জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) নতুন ‘উৎস কর বিধিমালা, ২০২৬’ জারি করেছে। গত ৮ জুন জারিকৃত প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, নতুন এই বিধিমালা আগামী ১ জুলাই ২০২৬ থেকে কার্যকর হবে। আয়কর আইন, ২০২৩-এর ধারা ৩৪৩ অনুযায়ী প্রণীত এ বিধিমালার মাধ্যমে বিভিন্ন পণ্য সরবরাহ, সেবা প্রদান, অ-নিবাসীদের অর্থ পরিশোধ এবং সম্পত্তি হস্তান্তরের ক্ষেত্রে উৎসে কর কর্তনের হার ও পদ্ধতি পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে।
পণ্য সরবরাহে উৎস করের নতুন হার
বিধিমালার ৩ নম্বর বিধিতে বিভিন্ন ধরনের পণ্য সরবরাহের ক্ষেত্রে উৎসে কর কর্তনের হার নির্ধারণ করা হয়েছে।
নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য যেমন ধান, চাল, গম, আলু, মাছ, মাংস, ডিম, শাকসবজি, ভোজ্যতেল, চিনি, দুধ, পোল্ট্রি ফিড, বীজ, পাট, তুলা, কাঁচা চামড়া, জৈব সারসহ বহু কৃষি ও খাদ্যপণ্য সরবরাহে ০.৫ শতাংশ উৎস কর কাটা হবে। এমএস স্ক্র্যাপ সরবরাহেও একই হার প্রযোজ্য হবে।
অন্যদিকে ফল সরবরাহে ২ শতাংশ, সুতা সরবরাহে ১ শতাংশ, গার্মেন্টস শিল্পের সাব-কন্ট্রাক্টে ১ শতাংশ, সিমেন্ট, লোহা ও ফেরো অ্যালয় পণ্য সরবরাহে ২ শতাংশ এবং উৎপাদন শিল্পে ব্যবহৃত কাঁচামাল ও প্যাকেজিং সামগ্রী সরবরাহে ৩ শতাংশ উৎস কর নির্ধারণ করা হয়েছে।
ম্যানুফ্যাকচারিং, নির্মাণ, প্রকৌশল বা সমজাতীয় কাজের ক্ষেত্রে ৫ শতাংশ এবং তালিকাভুক্ত নয় এমন অন্যান্য পণ্য সরবরাহেও ৫ শতাংশ উৎস কর কাটা হবে। তবে পেট্রোল পাম্প ও সিএনজি স্টেশন কর্তৃক তেল বা গ্যাস সরবরাহের ক্ষেত্রে উৎস কর প্রযোজ্য হবে না।
সেবা খাতে উৎস করের বিস্তৃত কাঠামো
নতুন বিধিমালায় বিভিন্ন সেবার ওপর উৎস করের হারও নির্ধারণ করা হয়েছে।
পরামর্শক বা কনসালটেন্সি ফি এবং পেশাদার সেবার ক্ষেত্রে স্বাভাবিক (ব্যক্তি) করদাতার জন্য ১৫ শতাংশ এবং অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের জন্য ৭.৫ শতাংশ উৎস কর ধার্য করা হয়েছে। কারিগরি সেবা বা টেকনিক্যাল সার্ভিস ফিতে ব্যক্তি পর্যায়ে ১৫ শতাংশ এবং প্রতিষ্ঠান পর্যায়ে ১০ শতাংশ কর কাটা হবে।
ক্যাটারিং, জনসংযোগ, ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট, প্রশিক্ষণ, কুরিয়ার, প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়া এজেন্সি সেবাসহ বিভিন্ন সেবার মোট বিলের ওপর ৪ শতাংশ উৎস কর আরোপ করা হয়েছে। এছাড়া ইন্টারনেট সেবার ক্ষেত্রে ৫ শতাংশ, পরিবহন ও গাড়ি ভাড়া সেবায় ২ শতাংশ, মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস এজেন্ট কমিশনে ১০ শতাংশ এবং মিটিং ফি বা সম্মানী বিলের ওপর ২০ শতাংশ উৎস কর কাটা হবে।
অ-নিবাসীদের অর্থ পরিশোধে কঠোর কর ব্যবস্থা
বিদেশি ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে কর কর্তনের হার আরও বেশি রাখা হয়েছে। পরামর্শক সেবা, পেশাদার সেবা এবং কারিগরি সেবার ক্ষেত্রে ব্যক্তি পর্যায়ে ২০ শতাংশ এবং অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে ১০ শতাংশ কর কাটা হবে। রয়্যালটি, লাইসেন্স ফি, আইনগত সেবা, স্যাটেলাইট ও এয়ারটাইম ব্যবহারের বিলের ওপর ২০ শতাংশ পর্যন্ত উৎস কর নির্ধারণ করা হয়েছে।
এছাড়া অ-নিবাসী শিল্পী, গায়ক বা খেলোয়াড়দের পারিশ্রমিক এবং বেতন বা সম্মানী বিলের ওপর ৩০ শতাংশ কর কর্তনের বিধান রাখা হয়েছে।
সম্পত্তি হস্তান্তরে কর সংগ্রহ বাধ্যতামূলক
বিধিমালায় সম্পত্তি নিবন্ধনের সময় উৎসে কর সংগ্রহের বিধানও বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। ঢাকা, চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুরসহ বিভিন্ন এলাকার মৌজাভিত্তিক শ্রেণি অনুযায়ী করের হার নির্ধারণ করা হয়েছে।
বিশেষ করে ঢাকা মহানগরের গুলশান, বনানী, মতিঝিল ও তেজগাঁও এলাকার জমি হস্তান্তরের ক্ষেত্রে দলিলে উল্লেখিত মূল্যের ৫ শতাংশ অথবা নির্ধারিত প্রতি শতকের সর্বনিম্ন মূল্য—যেটি বেশি হবে—সেই অনুযায়ী কর পরিশোধ করতে হবে। কর পরিশোধের প্রমাণ ছাড়া সংশ্লিষ্ট রেজিস্ট্রার দলিল নিবন্ধন করতে পারবেন না।
কর প্রশাসনে স্বচ্ছতা ও রাজস্ব বৃদ্ধির লক্ষ্য
কর বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন উৎস কর বিধিমালা ২০২৬ কার্যকর হলে কর কর্তনের হার ও প্রক্রিয়া আরও স্পষ্ট হবে। একই সঙ্গে বিভিন্ন খাতে কর ফাঁকি রোধ, কর আদায় বৃদ্ধি এবং আয়কর আইন, ২০২৩-এর কার্যকর বাস্তবায়নে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
এনবিআরের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, আগামী ১ জুলাই ২০২৬ থেকে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, ব্যবসায়ী, সেবাদাতা এবং করদাতাদের নতুন বিধিমালা অনুসরণ করে উৎসে কর কর্তন ও জমা দিতে হবে।
