BD Govt Service Rules

২০ দিন নৈমিত্তিক ছুটি শেষ হলে প্রাথমিকের সহকারী শিক্ষক কী ছুটি নেবেন?

নিজের অসুস্থতা, পরিবারের অসুস্থ সদস্যের দেখাশোনা কিংবা ব্যক্তিগত প্রয়োজনে ছুটির ধরন এক নয়। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কোনো সহকারী শিক্ষক চলতি পঞ্জিকাবর্ষে ২০ দিনের নৈমিত্তিক ছুটি ইতোমধ্যে ভোগ করে ফেললে এরপর আবার ১ দিন, ২ দিন কিংবা টানা ৩–৪ দিনের ছুটির প্রয়োজন হলে কোন ছুটি নেওয়া যাবে—এ নিয়ে অনেকের মধ্যেই বিভ্রান্তি রয়েছে।

বিশেষ করে কোনো শিক্ষক বাবার বা মায়ের অসুস্থতার কারণে বছরের শুরু থেকেই একাধিকবার নৈমিত্তিক ছুটি নেওয়ার পর ২০ দিনের কোটা শেষ করে ফেললে পরবর্তী সময়ে ছুটি নেওয়ার ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮-এর ১৬ ধারায় বলা হয়েছে, একজন সরকারি কর্মচারী তাঁর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য বিধান ও সরকারি আদেশ অনুযায়ী ছুটি প্রাপ্য ও ভোগ করতে পারবেন। অর্থাৎ কোনো ছুটি নেওয়ার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ছুটির প্রাপ্যতা এবং বিধিবিধান অনুসরণ করা বাধ্যতামূলক।

বছরে ২০ দিনের নৈমিত্তিক ছুটি

সরকারি কর্মচারীদের জন্য নৈমিত্তিক ছুটির বার্ষিক সীমা ২০ দিন। সরকারি শিক্ষক বাতায়নে প্রকাশিত ছুটি-সংক্রান্ত তথ্যেও বলা হয়েছে, একজন সরকারি কর্মচারী পঞ্জিকাবর্ষে সর্বমোট ২০ দিন নৈমিত্তিক ছুটি ভোগ করতে পারেন। একই তথ্য অনুযায়ী, সাধারণভাবে একসঙ্গে ১০ দিনের বেশি নৈমিত্তিক ছুটি মঞ্জুর করা যায় না।

তাই কোনো প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক যদি চলতি বছরে ইতোমধ্যে ২০ দিন নৈমিত্তিক ছুটি সম্পূর্ণ ভোগ করে থাকেন, তাহলে একই পঞ্জিকাবর্ষে পরবর্তী ১–৪ দিনের অনুপস্থিতিকে আবার নৈমিত্তিক ছুটি হিসেবে দেখানোর সুযোগ সাধারণভাবে থাকবে না।

এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে মনে রাখা দরকার—‘একটানা কত দিন নৈমিত্তিক ছুটি নেওয়া যায়’ এবং ‘বছরে মোট কত দিন নৈমিত্তিক ছুটি পাওয়া যায়’—এ দুটি আলাদা বিষয়। ২০ দিনের বার্ষিক সীমা শেষ হয়ে গেলে নতুন করে নৈমিত্তিক ছুটির দিন তৈরি হয় না।

এরপর ১ দিনের ছুটি প্রয়োজন হলে কী করবেন?

ধরা যাক, একজন সহকারী শিক্ষক বাবার অসুস্থতার কারণে চলতি বছরে ২০ দিন নৈমিত্তিক ছুটি নিয়েছেন। এখন আবার বাবাকে হাসপাতালে নেওয়ার জন্য একদিন বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত থাকতে হবে।

এ অবস্থায় প্রথম কাজ হবে ছুটি হিসাবে অন্য কোনো ছুটি প্রাপ্য আছে কি না, তা যাচাই করা।

যদি তাঁর অর্জিত ছুটি থাকে, তাহলে প্রযোজ্য বিধান অনুযায়ী অর্জিত ছুটির জন্য আবেদন করা যেতে পারে। অর্জিত ছুটি নৈমিত্তিক ছুটির মতো পঞ্জিকাবর্ষভিত্তিক ২০ দিনের আলাদা কোটা নয়; এটি চাকরিকালীন সময়ে বিধি অনুযায়ী অর্জিত হয়।

নির্ধারিত ছুটি বিধিমালা, ১৯৫৯-সংক্রান্ত সরকারি তথ্য অনুযায়ী, স্থায়ী সরকারি কর্মচারী কর্মকালীন সময়ের ভিত্তিতে গড় বেতনে এবং অর্ধগড় বেতনে অর্জিত ছুটি অর্জন করেন। গড় বেতনে ছুটির ক্ষেত্রে প্রতি ১১ দিন কর্মকালীন সময়ের জন্য ১ দিন এবং অর্ধগড় বেতনে প্রতি ১২ দিনের জন্য ১ দিন ছুটি অর্জনের বিধান উল্লেখ রয়েছে।

অতএব, ২০ দিনের নৈমিত্তিক ছুটি শেষ হয়ে গেলে প্রাপ্য অর্জিত ছুটি থাকলে ১ দিনের জন্য অর্জিত ছুটির আবেদন করা যেতে পারে।

২ দিন বা ৩–৪ দিনের ছুটির ক্ষেত্রেও কি অর্জিত ছুটি?

একইভাবে ২ দিন, ৩ দিন বা ৪ দিনের ছুটির প্রয়োজন হলেও প্রথমে দেখতে হবে সংশ্লিষ্ট শিক্ষকের অর্জিত ছুটির ব্যালেন্স কত দিন।

ছুটির প্রয়োজন কয়েক দিনের হলেই সেটিকে নৈমিত্তিক ছুটি হিসেবে নেওয়া যাবে—এমন নয়। বরং যে ছুটি প্রাপ্য রয়েছে, সেই ছুটির বিধান অনুযায়ী আবেদন করতে হবে।

অর্থাৎ—

২০ দিন নৈমিত্তিক ছুটি শেষ + অর্জিত ছুটি রয়েছে = প্রযোজ্য ক্ষেত্রে অর্জিত ছুটির আবেদন করা যেতে পারে।

তবে অর্জিত ছুটি থাকলেই তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে অনুমোদিত হয়ে যায় না। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন প্রয়োজন।

বাবার অসুস্থতার জন্য কি ‘মেডিকেল ছুটি’ নেওয়া যাবে?

এখানেই সবচেয়ে বেশি ভুল বোঝাবুঝি হয়।

যদি শিক্ষক নিজেই অসুস্থ হন এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী কর্মস্থলে উপস্থিত হতে না পারেন, তাহলে চিকিৎসাজনিত কারণে প্রযোজ্য ছুটির বিধান অনুসরণ করা যেতে পারে। প্রয়োজনে চিকিৎসা-সংক্রান্ত কাগজপত্র বা মেডিকেল প্রত্যয়নপত্রের প্রয়োজন হতে পারে।

কিন্তু প্রশ্নে যদি এমন পরিস্থিতি থাকে যে শিক্ষকের বাবা অসুস্থ এবং বাবাকে দেখাশোনা করার জন্য শিক্ষককে ছুটি নিতে হচ্ছে, তাহলে সেটিকে সরাসরি শিক্ষকের নিজের ‘মেডিকেল ছুটি’ হিসেবে দেখানো ঠিক হবে না।

অর্থাৎ, বাবার চিকিৎসা চলছে—এই কারণে মায়ের নিজের অসুস্থতার মেডিকেল ছুটি দাবি করার বিষয়টি আলাদা। ছুটির আবেদন করতে হবে প্রকৃত কারণ উল্লেখ করে এবং প্রযোজ্য ছুটির বিধান অনুযায়ী।

‘অর্জিত ছুটি’ কেন গুরুত্বপূর্ণ?

অর্জিত ছুটি সরকারি কর্মচারীর চাকরিকালীন সময়ে জমা হয়। সরকারি ছুটি বিধিমালার তথ্য অনুযায়ী, গড় বেতনে অর্জিত ছুটি এবং অর্ধগড় বেতনে অর্জিত ছুটি—দুই ধরনের ব্যবস্থা রয়েছে।

ফলে দীর্ঘদিন চাকরিতে থাকা একজন শিক্ষক বা কর্মচারীর ছুটি হিসাবে অর্জিত ছুটি জমা থাকতে পারে। তবে একজন নির্দিষ্ট শিক্ষকের ক্ষেত্রে ঠিক কত দিন অর্জিত ছুটি রয়েছে, তা তাঁর ব্যক্তিগত ছুটি হিসাব না দেখে বলা সম্ভব নয়।

এ কারণে ২০ দিন নৈমিত্তিক ছুটি শেষ হওয়ার পর নতুন করে ১–৪ দিনের ছুটি প্রয়োজন হলে প্রথমেই বিদ্যালয়ের Leave Account/ছুটি হিসাব যাচাই করা উচিত।

শ্রান্তি ও বিনোদন ছুটি থাকলে কী হবে?

আরেকটি সম্ভাবনা হলো শ্রান্তি ও বিনোদন ছুটি।

কোনো কর্মচারীর শ্রান্তি ও বিনোদন ছুটি প্রাপ্য হয়ে থাকলে এবং নির্ধারিত সময়সীমা পূরণ হলে বিধি অনুযায়ী সেই ছুটির আবেদন করা যেতে পারে। সরকারি সেবা-তথ্যেও শ্রান্তি ও বিনোদন ছুটির ক্ষেত্রে ছুটি প্রাপ্যতার প্রতিবেদন এবং পূর্ববর্তী ছুটি ভোগের আদেশের মতো নথি প্রয়োজন হতে পারে বলে উল্লেখ রয়েছে।

তবে শ্রান্তি ও বিনোদন ছুটি নৈমিত্তিক ছুটির বিকল্প হিসেবে ইচ্ছামতো ১ বা ২ দিন করে নেওয়ার ছুটি নয়। এটি প্রাপ্যতার সময়, সংশ্লিষ্ট বিধান এবং কর্তৃপক্ষের অনুমোদনের ওপর নির্ভর করে।

তাই ২০ দিনের নৈমিত্তিক ছুটি শেষ হয়েছে বলেই সরাসরি শ্রান্তি ও বিনোদন ছুটি পাওয়া যাবে—এমন ধারণাও সঠিক নয়।

‘একটানা ১০ দিনের বেশি নেওয়া যায় না’—বিষয়টি কী?

নৈমিত্তিক ছুটির ক্ষেত্রে একসঙ্গে সর্বোচ্চ কত দিন এবং পুরো বছরে মোট কত দিন—এই দুই বিষয় আলাদা করে দেখতে হবে।

সরকারি শিক্ষক বাতায়নে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, সাধারণ সরকারি কর্মচারীর ক্ষেত্রে একসঙ্গে ১০ দিনের বেশি নৈমিত্তিক ছুটি মঞ্জুর করা যায় না। একই সঙ্গে পঞ্জিকাবর্ষে মোট নৈমিত্তিক ছুটির সীমা ২০ দিন।

তাই কেউ যদি ২০ দিনের নৈমিত্তিক ছুটি ভিন্ন ভিন্ন সময়ে ভাগ করে নিয়ে থাকেন, তবুও মোট ২০ দিন পূর্ণ হয়ে গেলে ওই বছরে আর নৈমিত্তিক ছুটির অবশিষ্ট দিন থাকবে না।

ছুটির আবেদন করার আগে ৫টি বিষয় যাচাই করুন

প্রাথমিকের কোনো সহকারী শিক্ষকের নৈমিত্তিক ছুটি ২০ দিন পূর্ণ হয়ে গেলে পরবর্তী ছুটির আগে নিচের বিষয়গুলো যাচাই করা সবচেয়ে নিরাপদ—

১. নৈমিত্তিক ছুটি:
চলতি বছরে সত্যিই ২০ দিন পূর্ণ হয়েছে কি না, ছুটি হিসাব দেখে নিশ্চিত হতে হবে।

২. অর্জিত ছুটি:
ছুটি হিসাবে কত দিন অর্জিত ছুটি জমা রয়েছে তা দেখতে হবে।

৩. ছুটির প্রকৃত কারণ:
নিজের অসুস্থতা, পরিবারের সদস্যের অসুস্থতা এবং ব্যক্তিগত প্রয়োজন—কোন কারণে ছুটি প্রয়োজন তা স্পষ্ট করতে হবে।

৪. চিকিৎসা-সংক্রান্ত কাগজপত্র:
নিজের অসুস্থতার কারণে চিকিৎসাজনিত ছুটি হলে প্রযোজ্য মেডিকেল কাগজপত্র প্রয়োজন হতে পারে।

৫. কর্তৃপক্ষের অনুমোদন:
যে ছুটিই নেওয়া হোক, যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছাড়া অনুপস্থিত থাকা উচিত নয়। সরকারি চাকরি আইনেও ছুটি প্রাপ্যতা ও ভোগকে প্রযোজ্য বিধান ও সরকারি আদেশের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে।

কোন পরিস্থিতিতে কোন ছুটি?

পরিস্থিতিকী বিবেচনা করা হবে
২০ দিনের নৈমিত্তিক ছুটি এখনো শেষ হয়নিঅবশিষ্ট নৈমিত্তিক ছুটি
২০ দিনের নৈমিত্তিক ছুটি শেষপ্রাপ্য অর্জিত ছুটি
শিক্ষক নিজে অসুস্থপ্রযোজ্য চিকিৎসাজনিত ছুটি/অর্জিত ছুটি ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র
বাবা অসুস্থ, শিক্ষক দেখাশোনা করবেননিজের মেডিকেল ছুটি নয়; প্রাপ্য অন্য ছুটি বিবেচনা
শ্রান্তি ও বিনোদন ছুটি প্রাপ্য হয়েছেবিধি ও কর্তৃপক্ষের অনুমোদন সাপেক্ষে
কোনো প্রযোজ্য ছুটি নেইকর্তৃপক্ষের সঙ্গে পরামর্শ করে বিধিসম্মত ব্যবস্থা

তাহলে ওই শিক্ষকের ক্ষেত্রে সবচেয়ে সম্ভাব্য সমাধান কী?

প্রশ্নে বর্ণিত পরিস্থিতিতে যদি একজন প্রাথমিকের সহকারী শিক্ষক চলতি বছরে ২০ দিন নৈমিত্তিক ছুটি ইতোমধ্যে ভোগ করে থাকেন, এরপর আবার বাবার অসুস্থতার কারণে ১–৪ দিনের ছুটি প্রয়োজন হয়, তাহলে প্রথমে তাঁর অর্জিত ছুটির প্রাপ্যতা পরীক্ষা করা উচিত।

অর্জিত ছুটি থাকলে প্রকৃত কারণ উল্লেখ করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে অর্জিত ছুটির আবেদন করা যেতে পারে। আর যদি নিজের অসুস্থতার কারণে ছুটি প্রয়োজন হয়, তাহলে চিকিৎসাজনিত ছুটির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য বিধান ও চিকিৎসা-সংক্রান্ত কাগজপত্র অনুসরণ করতে হবে।

অন্যদিকে, শ্রান্তি ও বিনোদন ছুটি যদি ওই সময়ে প্রাপ্য হয়ে থাকে, সেটিও বিধি অনুযায়ী বিবেচনা করা যেতে পারে।

শেষ কথা

২০ দিনের নৈমিত্তিক ছুটি শেষ হয়ে গেলে আবার ১–৪ দিনের প্রয়োজন হলেই নতুন করে নৈমিত্তিক ছুটি নেওয়া যাবে—এমন নয়। সরকারি চাকরিতে ছুটি নির্ধারণের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্মচারীর ছুটি হিসাব, ছুটির ধরন, ছুটির কারণ এবং অনুমোদনকারী কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ।

তাই এমন পরিস্থিতিতে সবচেয়ে নিরাপদ পদ্ধতি হলো—প্রথমে ছুটি হিসাব যাচাই করা, এরপর প্রাপ্য অর্জিত ছুটি বা অন্য কোনো প্রযোজ্য ছুটির জন্য আবেদন করা। বাবার অসুস্থতার কারণে ছুটি প্রয়োজন হলে সেটিকে শিক্ষকের নিজের ‘মেডিকেল ছুটি’ হিসেবে না দেখিয়ে প্রকৃত কারণ অনুযায়ী বিধিসম্মত ছুটির আবেদন করাই উচিত।

সর্বশেষ সিদ্ধান্ত অবশ্যই সংশ্লিষ্ট শিক্ষক/কর্মচারীর ছুটি হিসাব ও প্রযোজ্য বিধান দেখে অনুমোদনকারী কর্তৃপক্ষ দেবেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *