দেশের অর্থনীতি ও সাধারণ মানুষের আমানতের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যাংকিং খাতে আমূল পরিবর্তনের দাবি জোরালো হচ্ছে। ব্যাংকার ও খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, ব্যাংকিং সেক্টর টিকে থাকে মানুষের বিশ্বাস আর পরিশ্রমের ওপর। কিন্তু ঋণখেলাপিদের আইনি মারপ্যাঁচ এবং দীর্ঘসূত্রিতার কারণে হাজারো আমানতকারীর স্বপ্ন ও ভবিষ্যৎ আজ ঝুঁকির মুখে। এই সংকট উত্তরণে রিটের অপব্যবহার রোধ এবং দ্রুততম সময়ে মামলা নিষ্পত্তির জন্য ‘বিশেষ ট্রাইব্যুনাল’ গঠনের জোর দাবি উঠেছে।
আমানতকারীর সুরক্ষা ও ঋণের দায়
একটি ব্যাংক কেবল একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান নয়; এটি দেশের লাখো মানুষের তিল তিল করে জমানো সঞ্চয়ের নিরাপদ আশ্রয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ব্যাংক যখন কাউকে ঋণ দেয়, সেটি প্রকৃতপক্ষে আমানতকারীর টাকা। কিন্তু দুঃখজনকভাবে অনেক বড় ঋণগ্রহীতা সেই বিশ্বাসের মর্যাদা দিচ্ছেন না। ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের কারণে পুরো আর্থিক ব্যবস্থা আজ চাপের মুখে। তাই ব্যাংককে বাঁচাতে এবং অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে এখনই কঠোর ও বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্তের সময় এসেছে।
আইনি জটিলতা ও দ্রুত নিষ্পত্তির প্রস্তাবনা
বর্তমানে হাজার হাজার কোটি টাকা আইনি মারপ্যাঁচে আটকে আছে। এই অচলাবস্থা নিরসনে নিম্নোক্ত ৫টি সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবনা উঠে এসেছে:
রিট আবেদনের অপব্যবহার রোধ: অনেক ক্ষেত্রে ঋণখেলাপিরা কেবল সময়ক্ষেপণের জন্য উচ্চ আদালতে রিট করেন। আইনি প্রক্রিয়ার এই লুপহোল বা অপব্যবহার বন্ধ করা জরুরি।
সময়াবদ্ধ বিচার প্রক্রিয়া: চেক ডিজঅনার মামলা সর্বোচ্চ ৬ মাস এবং অর্থঋণ আদালতের মামলা ১ বছরের মধ্যে নিষ্পত্তি করার জন্য আইন সংশোধন প্রয়োজন।
পরিবারভিত্তিক ঋণ নিষেধাজ্ঞা: একজন সদস্য খেলাপি হলে তার পরিবারের অন্য সদস্যদেরও নতুন ঋণ পাওয়ার সুযোগ বন্ধ করার দাবি জানানো হয়েছে, যাতে ঋণের টাকা পরিবারের ভেতরে সরিয়ে ফেলার প্রবণতা কমে।
নিলামের ক্ষমতা বৃদ্ধি: মামলা চলাকালীন সময়েই বিশেষ করে অর্থঋণ মামলায় ব্যাংককে বন্ধকী সম্পত্তি নিলাম করার ক্ষমতা দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে পাওনা আদায়ের গতি বাড়বে।
বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন: মামলার পাহাড় কমাতে এবং দক্ষ বিচারিক কার্যক্রম নিশ্চিত করতে ব্যাংকিং খাতের জন্য আলাদা দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল গঠন এখন সময়ের দাবি।
“ব্যাংক বাঁচলে অর্থনীতি বাঁচবে, আর অর্থনীতি বাঁচলে দেশ এগিয়ে যাবে। এখন সময় দুর্বলতা প্রদর্শনের নয়, বরং শক্ত ও সাহসী সিদ্ধান্তের।”
অর্থনীতিবিদদের অভিমত
অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, ব্যাংকিং খাতের স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে বিচারিক সংস্কারের কোনো বিকল্প নেই। যদি দ্রুততম সময়ে খেলাপি ঋণ আদায় করা না যায়, তবে তার প্রভাব পড়বে সাধারণ বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের ওপর। দ্রুত মামলা নিষ্পত্তি হলে একদিকে যেমন ব্যাংকের তারল্য সংকট কাটবে, অন্যদিকে খেলাপি হওয়ার প্রবণতাও কমে আসবে।
আমানতকারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং ব্যাংকিং সেক্টরকে একটি শক্তিশালী ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে সরকার ও সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে এখনই এই কঠোর পদক্ষেপগুলো বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিতে হবে।
