BD Govt Service Rules

সরকারি ব্যাংকের কর্মীদের বোনাসে নতুন হিসাব: কর্মদক্ষতা ও চাকরির মেয়াদে নির্ধারিত হবে প্রাপ্য অর্থ

রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংক, বিশেষায়িত ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উৎসাহ বোনাস প্রদানের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট নীতিমালা অনুসরণের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। নতুন নির্দেশিকা অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সাফল্য, কর্মসম্পাদন মূল্যায়ন, চাকরির মেয়াদ এবং নির্ধারিত অনুমোদন প্রক্রিয়ার ভিত্তিতে বোনাসের সংখ্যা ও প্রাপ্যতা বিবেচনা করা হবে। সর্বোচ্চ তিনটি উৎসাহ বোনাস পাওয়ার সুযোগ থাকলেও প্রত্যেক কর্মচারী স্বয়ংক্রিয়ভাবে তিনটি বোনাস পাবেন না।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ ২০২৫ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর ‘রাষ্ট্রমালিকানাধীন বাণিজ্যিক ব্যাংক, তফসিলি বিশেষায়িত ব্যাংক, অ-তফসিলি বিশেষায়িত ব্যাংক এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানসমূহে কর্মরত কর্মচারীদের উৎসাহ বোনাস প্রদান নির্দেশিকা, ২০২৫’ জারি করে। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বোনাস প্রদানের ক্ষেত্রে এই নির্দেশিকায় বিভিন্ন শর্ত ও মূল্যায়ন পদ্ধতি নির্ধারণ করা হয়েছে।

কর্মসম্পাদনের নম্বরেই নির্ধারিত হবে বোনাসের সংখ্যা

নির্দেশিকার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, কর্মসম্পাদন মূল্যায়নে অর্জিত নম্বরের সঙ্গে উৎসাহ বোনাসের সংখ্যা সম্পর্কিত। অর্থাৎ, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ও পরিচালনাগত ফলাফল মূল্যায়নের পর নির্ধারিত নম্বর অনুযায়ী বোনাস দেওয়ার বিষয়টি বিবেচিত হবে।

প্রকাশিত নির্দেশিকার তথ্য অনুযায়ী, কর্মসম্পাদন মূল্যায়নে ৪০-এর কম নম্বর পেলে কোনো উৎসাহ বোনাস পাওয়া যাবে না। ৪০ থেকে ৫০-এর কম নম্বরের ক্ষেত্রে একটি, ৫০ থেকে ৬০-এর কম নম্বরে দেড়টি, ৬০ থেকে ৭০-এর কম নম্বরে দুটি এবং ৭০ থেকে ৮০-এর কম নম্বরে আড়াইটি বোনাস পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। অন্যদিকে, ৮০ বা তার বেশি নম্বর অর্জন করলে সর্বোচ্চ তিনটি বোনাসের যোগ্যতা বিবেচিত হবে।

তবে এই মূল্যায়ন কাঠামো প্রয়োগের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ধরন, নির্দেশিকার পূর্ণাঙ্গ শর্ত এবং অনুমোদন প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে।

প্রতিটি বোনাসের পরিমাণ কত?

নির্দেশিকা অনুযায়ী, প্রতিটি উৎসাহ বোনাসের পরিমাণ এক মাসের মূল বেতনের সমপরিমাণ। সংশ্লিষ্ট হিসাব বছরের শেষ মাসে প্রাপ্য মূল বেতনকে ভিত্তি ধরে বোনাসের অর্থ হিসাব করা হবে।

উদাহরণ হিসেবে, কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারীর হিসাব বছরের শেষ মাসে মূল বেতন ৪০ হাজার টাকা হলে একটি বোনাসের পরিমাণ হবে ৪০ হাজার টাকা। সে ক্ষেত্রে দেড়টি বোনাসের অর্থ দাঁড়াবে ৬০ হাজার টাকা, দুটি বোনাসে ৮০ হাজার টাকা এবং তিনটি বোনাসে মোট ১ লাখ ২০ হাজার টাকা।

একইভাবে, মূল বেতন ৫০ হাজার টাকা হলে তিনটি বোনাসের সম্ভাব্য মোট অর্থ হবে ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা। তবে এটি কেবল হিসাব বোঝানোর উদাহরণ। প্রকৃত প্রাপ্য অর্থ নির্ধারিত হবে কর্মসম্পাদন মূল্যায়ন, চাকরির মেয়াদ এবং প্রযোজ্য অন্যান্য শর্ত অনুযায়ী।

শুধু মুনাফা নয়, বিবেচনায় থাকবে ব্যাংকের সামগ্রিক সাফল্য

উৎসাহ বোনাস নির্ধারণে প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ফলাফল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তবে শুধু পরিচালন মুনাফা অর্জন করলেই সর্বোচ্চ বোনাস পাওয়ার নিশ্চয়তা থাকবে না। বরং নির্ধারিত সূচক অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানের কর্মসম্পাদন মূল্যায়ন করা হবে।

রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকের ক্ষেত্রে ওয়ার্কিং ফান্ডের ওপর নিট মুনাফার হার, আমানত বৃদ্ধির হার, ঋণ ও অগ্রিম বৃদ্ধির হার, শ্রেণিকৃত ঋণ থেকে নগদ আদায় এবং অবলোপন করা ঋণ থেকে নগদ আদায়ের মতো বিষয়গুলো মূল্যায়নের আওতায় রয়েছে।

এ ধরনের মূল্যায়নের মাধ্যমে ব্যাংকের আর্থিক কার্যক্রমের পাশাপাশি ঋণ ব্যবস্থাপনা, আমানত সংগ্রহ এবং খেলাপি ঋণ আদায়ের অগ্রগতিও বিবেচনা করা সম্ভব হবে। ফলে প্রতিষ্ঠানগুলোর সামগ্রিক কর্মসম্পাদন উৎসাহ বোনাস নির্ধারণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

প্রতিষ্ঠানভেদে আলাদা মূল্যায়ন পদ্ধতি

সব ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম এক রকম নয়। এ কারণে নির্দেশিকায় প্রতিষ্ঠানভেদে মূল্যায়নের সূচকেও পার্থক্য রাখা হয়েছে।

রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংক, তফসিলি বিশেষায়িত ব্যাংক, অ-তফসিলি বিশেষায়িত ব্যাংক এবং বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কার্যক্রমের ধরন বিবেচনায় নির্ধারিত সূচক প্রয়োগ করা হবে। ফলে একটি প্রতিষ্ঠানের মূল্যায়ন পদ্ধতি অন্য প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে পুরোপুরি এক নাও হতে পারে।

এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ধরন অনুযায়ী নির্ধারিত সূচক, প্রযোজ্য নম্বর বণ্টন এবং অনুমোদনসংক্রান্ত বিধান অনুসরণ করা জরুরি।

নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত ও অবসরে যাওয়া কর্মীদের ক্ষেত্রে কী হবে?

বোনাস পাওয়ার ক্ষেত্রে চাকরির মেয়াদও গুরুত্বপূর্ণ। নির্দেশিকায় নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মচারীদের জন্য সংশ্লিষ্ট বছরে কমপক্ষে ছয় মাস চাকরিতে থাকার শর্ত উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে কোনো কর্মচারী সংশ্লিষ্ট হিসাব বছরে কত দিন চাকরিতে ছিলেন, তা বোনাসের যোগ্যতা ও পরিমাণ নির্ধারণে প্রাসঙ্গিক হতে পারে।

এ ছাড়া অবসর-পূর্ব ছুটিতে থাকা, চূড়ান্ত অবসরে যাওয়া কিংবা পদত্যাগ করা কর্মচারীদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য শর্ত অনুযায়ী বোনাস বিবেচনার বিধান রয়েছে। তবে এসব ক্ষেত্রে প্রত্যেকের প্রাপ্যতা একই হবে—এমন নয়। সংশ্লিষ্ট পরিস্থিতি, চাকরির মেয়াদ এবং নির্দেশিকার নির্ধারিত শর্তের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

চাকরিচ্যুত, বরখাস্ত কিংবা সাময়িক বরখাস্ত হওয়া কর্মচারীদের ক্ষেত্রেও নির্দেশিকার প্রযোজ্য বিধান অনুসরণ করতে হবে।

বোনাস প্রদানে পরিচালনা পর্ষদ ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের ভূমিকা

উৎসাহ বোনাস প্রদানের ক্ষেত্রে অনুমোদন প্রক্রিয়াও গুরুত্বপূর্ণ। রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে নির্দেশিকা অনুসারে নিজ নিজ পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদন নিয়ে বোনাস ঘোষণার ব্যবস্থা করতে হবে।

অন্যদিকে, রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে পরিচালনা পর্ষদের সুপারিশের ভিত্তিতে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের অনুমোদন প্রয়োজন হতে পারে। ফলে শুধু মূল্যায়নে ভালো ফলাফল অর্জন করলেই বোনাস প্রদানের সব আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয়ে যায় না; সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের জন্য নির্ধারিত অনুমোদন প্রক্রিয়াও অনুসরণ করতে হবে।

এ ছাড়া নির্ধারিত শর্তে নিয়মিত উৎসাহ বোনাস দেওয়ার যোগ্যতা না থাকলেও বিশেষ অর্জনের ক্ষেত্রে এক মাসের মূল বেতনের সমপরিমাণ অর্থ এক্স-গ্রেশিয়া হিসেবে দেওয়ার বিষয়টি বিবেচিত হতে পারে। তবে এটি নিশ্চিত প্রাপ্যতা নয়; সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বিবেচনা ও অনুমোদনের ওপর নির্ভরশীল।

কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ এই নির্দেশিকা?

এই নির্দেশিকার মাধ্যমে উৎসাহ বোনাস প্রদানের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট মূল্যায়ন কাঠামো অনুসরণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এতে প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ফলাফল, কর্মসম্পাদনের মান এবং চাকরির মেয়াদের মতো বিষয়গুলো গুরুত্ব পাবে।

কর্মচারীদের জন্য এর অর্থ হলো, সর্বোচ্চ তিনটি বোনাস পাওয়ার সুযোগ থাকলেও চূড়ান্ত প্রাপ্যতা নির্ভর করবে নির্ধারিত যোগ্যতা পূরণের ওপর। অন্যদিকে, প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য নির্দেশিকাটি বোনাস প্রদানের ক্ষেত্রে নিয়মতান্ত্রিক মূল্যায়ন ও অনুমোদন প্রক্রিয়া অনুসরণের ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে।

তবে বোনাসের সংখ্যা, প্রাপ্য অর্থ এবং চাকরির মেয়াদসংক্রান্ত শর্ত সম্পর্কে নিশ্চিত হতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের মানবসম্পদ বিভাগ বা প্রশাসনিক শাখার সঙ্গে যোগাযোগ করা এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের মূল নির্দেশিকা যাচাই করা প্রয়োজন।

এক নজরে উৎসাহ বোনাস নির্দেশিকা, ২০২৫

  • নির্দেশিকা জারির তারিখ: ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৫।
  • সর্বোচ্চ উৎসাহ বোনাস: তিনটি।
  • প্রতিটি বোনাসের পরিমাণ: এক মাসের মূল বেতনের সমপরিমাণ।
  • বোনাস নির্ধারণের ভিত্তি: কর্মসম্পাদন মূল্যায়ন ও নির্ধারিত আর্থিক সূচক।
  • ৮০ বা তার বেশি নম্বর: সর্বোচ্চ তিনটি বোনাসের যোগ্যতা বিবেচনা।
  • ৪০-এর কম নম্বর: কোনো উৎসাহ বোনাস নেই।
  • নতুন নিয়োগপ্রাপ্তদের ক্ষেত্রে: সংশ্লিষ্ট বছরে কমপক্ষে ছয় মাস চাকরিতে থাকার শর্ত রয়েছে।
  • অনুমোদন: প্রতিষ্ঠানভেদে পরিচালনা পর্ষদ এবং প্রয়োজনে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের অনুমোদন প্রয়োজন।

শেষ কথা

সরকারি ব্যাংক ও সংশ্লিষ্ট আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য উৎসাহ বোনাস একটি গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক সুবিধা। তবে বছরে সর্বোচ্চ তিনটি বোনাস পাওয়ার বিধানকে সবার জন্য নিশ্চিত তিনটি বোনাস হিসেবে বিবেচনা করা ঠিক হবে না। কর্মসম্পাদনের ফলাফল, প্রাপ্য মূল বেতন, চাকরির মেয়াদ এবং সংশ্লিষ্ট অনুমোদন প্রক্রিয়ার ভিত্তিতেই চূড়ান্ত বোনাস নির্ধারিত হবে।

তথ্যসূত্র: অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের ‘উৎসাহ বোনাস প্রদান নির্দেশিকা, ২০২৫’। সংবাদ প্রকাশের আগে মূল নির্দেশিকার পূর্ণাঙ্গ শর্ত ও মূল্যায়ন ছক যাচাই করে নেওয়া উচিত।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *