ভূমি আইন ২০২৬

জমি কেনার আগে দখল নিশ্চিত না করলে ঝুঁকি: সচেতন হওয়ার পরামর্শ বিশেষজ্ঞদের

বাংলাদেশে জমি কেনা সাধারণ মানুষের কাছে সবচেয়ে নিরাপদ ও লাভজনক বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচিত হলেও, বর্তমানে কেবল দলিলে নাম থাকাই শেষ কথা নয়। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, জমির নিরঙ্কুশ মালিকানা নিশ্চিত করতে ‘দলিল’ যতটুকু জরুরি, তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো ‘জমির প্রকৃত দখল’। দখল না থাকলে দলিলে নাম থাকলেও যেকোনো সময় বড় ধরনের আইনি জটিলতা বা বিনিয়োগ হারানোর ঝুঁকিতে পড়তে পারেন ক্রেতারা।

দখলই কেন মালিকানার বড় শক্তি?

আইনজীবীদের মতে, বিশ্বজুড়ে প্রচলিত একটি আইনি নীতি হলো— “Possession is nine-tenths of the law”। অর্থাৎ, কোনো সম্পদের ওপর দখল থাকা মানেই তার মালিকানার অন্তত ৯০ শতাংশ শক্তি নিজের অনুকূলে রাখা। বাংলাদেশে জমি সংক্রান্ত বিরোধের একটি বড় অংশই তৈরি হয় যখন কোনো ক্রেতা জমি কিনে কেবল কাগজের মালিক হয়ে থাকেন কিন্তু জমিতে তার কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকে না।

তামাদি আইনের ফাঁদ: ‘অ্যাডভার্স পজিশন’

জমি কেনা সত্ত্বেও যদি অন্য কেউ সেই জমিতে দীর্ঘদিন বসবাস বা ভোগদখল করে, তবে মূল মালিক বিপদে পড়তে পারেন। বিশেষজ্ঞরা জানান, তামাদি আইন অনুযায়ী যদি কেউ টানা ১২ বছর কোনো জমিতে ‘প্রতিকূল দখলে’ (Adverse Possession) থাকে, তবে মূল মালিক তার অধিকার পুনরুদ্ধারের ক্ষমতা হারাতে পারেন। এ ধরনের পরিস্থিতিতে বৈধ দলিল থাকা সত্ত্বেও আইনি লড়াইয়ে জয়ী হওয়া বেশ দীর্ঘমেয়াদী ও কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ে।

জালিয়াতি রোধে দখল ও সীমানা নির্ধারণের গুরুত্ব

ভূমি অফিস ও রিয়েল এস্টেট বিশ্লেষকদের মতে, জমিতে দৃশ্যমান নিয়ন্ত্রণ থাকা অনেক ধরনের প্রতারণা ঠেকিয়ে দেয়। মালিকের নিয়ন্ত্রণে থাকা জমিতে:

  • সীমানা প্রাচীর নির্মাণ বা কাঁটাতারের বেড়া দেওয়া।

  • বৃক্ষরোপণ বা নিয়মিত চাষাবাদ করা।

  • ছোটখাটো ঘর নির্মাণ বা সাইনবোর্ড স্থাপন করা।

এসব কার্যক্রম প্রমাণ করে যে মালিক তার জমি নিয়ে সচেতন। এতে করে জালিয়াত চক্র একই জমি একাধিক ব্যক্তির কাছে বিক্রি (ডাবল রেজিস্ট্রেশন) বা জাল দলিল তৈরির সাহস পায় না।

নামজারি ও খতিয়ানে দখলের প্রভাব

ভূমি অফিস সূত্রে জানা গেছে, জমির মিউটেশন বা নামজারি প্রক্রিয়ায় সরেজমিনে দখল যাচাই একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। যদি কোনো জমিতে আবেদনকারীর দখল না থাকে, তবে খতিয়ান সংশোধন বা নামজারি আবেদনে জটিলতা তৈরি হতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে দখল না থাকায় নামজারি বাতিলও হয়ে যায়, যা ক্রেতাকে দীর্ঘমেয়াদী ভোগান্তিতে ফেলে।

ক্রেতাদের প্রতি বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ

নিরাপদ বিনিয়োগ নিশ্চিত করতে রিয়েল এস্টেট বিশ্লেষক ও আইনজীবীরা জমি কেনার আগে কিছু জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন: ১. কাগজপত্রের পাশাপাশি জমি পরিদর্শন: কেবল সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের কাগজের ওপর নির্ভর না করে সশরীরে জমিতে গিয়ে অবস্থান ও সীমানা যাচাই করতে হবে। ২. স্থানীয় অনুসন্ধান: জমির আশেপাশে বসবাসকারী মানুষদের কাছ থেকে প্রকৃত দখলদার কে বা কোনো বিরোধ আছে কি না, তা জেনে নেওয়া। ৩. সীমানা চিহ্নিতকরণ: কেনার পরপরই দ্রুত সীমানা প্রাচীর বা স্থায়ী কোনো চিহ্ন দিয়ে নিজের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা। ৪. প্রশাসনিক সহায়তা: প্রয়োজনে স্থানীয় ভূমি অফিস বা প্রশাসনের সহায়তা নিয়ে জমির সঠিক নকশা ও দখল নিশ্চিত করা।

পরিশেষে, দলিল হচ্ছে মালিকানার আইনি ভিত্তি, কিন্তু দখল সেই মালিকানার বাস্তব রূপ। তাই জমি কেনার বিনিয়োগটি যেন বিফলে না যায়, সেজন্য কাগুজে প্রমাণের চেয়ে বাস্তবের দখলদারিত্ব নিশ্চিত করাই এখন সময়ের দাবি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *