ভূমি আইন ২০২৬

সাব-রেজিস্ট্রার কি দলিল বাতিল করতে পারেন? জানুন আইনগত সঠিক পদ্ধতি

জমি কেনাবেচা বা হস্তান্তরের প্রধান ধাপ হলো দলিল রেজিস্ট্রেশন। কিন্তু কোনো কারণে সেই রেজিস্ট্রিকৃত দলিল বাতিলের প্রয়োজন হলে অনেকেই বিভ্রান্তিতে পড়েন। সাধারণ একটি ধারণা প্রচলিত আছে যে, সাব-রেজিস্ট্রার ‘রদ ও রহিত দলিল’ (Deed of Cancellation)-এর মাধ্যমে পূর্বের রেজিস্ট্রিকৃত দলিল বাতিল করতে পারেন। তবে আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিষয়টি মোটেও তেমন নয়। সাব-রেজিস্ট্রারের দলিল বাতিলের কোনো বিচারিক ক্ষমতা নেই।

মূল আইনি সীমাবদ্ধতা

বাংলাদেশের রেজিস্ট্রেশন আইন, ১৯০৮ অনুযায়ী, সাব-রেজিস্ট্রারের প্রধান কাজ হলো দলিল রেজিস্ট্রি করা। আইনত একবার কোনো দলিল যথাযথ প্রক্রিয়ায় রেজিস্ট্রি হয়ে গেলে, তা সরাসরি বাতিল করার এখতিয়ার সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের নেই। দলিল বাতিলের বিষয়টি সম্পূর্ণভাবে আদালতের এখতিয়ারাধীন।

‘রদ ও রহিত দলিল’ আসলে কী?

রদ ও রহিত দলিল মূলত একটি ঘোষণামূলক দলিল। এর মাধ্যমে দলিলের পক্ষগণ আগের কোনো চুক্তি বা দলিল কার্যকর না করার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। তবে এই দলিল দিয়ে সব ক্ষেত্রে আগের দলিল বাতিল হয় না।

১. যখন এটি কার্যকর হতে পারে:

  • উভয় পক্ষের সম্মতি: যদি দাতা ও গ্রহীতা (বিক্রেতা ও ক্রেতা) উভয়ই দলিলটি বাতিলের বিষয়ে একমত হন, তবে পারস্পরিক সম্মতিতে ‘রদ দলিল’ রেজিস্ট্রি করা যায়। এটি মূলত একটি নতুন সমঝোতা হিসেবে কাজ করে।

  • শর্তযুক্ত দলিল: দলিলের ভেতরেই যদি এমন কোনো শর্ত থাকে যে, নির্দিষ্ট শর্ত ভঙ্গ হলে দলিলটি বাতিল বলে গণ্য হবে, তবে সেই ক্ষেত্রে রদ দলিল কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

২. যখন এটি কার্যকর হয় না:

  • একতরফা বাতিল: দাতা যদি গ্রহীতার সম্মতি ছাড়া একতরফাভাবে দলিল বাতিল করতে চান, তবে সাব-রেজিস্ট্রার সেটি বৈধভাবে বাতিল করার ক্ষমতা রাখেন না।

  • জালিয়াতি বা প্রতারণা: যদি কোনো দলিল জাল বা প্রতারণার মাধ্যমে করা হয়, তবে সাব-রেজিস্ট্রার তদন্ত করে সেটি বাতিল করতে পারেন না। এর জন্য অবশ্যই বিচার বিভাগীয় প্রক্রিয়া প্রয়োজন।

সাব-রেজিস্ট্রারের প্রকৃত ভূমিকা

সাব-রেজিস্ট্রার কেবল ‘রদ ও রহিত দলিল’ রেজিস্ট্রি করার আবেদন গ্রহণ করতে পারেন এবং সেটি দলিলে লিপিবদ্ধ করতে পারেন। কিন্তু পূর্বের মূল দলিলটিকে ‘বাতিল’ ঘোষণা করার মতো কোনো বিচারিক ক্ষমতা (Judicial Power) তার নেই। তিনি কেবল একজন প্রশাসনিক কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

দলিল বাতিলের সঠিক আইনি পথ

যদি কোনো পক্ষ মনে করেন যে একটি রেজিস্ট্রিকৃত দলিল আইনত ত্রুটিপূর্ণ বা জালিয়াতির শিকার, তবে তাকে নির্দিষ্ট আইনি পথ অনুসরণ করতে হবে:

  • আদালতে মামলা: ভুক্তভোগী পক্ষকে দেওয়ানী আদালতে (Civil Court) দলিল বাতিলের মামলা করতে হবে।

  • সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইন: ১৮৭৭ সালের সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইনের (Specific Relief Act) ৩৯ ধারা অনুযায়ী দলিল বাতিলের প্রতিকার চাইতে হয়।

  • আদালতের রায়: আদালত যদি সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে নিশ্চিত হন যে দলিলটি জাল, প্রতারণামূলক বা বেআইনি, তবে আদালতই কেবল সেটি বাতিলের আদেশ দিতে পারেন। আদালতের সেই আদেশের কপি সংশ্লিষ্ট সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে জমা দিলে তবেই দলিলে ‘বাতিল’ সংক্রান্ত চূড়ান্ত এন্ট্রি পড়ে।

শেষ কথা

পরিশেষে বলা যায়, রদ ও রহিত দলিল কোনো স্বয়ংক্রিয় বাতিল প্রক্রিয়া নয়। এটি কেবল পক্ষগণের ইচ্ছার একটি প্রতিফলন মাত্র। জমির মালিকানা বা দলিল সংক্রান্ত যেকোনো বিরোধে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়ার কর্তৃপক্ষ কেবল আদালত। তাই দলিল বাতিল নিয়ে কোনো জটিলতা তৈরি হলে সরাসরি আদালতের শরণাপন্ন হওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *