সরকারি কর্মচারীদের অবসরকালীন সুবিধা ও পেনশন প্রাপ্যতা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা জারি করেছে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ। ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে জারি করা প্রজ্ঞাপনে পেনশনযোগ্য চাকরিকাল অনুযায়ী প্রথম পেনশন নির্ধারণের হার, অবসরপ্রাপ্তদের নিট পেনশন পুনর্নির্ধারণ, আনুতোষিকের হার, চাকরিকাল পূর্ণ হওয়ার আগে মৃত্যু বা অক্ষমতার ক্ষেত্রে বিশেষ আর্থিক সহায়তা, পারিবারিক পেনশন এবং ছুটি নগদায়নসহ একাধিক বিষয়ে বিস্তারিত নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
২৫ বছর বা তার বেশি চাকরিতে প্রথম পেনশন ৯০ শতাংশ
প্রজ্ঞাপনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—পেনশনযোগ্য চাকরিকালের ওপর ভিত্তি করে প্রথম পেনশন নির্ধারণের হার নির্ধারিত হয়েছে ২১ শতাংশ থেকে সর্বোচ্চ ৯০ শতাংশ পর্যন্ত।
প্রজ্ঞাপনে দেওয়া হার অনুযায়ী—
| পেনশনযোগ্য চাকরিকাল | প্রথম পেনশন নির্ধারণের হার |
|---|---|
| ৫ বছর | ২১% |
| ৬ বছর | ২৪% |
| ৭ বছর | ২৭% |
| ৮ বছর | ৩০% |
| ৯ বছর | ৩৩% |
| ১০ বছর | ৩৬% |
| ১১ বছর | ৩৯% |
| ১২ বছর | ৪২% |
| ১৩ বছর | ৪৫% |
| ১৪ বছর | ৫১% |
| ১৫ বছর | ৫৪% |
| ১৬ বছর | ৫৭% |
| ১৭ বছর | ৬০% |
| ১৮ বছর | ৬৫% |
| ১৯ বছর | ৬৯% |
| ২০ বছর | ৭২% |
| ২১ বছর | ৭৫% |
| ২২ বছর | ৭৯% |
| ২৩ বছর | ৮৩% |
| ২৪ বছর | ৮৭% |
| ২৫ বছর ও তদূর্ধ্ব | ৯০% |
অর্থাৎ, কোনো সরকারি কর্মচারীর পেনশনযোগ্য চাকরিকাল ২৫ বছর বা তার বেশি হলে প্রথম পেনশন নির্ধারণের হার সর্বোচ্চ ৯০ শতাংশ হবে। প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়েছে, প্রচলিত ৫–২৫ বছরের পেনশনযোগ্য চাকরিকালের ভিত্তিতে এই হার নির্ধারণ করা হয়েছে এবং সর্বশেষ আহরিত মূল বেতনের নির্ধারিত অংশের ভিত্তিতে প্রথম পেনশন নির্ধারণ করা হবে।
৫ থেকে ২৪ বছরের চাকরিকালে কী হবে?
চাকরিকাল ২৫ বছরের কম হলেও নির্দিষ্ট হারে পেনশন পাওয়ার সুযোগ থাকছে। তবে ৫ থেকে ২৪ বছরের ক্ষেত্রে পেনশনের হার চাকরিকালের সঙ্গে ধাপে ধাপে বাড়বে। ফলে একই মূল বেতন হলেও চাকরিকাল বেশি হলে নির্ধারিত প্রথম পেনশনের হারও বেশি হবে।
প্রজ্ঞাপনে আরও বলা হয়েছে, ৫–২৪ বছরের পেনশনযোগ্য চাকরিকালের পেনশন কেবল নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে প্রাপ্য হবে। এর মধ্যে সংশ্লিষ্ট বিধি অনুযায়ী পেনশনযোগ্য চাকরির নিয়মিত অবসান, চাকরিরত অবস্থায় মৃত্যু, মেডিকেল বোর্ডের মাধ্যমে স্থায়ীভাবে অক্ষম ঘোষণা, নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে চাকরি বিলুপ্তির কারণে ছাঁটাই এবং আইন অনুযায়ী কিছু বিশেষ ক্ষেত্রে অবসর সুবিধা দেওয়ার বিষয় রয়েছে।
অবসরপ্রাপ্তদের নিট পেনশন পুনর্নির্ধারণ
প্রজ্ঞাপনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশে ৩০ জুন ২০২৬ তারিখে প্রাপ্ত নিট পেনশনের ওপর ভিত্তি করে ২০২৬–২৭ অর্থবছর থেকে মূল পেনশনভোগীদের নিট পেনশন নির্ধারণের নতুন কাঠামো দেওয়া হয়েছে।
এক্ষেত্রে বিদ্যমান নিট পেনশনের পরিমাণ অনুযায়ী বৃদ্ধির হার আলাদা করা হয়েছে।
| ৩০ জুন ২০২৬ তারিখে প্রাপ্ত নিট পেনশন | নিট পেনশন বৃদ্ধির হার | ন্যূনতম নিট পেনশন | সর্বোচ্চ নিট পেনশন |
|---|---|---|---|
| সর্বনিম্ন–৯,০০০ টাকা | ১০০% | ১০,০০০ টাকা | ১৮,০০০ টাকা |
| ৯,০০১–২০,০০০ টাকা | ৭৫% | ১৮,০০১ টাকা | ৩৫,০০০ টাকা |
| ২০,০০১–৩০,০০০ টাকা | ৬৫% | ৩৫,০০১ টাকা | ৪৯,০০০ টাকা |
| ৩০,০০১–৪০,০০০ টাকা | ৬০% | ৪৯,০০১ টাকা | ৬২,০০০ টাকা |
| ৪০,০০১ টাকা ও তদূর্ধ্ব | ৫৫% | ৬২,০০১ টাকা | ৭০,২০০ টাকা |
অর্থাৎ, কম পরিমাণের বিদ্যমান নিট পেনশনের ক্ষেত্রে বৃদ্ধির হার তুলনামূলকভাবে বেশি রাখা হয়েছে। সর্বনিম্ন স্তরে ১০০ শতাংশ, এরপর ৭৫, ৬৫, ৬০ ও ৫৫ শতাংশ হারে নিট পেনশন বৃদ্ধির কাঠামো দেওয়া হয়েছে।
৭০,২০০ টাকার বেশি পেনশন যারা ইতোমধ্যে পাচ্ছেন
প্রজ্ঞাপনে একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্তও রাখা হয়েছে। যেসব বিদ্যমান পেনশনভোগী ইতোমধ্যে ৭০,২০০ টাকার অতিরিক্ত নিট পেনশন উত্তোলন করছেন, তারা পরবর্তী বার্ষিক বৃদ্ধি বা ইনক্রিমেন্টের সময়—১ জুলাই ২০২৭ পর্যন্ত—বিদ্যমান নিট পেনশন পাবেন।
এ কারণে নতুন কাঠামো প্রয়োগের ক্ষেত্রে প্রত্যেক পেনশনভোগীর বর্তমান নিট পেনশনের পরিমাণ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
আনুতোষিকের হার অপরিবর্তিত
প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, আনুতোষিকের বিদ্যমান হার অপরিবর্তিত থাকবে।
পেনশনযোগ্য চাকরিকাল অনুযায়ী হার হলো—
| পেনশনযোগ্য চাকরিকাল | আনুতোষিকের হার (প্রতি টাকা) |
|---|---|
| ৫ বছর বা তদূর্ধ্ব কিন্তু ১০ বছরের কম | ২৬৫ টাকা |
| ১০ বছর বা তদূর্ধ্ব কিন্তু ১৫ বছরের কম | ২৬৮ টাকা |
| ১৫ বছর বা তদূর্ধ্ব কিন্তু ২০ বছরের কম | ২৭৫ টাকা |
| ২০ বছর বা তদূর্ধ্ব | ২৮০ টাকা |
অর্থাৎ, ২০ বছর বা তার বেশি পেনশনযোগ্য চাকরিকালে আনুতোষিকের হার প্রতি টাকায় ২৮০ টাকা বহাল থাকবে।
চাকরি পেনশনযোগ্য হওয়ার আগে মৃত্যু বা অক্ষম হলে বিশেষ আর্থিক সহায়তা
প্রজ্ঞাপনে চাকরিকাল পূর্ণ হওয়ার আগেই কোনো সরকারি কর্মচারী স্বাস্থ্যগত কারণে অক্ষম হয়ে পড়লে অথবা মৃত্যুবরণ করলে কর্মচারী বা তার পরিবারকে এককালীন বিশেষ আর্থিক সহায়তার ব্যবস্থার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রজ্ঞাপনের ভাষ্য অনুযায়ী, একজন সরকারি কর্মচারী চাকরির মেয়াদ ৫ বছর পূর্ণ হওয়ার আগে স্বাস্থ্যগত কারণে অক্ষম হলে অথবা মৃত্যুবরণ করলে সংশ্লিষ্ট বিধান ও শর্ত অনুযায়ী বিশেষ আর্থিক সহায়তা পাওয়া যাবে।
এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—পেনশনযোগ্য চাকরিকাল পূর্ণ না হলেও নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে কর্মচারী বা তার পরিবারের জন্য আর্থিক সুরক্ষার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
বিধবা স্ত্রী বা বিপত্নীক স্বামীর আজীবন পারিবারিক পেনশন
প্রজ্ঞাপনে মৃত পেনশনভোগী কর্মচারীর বিধবা স্ত্রী বা বিপত্নীক স্বামীর আজীবন পারিবারিক পেনশন পাওয়ার বিষয়টিও উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রচলিত বিধান অনুযায়ী, মৃত কর্মচারীর বিধবা স্ত্রী/বিপত্নীক স্বামী পুনর্বিবাহ না করার শর্তে আজীবন পারিবারিক পেনশন পেতে পারেন। এ ক্ষেত্রে পারিবারিক পেনশন ভোগকালীন পুনর্বিবাহ না করার বিষয়ে নির্ধারিত অঙ্গীকারনামা বা প্রত্যয়নপত্র সংশ্লিষ্ট হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তার কার্যালয়ে দাখিল করার বিধান রয়েছে।
তবে বিধবা কর্তৃক পুনর্বিবাহ না করার অঙ্গীকারনামা বা প্রত্যয়নপত্র দাখিলের শর্ত ৫০ বছরের ঊর্ধ্বে স্বামীর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে না—এমন বিধানও প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ রয়েছে।
ছুটি নগদায়নে সর্বোচ্চ ১৮ মাসের সুবিধা
অবসরকালীন সুবিধার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো ছুটি নগদায়ন।
প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, অবসরকালীন ছুটি প্রাপ্যতার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ১৮ মাসের ছুটি নগদায়ন করা যাবে। অর্থাৎ, নির্ধারিত শর্ত পূরণকারী কর্মচারী অবসর গ্রহণের সময় সর্বোচ্চ ১৮ মাসের ছুটির আর্থিক সুবিধা পাওয়ার সুযোগ রাখবেন।
এছাড়া অবসর-উত্তর ছুটি (PRL) এবং ছুটি নগদায়নের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট অনুপাতে ছুটিকে গড় বেতনের ছুটিতে রূপান্তরের বিধানও উল্লেখ করা হয়েছে। অবসরকালীন মূল বেতনের ভিত্তিতে ছুটি নগদায়নের আর্থিক সুবিধা নির্ধারণ করা হবে।
গুরুত্বপূর্ণভাবে, অবসর-উত্তর ছুটি ভোগ না করলেও প্রযোজ্য আর্থিক সুবিধা পাওয়ার বিষয়টি প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়েছে।
নতুন সুবিধা কার্যকরের তারিখ
প্রজ্ঞাপনের শেষাংশে বলা হয়েছে, উল্লেখিত বিষয়গুলোর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিধান, আদেশ, স্মারক ও প্রজ্ঞাপন প্রয়োজন অনুযায়ী পরিবর্তিত বা সংশোধিত হয়েছে বলে গণ্য হবে।
এতে আরও বলা হয়েছে, চাকরি (বেতন ও ভাতাদি) আদেশ, ২০২৬ অনুযায়ী পেনশনভোগীদের নিট পেনশনের প্রাপ্যতা কার্যকর হবে। প্রজ্ঞাপনে উল্লেখিত কার্যকর তারিখ অনুযায়ী ১ জুলাই ২০২৬ থেকে সংশ্লিষ্ট পুনর্নির্ধারিত সুবিধা প্রযোজ্য হবে এবং ওই তারিখ থেকে পেনশনভোগীরা প্রযোজ্য ক্ষেত্রে পুনর্নির্ধারিত সুবিধা পাবেন।
কারা বেশি উপকৃত হবেন?
নথির কাঠামো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এর প্রভাব কয়েকটি বড় শ্রেণিতে পড়বে—
প্রথমত, যেসব সরকারি কর্মচারীর পেনশনযোগ্য চাকরিকাল ২৫ বছর বা তার বেশি, তাদের প্রথম পেনশন নির্ধারণের হার ৯০ শতাংশ পর্যন্ত যেতে পারে।
দ্বিতীয়ত, তুলনামূলক কম নিট পেনশন পাওয়া বিদ্যমান পেনশনভোগীদের ক্ষেত্রে বৃদ্ধির হার বেশি রাখা হয়েছে। বিশেষ করে ৯,০০০ টাকা পর্যন্ত নিট পেনশনের ক্ষেত্রে ১০০ শতাংশ বৃদ্ধির হার নির্ধারণ করা হয়েছে।
তৃতীয়ত, ২০ বছর বা তার বেশি পেনশনযোগ্য চাকরিকালের ক্ষেত্রে আনুতোষিকের হার প্রতি টাকায় ২৮০ টাকা বহাল রয়েছে।
চতুর্থত, চাকরি পেনশনযোগ্য হওয়ার আগে স্বাস্থ্যগত কারণে অক্ষমতা বা মৃত্যুর ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট শর্তে এককালীন বিশেষ আর্থিক সহায়তার বিধান থাকছে।
পঞ্চমত, বিধবা স্ত্রী বা বিপত্নীক স্বামীর আজীবন পারিবারিক পেনশন এবং অবসরকালীন ছুটি নগদায়নের বিষয়েও স্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
শেষ কথা
অর্থ মন্ত্রণালয়ের এই প্রজ্ঞাপনটি সরকারি কর্মচারী ও অবসরপ্রাপ্তদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এতে শুধু প্রথম পেনশন নির্ধারণের হার নয়, বরং বিদ্যমান পেনশনভোগীদের নিট পেনশন পুনর্নির্ধারণ, ন্যূনতম পেনশন, আনুতোষিক, পারিবারিক পেনশন, অক্ষমতা বা মৃত্যুর ক্ষেত্রে বিশেষ সহায়তা এবং ছুটি নগদায়ন—সবগুলো বিষয় একসঙ্গে নির্ধারণ করা হয়েছে।
সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনের মধ্যে রয়েছে ২৫ বছর বা তার বেশি পেনশনযোগ্য চাকরিকালে প্রথম পেনশন নির্ধারণের হার ৯০ শতাংশ, আর কম নিট পেনশন পাওয়া ব্যক্তিদের জন্য তুলনামূলক বেশি হারে নিট পেনশন বৃদ্ধির কাঠামো। তবে ব্যক্তিভেদে প্রকৃত পেনশন কত হবে, তা নির্ধারণের জন্য শেষ আহরিত মূল বেতন, পেনশনযোগ্য চাকরিকাল, ৩০ জুন ২০২৬-এর নিট পেনশন এবং সংশ্লিষ্ট বিধিমালার শর্ত বিবেচনা করতে হবে।

