্যক্তির অঙ্গ সংগ্রহের জন্য তার আইনানুগ উত্তরাধিকারীর লিখিত অনুমতি প্রয়োজন হবে । ক্যাডাভেরিক অঙ্গ দাতাদের রাষ্ট্রীয় সম্মানে দাফন বা সৎকারের ব্যবস্থা করা হবে এবং জাতীয় দিবসে তাদের পরিবারকে বিশেষ সম্মাননা বা পদক প্রদান করা হবে ।
দাতা ও গ্রহীতার যোগ্যতা
দাতা: জীবিত দাতার বয়স ১৮ থেকে ৬৫ বছরের মধ্যে হতে হবে । তবে ক্যাডাভেরিক দাতার ক্ষেত্রে বয়স সীমা ২ থেকে ৭০ বছর । দাতা অবশ্যই মানসিকভাবে সুস্থ হতে হবে এবং ক্যান্সার বা এইচআইভির মতো জটিল রোগে আক্রান্ত হওয়া যাবে না ।
গ্রহীতা: ২ থেকে ৭০ বছর বয়সী ব্যক্তিরা অঙ্গ গ্রহণ করতে পারবেন, তবে ১৫ থেকে ৫০ বছর বয়সীরা অগ্রাধিকার পাবেন ।
অপরাধ ও দণ্ড
অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ কেনাবেচা বা এ সংক্রান্ত কোনো বিজ্ঞাপন প্রচার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে ।
নিকট আত্মীয়তা সম্পর্কে মিথ্যা তথ্য দিলে অনধিক ২ বছর সশ্রম কারাদণ্ড বা ৫ লক্ষ টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ড হতে পারে ।
আইনের অন্য কোনো বিধান লঙ্ঘন করলে ৩ বছর কারাদণ্ড বা ১০ লক্ষ টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে ।
কোনো চিকিৎসক এই অপরাধে দণ্ডিত হলে তার রেজিস্ট্রেশন বাতিল করা হবে ।
এই আইন বাস্তবায়নের লক্ষ্যে একটি ‘জাতীয় রেজিস্টার’ সংরক্ষণ করা হবে যেখানে দাতা ও গ্রহীতার সকল তথ্য সংবলিত ডেটাবেজ থাকবে । নতুন এই আইন প্রণয়নের ফলে ১৯৯৯ সালের পুরনো আইনটি রহিত করা হলো ।
