স্থাবর সম্পত্তি বা জমি কেনা মানুষের সারা জীবনের স্বপ্ন এবং বিনিয়োগের একটি অন্যতম বড় ক্ষেত্র। কিন্তু সঠিক তথ্য যাচাই না করে জমি কিনে অনেককেই আজীবন আইনি জটিলতা ও আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়। সম্প্রতি ভূমি বিশেষজ্ঞ ও আইনজীবীরা জমি ক্রয়ের ক্ষেত্রে আট ধরনের জমি এড়িয়ে চলার পরামর্শ দিয়েছেন, যা না মানলে ক্রেতা বড় ধরনের আইনি ও মালিকানা সংকটে পড়তে পারেন।
ভূমি ক্রয়-বিক্রয়ের ক্ষেত্রে যে ৮টি বিষয় অবশ্যই গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করতে হবে, তা নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
১. খাস জমি: খাস জমি মূলত সরকারের মালিকানাধীন সম্পত্তি। অনেক ক্ষেত্রে অসাধু চক্র ভুয়া দলিল বানিয়ে খাস জমি সাধারণ মানুষের কাছে বিক্রির চেষ্টা করে। খাস জমি ক্রয় করলে সরকার যেকোনো সময় তা বাজেয়াপ্ত করতে পারে এবং ক্রেতা তার অর্থ ও জমি দুটোই হারাবেন।
২. অন্যত্র বায়না রেজিস্ট্রিকৃত জমি: কোনো জমি যদি আগে থেকেই অন্য কারও কাছে বায়না (Advanced Booking) করা থাকে এবং সেই বায়নাটি যদি রেজিস্ট্রিকৃত হয়, তবে ওই জমি দ্বিতীয় কোনো ব্যক্তির কাছে বিক্রি করা বেআইনি। এই ধরনের জমি কিনলে আইনি জটিলতা নিশ্চিত।
৩. অধিগ্রহণকৃত জমি: জনস্বার্থে সরকার অনেক সময় রাস্তাঘাট বা প্রকল্পের জন্য জমি অধিগ্রহণ (Acquisition) করে থাকে। সরকার কর্তৃক নোটিশ জারি হওয়া বা অধিগ্রহণ প্রক্রিয়াধীন থাকা জমি কেনা চরম ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ সরকার ওই জমির দখল নিলে আপনার বিনিয়োগ বৃথা যাবে।
৪. অর্পিত সম্পত্তি (ক ও খ তালিকা): অর্পিত সম্পত্তি নিয়ে বিশেষ সতর্কতা প্রয়োজন। বিশেষ করে ‘ক’ তালিকাভুক্ত অর্পিত সম্পত্তি কোনোভাবেই ব্যক্তিগতভাবে কেনাবেচা করা যায় না। এগুলো সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন। ‘খ’ তালিকাভুক্ত জমির ক্ষেত্রেও আইনি জটিলতা মুক্ত কি না তা যাচাই করা জরুরি।
৫. বন্ধককৃত জমি: অনেক সময় মালিক ব্যাংক বা অন্য কোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ নেওয়ার বিপরীতে জমি বন্ধক (Mortgage) রাখেন। ব্যাংকের দায়বদ্ধতা বা দায়মুক্তি সনদ (NOC) ছাড়া বন্ধক রাখা জমি কেনা মানেই ঋণের দায়ভার নিজের কাঁধে নেওয়া।
৬. আদালতে মামলা চলমান জমি: যে জমির মালিকানা নিয়ে আদালতে মামলা চলছে, সেই জমি কেনা থেকে বিরত থাকা উচিত। আদালতের রায় কার পক্ষে যাবে তা অনিশ্চিত, তাই ‘লিটিগেশন’ থাকা জমি কিনলে দীর্ঘমেয়াদী ভোগান্তিতে পড়তে হতে পারে।
৭. দখলবিহীন জমি: জমির দলিল সঠিক থাকলেও যদি বিক্রেতার দখলে জমি না থাকে, তবে সেই জমি কেনা বুদ্ধিমানের কাজ নয়। অন্যের দখলে থাকা জমি উদ্ধার করতে বছরের পর বছর মামলা লড়তে হতে পারে। মনে রাখবেন, ‘দখলই মালিকানার একটি বড় প্রমাণ’।
৮. বিরোধপূর্ণ জমি: পারিবারিক বা সীমানা সংক্রান্ত বিরোধ রয়েছে এমন জমি এড়িয়ে চলাই ভালো। বিশেষ করে অংশীদারদের মধ্যে বাটোয়ারা (Partition) সম্পন্ন হয়নি এমন জমি কিনলে ভবিষ্যতে উত্তরাধিকারীদের দাবির মুখে পড়তে পারেন।
বিশেষজ্ঞের পরামর্শ: জমি কেনার আগে সংশ্লিষ্ট ভূমি অফিস থেকে ‘খতিয়ান’ বা ‘পর্চা’ যাচাই করা, এসএ (SA), আরএস (RS) ও বিএস (BS) রেকর্ড চেক করা এবং ভূমি রেজিস্ট্রি অফিস থেকে জমিটি দায়বদ্ধ কি না (Non-Encumbrance Certificate) তা নিশ্চিত হওয়া একান্ত প্রয়োজন। মনে রাখবেন, আপনার একটু সচেতনতা রক্ষা করতে পারে আপনার সারাজীবনের সঞ্চয়।
