ইতিহাস, ঐতিহ্য, প্রকৃতি, নদী, শিক্ষা ও খাবারের বৈচিত্র্য—সবকিছুর সমন্বয়ে রাজশাহী বাংলাদেশের অন্যতম আকর্ষণীয় ভ্রমণ গন্তব্য। ‘সিল্ক সিটি’ ও ‘আমের শহর’ হিসেবে পরিচিত এই নগরী একদিকে যেমন পদ্মার মনোরম তীরের জন্য জনপ্রিয়, অন্যদিকে বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘর, পুঠিয়া রাজবাড়ি-মন্দির কমপ্লেক্স ও বাঘা মসজিদের মতো ঐতিহাসিক স্থাপনাও পর্যটকদের আকর্ষণ করে।
২০২৬ সালে রাজশাহী ভ্রমণের পরিকল্পনা করলে শুধু শহরের দর্শনীয় স্থান নয়, আশপাশের ঐতিহাসিক এলাকাগুলোও পরিকল্পনায় রাখা যায়। সরকারি পর্যটন তালিকায় পদ্মার পাড়, পুঠিয়া শিবমন্দির, বাঘা মসজিদ, বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘর, শহীদ কামারুজ্জামান কেন্দ্রীয় উদ্যান ও চিড়িয়াখানা এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়সহ একাধিক স্থান উল্লেখ রয়েছে।
ঢাকা থেকে রাজশাহী যাবেন কীভাবে?
রাজশাহী যাওয়ার সবচেয়ে জনপ্রিয় মাধ্যমগুলোর একটি ট্রেন। ঢাকা থেকে আন্তঃনগর ট্রেনে রাজশাহী যাওয়া যায়। এছাড়া সড়কপথে বিভিন্ন বাস এবং আকাশপথে শাহ মখদুম বিমানবন্দর ব্যবহার করা যায়। ভ্রমণের আগে সংশ্লিষ্ট পরিবহন সংস্থার সর্বশেষ সময়সূচি ও ভাড়া যাচাই করে নেওয়া উচিত।
রাজশাহী শহরে পৌঁছানোর পর শহরের বেশিরভাগ দর্শনীয় স্থানে রিকশা, অটোরিকশা বা অন্যান্য স্থানীয় পরিবহন ব্যবহার করা যায়। জেলা প্রশাসনের পর্যটন তথ্যেও পদ্মার পাড়, বরেন্দ্র জাদুঘর ও অন্যান্য শহরকেন্দ্রিক স্থানে রিকশা-অটোরিকশায় যাওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রথম গন্তব্য হতে পারে পদ্মার পাড়
রাজশাহী শহরের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ পদ্মার পাড়। বিকেল থেকে সন্ধ্যার সময় নদীর তীরে সময় কাটানো, হাঁটাহাঁটি ও সূর্যাস্ত উপভোগ করা ভ্রমণকারীদের জন্য বিশেষ অভিজ্ঞতা হতে পারে।
রাজশাহী জেলা প্রশাসনের পর্যটন তালিকায় পদ্মার পাড়কে শহরের অন্যতম দর্শনীয় স্থান হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। শহরের জিরো পয়েন্ট থেকে পশ্চিম দিকে গিয়ে স্থানীয় পরিবহনে সেখানে পৌঁছানো যায়।
পদ্মার তীরের টি-বাঁধ ও আই-বাঁধ এলাকাও শহরের বিনোদনকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। বর্তমান ব্যবসায়িক তালিকায় টি-বাঁধ ও আই-বাঁধ—দুটিই পর্যটন আকর্ষণ হিসেবে রয়েছে।
T- Badh
I Badh Rajshahi
বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘর: ইতিহাসপ্রেমীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ
রাজশাহী শহরের কেন্দ্রের কাছেই অবস্থিত বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘর ভ্রমণ তালিকায় রাখা যেতে পারে। এটি ১৯১০ সালে প্রতিষ্ঠিত এবং প্রাচীন বাংলার প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের গুরুত্বপূর্ণ সংগ্রহশালা হিসেবে পরিচিত। জাদুঘরে ভাস্কর্য, শিলালিপি, মুদ্রা, মৃৎপাত্র, পোড়ামাটির ফলক, দলিলপত্র, পাণ্ডুলিপিসহ বিভিন্ন ঐতিহাসিক নিদর্শন রয়েছে।
বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, রাজশাহী জিরো পয়েন্ট থেকে স্থানীয় পরিবহনে সহজেই বরেন্দ্র জাদুঘরে যাওয়া যায়।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ও শহরের সবুজ পরিবেশ
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ও ভ্রমণ পরিকল্পনায় রাখা যেতে পারে। বিশাল সবুজ ক্যাম্পাস ও শান্ত পরিবেশের কারণে এটি শহরের একটি পরিচিত স্থান। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশের ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষের নিয়ম-কানুন মেনে চলা জরুরি।
পুঠিয়া রাজবাড়ি ও মন্দির কমপ্লেক্স
রাজশাহী শহরের বাইরে একদিনের ভ্রমণের জন্য পুঠিয়া অন্যতম আকর্ষণীয় গন্তব্য। বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, পুঠিয়ায় রাজবাড়ির পাশাপাশি বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পুরাকীর্তি রয়েছে—এর মধ্যে গোবিন্দ মন্দির, শিবমন্দির, গোপাল মন্দির ও দোলমঞ্চ উল্লেখযোগ্য।
পুঠিয়া রাজবাড়ি ও আশপাশের মন্দিরগুলোতে ঐতিহাসিক স্থাপত্য ও টেরাকোটার অলংকরণ দেখা যায়। বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, রাজশাহী থেকে সড়কপথে পুঠিয়ায় যাওয়া যায়।
রাজশাহী জেলা প্রশাসনের তথ্যেও পুঠিয়া শিবমন্দিরকে শহর থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরের দর্শনীয় স্থান হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। বিভিন্ন সরকারি সূত্রে দূরত্বের হিসাব কিছুটা ভিন্ন হওয়ায় যাত্রার আগে নির্দিষ্ট রুট দেখে নেওয়া ভালো।
বাঘা মসজিদ: ৫০০ বছরের ইতিহাসের সাক্ষী
ঐতিহাসিক স্থাপনা দেখতে চাইলে বাঘা মসজিদ ভ্রমণের তালিকায় রাখা যায়। বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, বাঘা মসজিদ ১৫২৩ সালে সুলতান নূসরাত শাহের আমলে নির্মিত। ইট ও পোড়ামাটির টেরাকোটা অলংকরণ এই মসজিদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
রাজশাহী শহর থেকে বাঘা মসজিদে সড়কপথে যাওয়া যায়। শহরের শিরইল বাসস্ট্যান্ড থেকে বাসযোগে যাওয়ার তথ্য রাজশাহী জেলা প্রশাসনের পর্যটন তালিকায় দেওয়া হয়েছে।
রাজশাহীতে কী খাবেন?
রাজশাহী ভ্রমণের সঙ্গে স্থানীয় খাবারের স্বাদ নেওয়াও গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে স্থানীয় বাংলা খাবার, কালাইরুটি, বিভিন্ন ধরনের মাংসের পদ, ভর্তা ও মিষ্টি পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয় হতে পারে।
তবে খাবারের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কোনো দোকানকে ‘সেরা’ হিসেবে ধরে নেওয়ার আগে সাম্প্রতিক রিভিউ, দাম, পরিচ্ছন্নতা ও খাবারের মান যাচাই করা ভালো।
শহরে আধুনিক রেস্টুরেন্টের পাশাপাশি স্থানীয় খাবারের দোকানও রয়েছে। উদাহরণ হিসেবে—
চুঁই মেজবান(Chui Mezban)
বাংলা ও স্থানীয় স্বাদের খাবারের জন্য বিবেচনা করা যেতে পারে।
আর তুলনামূলক পরিচিত রেস্টুরেন্টের মধ্যে রয়েছে—
Kacchi Bhai – Rajshahi
এছাড়া চাইনিজ খাবারের জন্য—
Nanking Chinese Restaurant
যাওয়ার আগে রেস্টুরেন্টের বর্তমান খোলার সময় ও মেনু যাচাই করে নেওয়া ভালো।
আমের মৌসুমে রাজশাহী ভিন্ন রূপ নেয়
রাজশাহী ও আশপাশের অঞ্চল আমের জন্য বিখ্যাত। খিরসাপাত/হিমসাগর, ল্যাংড়া, ফজলি, গোপালভোগসহ বিভিন্ন জাতের আমের সঙ্গে রাজশাহীর পরিচিতি দীর্ঘদিনের।
২০২৬ সালের জুলাই মাসে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের আমবাগানকে নতুন ধরনের কৃষিভিত্তিক পর্যটন আকর্ষণ হিসেবে উঠে আসার কথা বলা হয়েছে। প্রতিবেদনে মে থেকে জুলাইয়ের মতো পিক হার্ভেস্ট সময়ে বাগানগুলোতে ফল সংগ্রহ, বাগান ঘুরে দেখা ও স্থানীয় জীবনযাত্রার সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে সেপ্টেম্বর মাসে রাজশাহী ভ্রমণ করলে মূল আমের মৌসুম শেষ হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। তাই এ সময়ে ভ্রমণকারীদের প্রধান আকর্ষণ হিসেবে আমের পরিবর্তে পদ্মার পাড়, জাদুঘর ও ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোকে গুরুত্ব দেওয়া বেশি বাস্তবসম্মত।
দুই দিনের রাজশাহী ভ্রমণ পরিকল্পনা
প্রথম দিন: রাজশাহী শহর
সকাল
- রাজশাহী শহরে পৌঁছানো
- হোটেলে ওঠা
- নাশতা
- বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘর
দুপুর
- দুপুরের খাবার
- রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ও আশপাশের এলাকা
বিকেল
- শহরের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও দর্শনীয় স্থান ঘুরে দেখা
- টি-বাঁধ/আই-বাঁধ
সন্ধ্যা
- পদ্মার পাড়ে সূর্যাস্ত
- স্থানীয় খাবার ও মিষ্টি
দ্বিতীয় দিন: পুঠিয়া ও বাঘা
সকাল
- রাজশাহী থেকে পুঠিয়ার উদ্দেশে রওনা
- পুঠিয়া রাজবাড়ি
- শিবমন্দির ও অন্যান্য পুরাকীর্তি
দুপুর
- স্থানীয় খাবার
বিকেল
- বাঘা মসজিদ
সন্ধ্যা
- রাজশাহী শহরে ফিরে আসা
একদিনে পুঠিয়া ও বাঘা—দুটিই ঘুরতে চাইলে ব্যক্তিগত গাড়ি বা আগে থেকে ভাড়া করা সিএনজি/গাড়ি ব্যবহার করলে সময় ব্যবস্থাপনা সহজ হতে পারে।
কোথায় থাকবেন?
রাজশাহী শহরে বিভিন্ন বাজেটের হোটেল ও আবাসিক সুবিধা রয়েছে। পদ্মার কাছাকাছি বা শহরের কেন্দ্রীয় এলাকায় থাকলে দর্শনীয় স্থান ও খাবারের জায়গায় যাতায়াত তুলনামূলক সহজ হতে পারে।
বর্তমান ব্যবসায়িক তালিকায় যেমন—
Grand River View Hotel
Royal Raj Hotel & Condominium
Hotel X – Rajshahi
এ ধরনের আবাসন সুবিধা দেখা যায়। রুম ভাড়া ও প্রাপ্যতা ভ্রমণের তারিখ অনুযায়ী পরিবর্তিত হতে পারে, তাই বুকিংয়ের আগে সরাসরি নিশ্চিত করা উচিত।
কম খরচে রাজশাহী ঘোরার পরিকল্পনা
কম বাজেটে ভ্রমণ করতে চাইলে ট্রেনে রাজশাহী গিয়ে শহরের মধ্যে রিকশা বা অটোরিকশা ব্যবহার করা যেতে পারে। শহরের কাছাকাছি দর্শনীয় স্থানগুলো একদিনে এবং পুঠিয়া-বাঘাকে আলাদা দিনে রাখলে যাতায়াতের চাপ কমে।
দলবদ্ধভাবে গেলে পুঠিয়া বা বাঘার জন্য গাড়ি ভাড়া করে খরচ ভাগ করে নেওয়াও একটি বাস্তবসম্মত পদ্ধতি।
ভ্রমণের আগে যে বিষয়গুলো মনে রাখবেন
রাজশাহীতে দিনের বেলায় গরম থাকতে পারে। তাই গ্রীষ্ম বা বর্ষার সময় সকালে ও বিকেলে বাইরের দর্শনীয় স্থানগুলো ঘোরা সুবিধাজনক।
ঐতিহাসিক স্থাপনায় গেলে স্থাপনার দেয়াল বা প্রত্নবস্তু স্পর্শ না করা, ময়লা না ফেলা এবং স্থানীয় কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা মেনে চলা উচিত।
আর খাবারের ক্ষেত্রে অপরিচিত দোকানে বেশি খাবার একসঙ্গে না নিয়ে স্থানীয়ভাবে পরিচিত ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন দোকান বেছে নেওয়া ভালো।
শেষ কথা
রাজশাহী ভ্রমণ মানেই শুধু আম খাওয়া নয়। পদ্মার নদীতীর, শতবর্ষের ইতিহাস বহনকারী বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘর, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সবুজ পরিবেশ, পুঠিয়ার রাজবাড়ি ও মন্দির কমপ্লেক্স এবং বাঘা মসজিদ—সব মিলিয়ে রাজশাহী একটি বৈচিত্র্যময় ভ্রমণ গন্তব্য।
বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের বর্তমান তথ্যেও রাজশাহীর প্রধান আকর্ষণের তালিকায় পদ্মা নদী, বাঘা মসজিদ, পুঠিয়া রাজবাড়ি, শিবমন্দির ও বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘর রয়েছে।
অর্থাৎ, ২ দিন ১ রাতের একটি পরিকল্পিত সফরেই রাজশাহী শহরের প্রধান আকর্ষণগুলো দেখার পাশাপাশি পুঠিয়া ও বাঘার মতো ঐতিহাসিক স্থান ঘুরে আসা সম্ভব। আর যদি হাতে আরও সময় থাকে, তাহলে রাজশাহী বিভাগের অন্যান্য ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানকে যুক্ত করে দীর্ঘ ভ্রমণ পরিকল্পনা করা যেতে পারে।

