৯ম পে স্কেলে বেতন বৈষম্য দূর করার ৫ দফা প্রস্তাব, শিক্ষা ও টিফিন ভাতা বাড়ানোর দাবি
সরকারি কর্মচারীদের নতুন বেতন কাঠামো নিয়ে আলোচনার মধ্যে ৯ম জাতীয় পে স্কেলের কয়েকটি অসংগতি সংশোধনের দাবি সামনে এসেছে। বাড়িভাড়া ভাতার হার, শিক্ষা ভাতার পরিমাণ, বৈশাখী ভাতা, টিফিন ভাতা এবং উচ্চতর গ্রেড প্রদানের নিয়ম নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিভিন্ন গ্রেডের কর্মচারীরা। তাঁদের মতে, নতুন বেতন কাঠামোয় মূল বেতন নির্ধারণের পাশাপাশি আনুষঙ্গিক ভাতাগুলোর মধ্যেও সামঞ্জস্য থাকা প্রয়োজন। অন্যথায় কোনো কোনো ক্ষেত্রে নিম্নতর গ্রেডের কর্মচারী উচ্চতর গ্রেডের কর্মচারীর চেয়ে বেশি মোট বেতন পাওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
এ পরিস্থিতিতে পে স্কেলের অসংগতিগুলো চিহ্নিত করে পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ সংশোধনী প্রস্তাব তুলে ধরা হয়েছে। প্রস্তাবগুলোর মধ্যে রয়েছে এক সন্তানের জন্য ২ হাজার এবং দুই সন্তানের জন্য ৪ হাজার টাকা শিক্ষা ভাতা, বাড়িভাড়া ভাতার হার সমন্বয়, বৈশাখী ভাতা আগের ২০ শতাংশে ফিরিয়ে আনা, টিফিন ভাতা বৃদ্ধি এবং চাকরিতে যোগদানের তারিখ অনুযায়ী উচ্চতর গ্রেড প্রদানের ব্যবস্থা।
কর্মচারীদের প্রত্যাশা, এসব বিষয় পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় সংশোধন করা হলে নতুন বেতন কাঠামোর ক্ষেত্রে গ্রেডভিত্তিক অসামঞ্জস্য কমবে এবং দীর্ঘদিনের বিভিন্ন দাবি পূরণের সুযোগ তৈরি হবে।
বাড়িভাড়া ভাতার কারণে উল্টো বেতন বৈষম্যের অভিযোগ
নতুন বেতন কাঠামোর আলোচনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে উঠে এসেছে বাড়িভাড়া ভাতার গ্রেডভিত্তিক অসংগতি। বিভিন্ন স্থানে বাড়িভাড়ার হার ভিন্ন হওয়ায় একই ধরনের চাকরির ক্ষেত্রে কর্মচারীদের মোট বেতনে অপ্রত্যাশিত পার্থক্য তৈরি হচ্ছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
এ বিষয়ে ১৭তম ও ১৫তম গ্রেডের দুটি উদাহরণ তুলে ধরা হয়েছে। হিসাব অনুযায়ী, ১৭তম গ্রেডের মূল বেতন ২১ হাজার ৪০০ টাকা এবং বাড়িভাড়া ৬০ শতাংশ হলে বাড়িভাড়া দাঁড়ায় ১২ হাজার ৮৪০ টাকা। অন্যদিকে ১৫তম গ্রেডের মূল বেতন ২২ হাজার ৮০০ টাকা হলেও বাড়িভাড়া ৫০ শতাংশ হওয়ায় পাওয়া যায় ১১ হাজার ৪০০ টাকা।
অর্থাৎ ১৫তম গ্রেডে মূল বেতন বেশি হলেও বাড়িভাড়া কম হওয়ার কারণে মোট বেতনের হিসাবে ১৭তম গ্রেডের কর্মচারী এগিয়ে যাচ্ছেন।
প্রস্তাবিত হিসাব অনুযায়ী, ১৭তম গ্রেডের কর্মচারীর মোট মাসিক বেতন দাঁড়ায় ৩৯ হাজার ৭৯০ টাকা। অন্যদিকে ১৫তম গ্রেডের কর্মচারীর মোট বেতন ৩৯ হাজার ৪৫০ টাকা। ফলে উচ্চতর গ্রেডে থাকা কর্মচারী ৩৪০ টাকা কম পাচ্ছেন।
এ ধরনের পরিস্থিতি একই সময়ে চাকরিতে যোগদান করা কর্মচারীদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি করতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এ সমস্যা সমাধানে ১০ম থেকে ১৫তম গ্রেডের বাড়িভাড়া ভাতার হার স্থানভেদে সমন্বয় করে ৫ শতাংশ বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়েছে। তাঁদের মতে, বাড়িভাড়া নির্ধারণের এমন একটি নীতি প্রয়োজন, যাতে গ্রেডভিত্তিক মূল বেতনের সঙ্গে আনুষঙ্গিক ভাতার সামঞ্জস্য বজায় থাকে।
শিক্ষা ভাতা এক সন্তানে ২ হাজার, দুই সন্তানে ৪ হাজার টাকা করার প্রস্তাব
সরকারি কর্মচারীদের সন্তানদের শিক্ষা ব্যয় মেটানো বর্তমানে একটি বড় আর্থিক চ্যালেঞ্জ। শিক্ষা উপকরণ, বই-খাতা, পোশাক, যাতায়াত এবং অন্যান্য খরচের কারণে পরিবারের মাসিক ব্যয় বাড়ছে।
এ অবস্থায় শিক্ষা ভাতার পরিমাণ পুনর্নির্ধারণের দাবি উঠেছে। প্রস্তাব অনুযায়ী, একজন সন্তানের জন্য মাসিক শিক্ষা ভাতা ২ হাজার টাকা এবং দুই সন্তানের জন্য ৪ হাজার টাকা নির্ধারণ করা উচিত।
কর্মচারীদের যুক্তি, শিক্ষা ভাতা এমনভাবে নির্ধারণ করা প্রয়োজন, যাতে সন্তানদের প্রাথমিক শিক্ষা ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় ব্যয়ের ক্ষেত্রে অভিভাবকেরা কিছুটা আর্থিক স্বস্তি পান। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যম গ্রেডের কর্মচারীদের জন্য এই সুবিধা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
বৈশাখী ভাতা ২০ শতাংশ বহাল রাখার দাবি
বৈশাখী ভাতার হার নিয়েও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। কর্মচারীদের উত্থাপিত অভিযোগ অনুযায়ী, আগের ২০ শতাংশের পরিবর্তে নতুন হিসাবের ক্ষেত্রে ১৫ শতাংশ করার বিষয়টি সামনে এসেছে।
তাঁরা মনে করছেন, বাংলা নববর্ষ বাঙালির ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। বছরে একবার অনুষ্ঠিত এই উৎসব উপলক্ষে দেওয়া ভাতার হার কমানোর পরিবর্তে আগের ২০ শতাংশ বহাল রাখা প্রয়োজন।
বিশেষ করে বর্তমান বাজারদর ও উৎসবের খরচ বিবেচনায় বৈশাখী ভাতার হার পূর্বের অবস্থায় ফিরিয়ে নেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে।
৫০০ টাকার টিফিন ভাতা দিয়ে দৈনিক নাশতার খরচ মেটানো কঠিন
টিফিন ভাতার পরিমাণ নিয়েও নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। কর্মচারীদের মতে, বর্তমান বাজারদরে মাসিক ৫০০ টাকা টিফিন ভাতা দিয়ে কর্মদিবসের নাশতার খরচ মেটানো কঠিন।
একজন সাধারণ কর্মচারীর দৈনিক নাশতার সম্ভাব্য ব্যয় তুলে ধরে বলা হয়েছে, এক পিস পাউরুটি ১৫ টাকা, একটি কলা ১৫ টাকা, এক কাপ চা ১৫ টাকা এবং এক গ্লাস পানির জন্য ১০ টাকা প্রয়োজন হতে পারে। সব মিলিয়ে দৈনিক ব্যয় দাঁড়ায় ৫৫ টাকা।
মাসে ২২ কর্মদিবস হিসাব করলে নাশতার খরচ দাঁড়ায় ১ হাজার ২১০ টাকা।
অথচ মাসিক ৫০০ টাকা টিফিন ভাতা ২২ কর্মদিবসে ভাগ করলে প্রতিদিন পাওয়া যায় মাত্র ২২ টাকা ৭২ পয়সা। অর্থাৎ প্রস্তাবিত ভাতার পরিমাণের সঙ্গে বাস্তব ব্যয়ের উল্লেখযোগ্য ব্যবধান রয়েছে।
এ কারণে টিফিন ভাতা বাড়িয়ে বাজারদরের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার দাবি জানানো হয়েছে। কর্মচারীদের মতে, কর্মঘণ্টায় প্রয়োজনীয় নাশতার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে টিফিন ভাতার পরিমাণ পুনর্বিবেচনা করা জরুরি।
উচ্চতর গ্রেড প্রদানে চাকরিতে যোগদানের তারিখ বিবেচনার দাবি
পে স্কেলের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে উচ্চতর গ্রেড প্রদান। এ ক্ষেত্রে উন্নীত গ্রেড ও উচ্চতর গ্রেডকে একইভাবে বিবেচনা করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
কর্মচারীদের বক্তব্য, উচ্চতর গ্রেড এবং উন্নীত গ্রেডের উদ্দেশ্য ও প্রক্রিয়া এক নয়। উচ্চতর গ্রেডের ক্ষেত্রে একজন কর্মচারীর চাকরির মেয়াদ, পদোন্নতি না পাওয়া এবং সংশ্লিষ্ট বিধিমালার শর্ত বিবেচনা করা প্রয়োজন।
এ বিষয়ে প্রস্তাব করা হয়েছে, কর্মচারীর চাকরিতে যোগদানের তারিখ থেকে পদোন্নতিবিহীন চাকরির সময় গণনা করে নির্ধারিত সময় পূর্ণ হলে উচ্চতর গ্রেড প্রদান করতে হবে। প্রস্তাবিত হিসাব অনুযায়ী, প্রথম উচ্চতর গ্রেড ৮ বছর এবং পরবর্তী উচ্চতর গ্রেড আরও ৬ বছর পূর্ণ হওয়ার ভিত্তিতে দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে।
অন্যদিকে উন্নীত গ্রেডের বিষয়টি পৃথকভাবে বিবেচনা করার দাবি জানানো হয়েছে। তাঁদের মতে, দুটি সুবিধার মধ্যে পার্থক্য স্পষ্ট না হলে কর্মচারীদের প্রাপ্যতা নির্ধারণে জটিলতা তৈরি হতে পারে।
পাঁচটি প্রস্তাবের মূল লক্ষ্য কী?
উত্থাপিত দাবিগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এগুলোর মূল উদ্দেশ্য পাঁচটি ক্ষেত্রে সামঞ্জস্য প্রতিষ্ঠা করা।
- শিক্ষা ভাতা: সন্তানদের শিক্ষা ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ভাতা বৃদ্ধি।
- বাড়িভাড়া: গ্রেড ও এলাকাভেদে ভাতার অসংগতি কমানো।
- বৈশাখী ভাতা: পূর্বের ২০ শতাংশ বহাল রাখা।
- টিফিন ভাতা: দৈনন্দিন নাশতার ব্যয় বিবেচনায় ভাতা পুনর্নির্ধারণ।
- উচ্চতর গ্রেড: চাকরির মেয়াদ ও পদোন্নতির ভিত্তিতে প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা।
সংশোধনী প্রস্তাব বাস্তবায়নে কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ
সরকারি কর্মচারীদের বেতন কাঠামো শুধু মূল বেতন নির্ধারণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে বিভিন্ন ভাতা, পদোন্নতির সুযোগ, চাকরির মেয়াদ এবং কর্মচারীদের জীবনযাত্রার ব্যয়ের বিষয়গুলোও জড়িত।
বিশেষ করে বাড়িভাড়া ভাতার কারণে উচ্চতর গ্রেডের কর্মচারী নিম্নতর গ্রেডের কর্মচারীর তুলনায় কম মোট বেতন পাওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হলে তা পুনর্বিবেচনার প্রয়োজন রয়েছে। একইভাবে শিক্ষা ও টিফিন ভাতার পরিমাণ নির্ধারণের ক্ষেত্রে বর্তমান বাজার পরিস্থিতি বিবেচনা করা জরুরি।
তাই ৯ম জাতীয় পে স্কেলের সংশ্লিষ্ট বিধান ও ভাতার হার পুনর্মূল্যায়ন করে প্রয়োজনীয় সংশোধন আনার দাবি জানিয়েছেন কর্মচারীরা।
তবে উল্লেখিত হিসাব ও পাঁচ দফা প্রস্তাব কর্মচারীদের পক্ষ থেকে উত্থাপিত দাবি; এগুলোকে সরকারি অনুমোদিত সিদ্ধান্ত বা কার্যকর সংশোধনী হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না। এ বিষয়ে চূড়ান্ত অবস্থান জানতে সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রজ্ঞাপন ও বিধিমালা অনুসরণ করতে হবে।
সব মিলিয়ে, সরকারি কর্মচারীদের প্রত্যাশা শুধু বেতন বৃদ্ধি নয়; বরং এমন একটি বেতন কাঠামো, যেখানে গ্রেডভিত্তিক বৈষম্য কমবে, ভাতার পরিমাণ বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে এবং চাকরির মেয়াদ অনুযায়ী প্রাপ্য সুবিধা নিশ্চিত হবে। এখন এসব প্রস্তাব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বিবেচনায় আসে কি না, সেটিই দেখার বিষয়।





আপনার মন্তব্য