বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় মূল্যায়ন পদ্ধতিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো প্রচলিত নম্বর, লেটার গ্রেড ও GPA-নির্ভর ফলাফলের পরিবর্তে শিক্ষার্থীর পারদর্শিতা ও শিখন-অর্জনের স্তর তুলে ধরা। নতুন শিক্ষাক্রমের মূল্যায়ন কাঠামোতে শিক্ষার্থীদের সাতটি স্তরে মূল্যায়নের কথা বলা হয়েছে—অনন্য, অর্জনমুখী, অগ্রগামী, সক্রিয়, অনুসন্ধানী, বিকাশমান ও প্রারম্ভিক।
তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ছবিতে এই সাতটি স্তরকে আবার A+, A, A-, B, C, D ও F-এর সঙ্গে নির্দিষ্ট নম্বর ও GPA দিয়ে দেখানো হচ্ছে। ছবিতে ৮০–১০০ নম্বরকে A+, ৭০–৭৯ নম্বরকে A, ৬০–৬৯ নম্বরকে A-, ৫০–৫৯ নম্বরকে B, ৪০–৪৯ নম্বরকে C, ৩৩–৩৯ নম্বরকে D এবং ০–৩২ নম্বরকে F দেখানো হয়েছে। কিন্তু এই ছককে নতুন শিক্ষাক্রমের চূড়ান্ত সরকারি গ্রেডিং পদ্ধতি হিসেবে গ্রহণ করার যথেষ্ট ভিত্তি নেই।
সাতটি স্তরে কীভাবে মূল্যায়ন হবে
নতুন কাঠামোর মূল ধারণা হলো—একজন শিক্ষার্থী কোনো বিষয়ে শুধু কত নম্বর পেয়েছে, সেটিই মুখ্য নয়; বরং নির্ধারিত পারদর্শিতার ক্ষেত্র ও নির্দেশকগুলোতে সে কোন পর্যায়ে পৌঁছেছে, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।
সাতটি স্তরকে সহজভাবে এভাবে বোঝানো যায়—
অনন্য: শিক্ষার্থীর পারদর্শিতা সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।
অর্জনমুখী: নির্ধারিত শিখনফল বা পারদর্শিতা অর্জনের পর্যায়ে রয়েছে।
অগ্রগামী: শিক্ষার্থী প্রত্যাশিত দক্ষতার দিকে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করেছে।
সক্রিয়: শিক্ষার্থী শেখার প্রক্রিয়ায় সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করছে।
অনুসন্ধানী: বিষয় বুঝতে অনুসন্ধান, প্রশ্ন ও বিশ্লেষণের পর্যায়ে রয়েছে।
বিকাশমান: শিক্ষার্থীর দক্ষতা বিকাশের পর্যায়ে রয়েছে।
প্রারম্ভিক: পারদর্শিতা অর্জনের প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে।
অর্থাৎ, এখানে একটি শিশুকে শুধু ‘ভালো’, ‘খারাপ’ বা ‘কত নম্বর পেল’—এই একক মানদণ্ডে বিচার করার পরিবর্তে তার শেখার অবস্থান ও দক্ষতার বিকাশ বোঝার চেষ্টা করা হবে। এনসিটিবির মূল্যায়ন কাঠামো সম্পর্কিত তথ্যেও এই সাতটি স্তরের কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে।
তাহলে A+, A, A- কথাগুলো কোথা থেকে এলো?
এখানেই তৈরি হয়েছে সবচেয়ে বেশি বিভ্রান্তি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত ছবিতে সাতটি স্তরের পাশে প্রচলিত লেটার গ্রেড বসিয়ে দেওয়া হয়েছে। এমনকি প্রতিটি গ্রেডের সঙ্গে নির্দিষ্ট নম্বরের সীমা এবং GPA-ও উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে অনেক অভিভাবক ও শিক্ষার্থী মনে করছেন, নতুন কারিকুলামেও আগের মতো ৮০ নম্বর পেলেই A+, ৭০ নম্বর পেলেই A এবং নির্দিষ্ট নম্বরের ভিত্তিতে GPA হিসাব হবে।
কিন্তু এনসিটিবির মূল্যায়ন কাঠামো নিয়ে প্রকাশিত ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, নতুন শিক্ষাক্রমে নম্বরের পার্থক্যের ভিত্তিতে আগের মতো গ্রেড পয়েন্ট দেওয়ার ব্যবস্থা নেই। শিক্ষার্থীর পারদর্শিতা বিভিন্ন নির্দেশকের মাধ্যমে নির্ধারণ করা হবে।
এমনকি ২০২৪ সালে এনসিটিবির মূল্যায়ন কাঠামো নিয়ে প্রকাশিত একটি ফ্যাক্টচেক প্রতিবেদনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ঠিক এই ধরনের গ্রেডিং ছবিকে ভিত্তিহীন বলা হয়েছিল। ওই প্রতিবেদনে এনসিটিবির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বক্তব্য উদ্ধৃত করে বলা হয়, নতুন শিক্ষাক্রমে নম্বরভিত্তিক মূল্যায়নের সুযোগ নেই।
২০২৬ সাল নিয়ে কেন আলোচনা বেশি?
নতুন শিক্ষাক্রম ধাপে ধাপে বিভিন্ন শ্রেণিতে চালুর পরিকল্পনা করা হয়েছিল। ২০২৬ সালে একাদশ শ্রেণিতে এবং ২০২৭ সালে দ্বাদশ শ্রেণিতে নতুন শিক্ষাক্রম সম্প্রসারণের পরিকল্পনার কথা আগের মূল্যায়ন কাঠামো সংক্রান্ত তথ্যে উল্লেখ ছিল।
তবে ২০২৬ সালের শিক্ষাব্যবস্থায় কারিকুলাম ও মূল্যায়ন নিয়ে পরিবর্তন, সংশোধন ও পুনর্বিন্যাসের আলোচনা চলমান রয়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ও ২০২৬ সালে পাঠ্যক্রম ও শিক্ষাব্যবস্থাকে আরও যুগোপযোগী করার উদ্যোগের কথা জানিয়েছে।
এ কারণে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পুরোনো খসড়া, প্রস্তাবিত কাঠামো বা বিভিন্ন ব্যাখ্যামূলক ছবি নতুন করে ‘২০২৬ সালের চূড়ান্ত নিয়ম’ হিসেবে ছড়িয়ে পড়লে বিভ্রান্তি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
নতুন মূল্যায়নের সবচেয়ে বড় পরিবর্তন কোথায়?
প্রচলিত পদ্ধতিতে একজন শিক্ষার্থীর ফলাফল বোঝার জন্য সাধারণত নম্বর, লেটার গ্রেড ও GPA দেখা হতো। নতুন কাঠামোর দর্শন ভিন্ন।
এখানে প্রশ্ন হবে—শিক্ষার্থী কী শিখেছে, কতটা শিখেছে, কীভাবে প্রয়োগ করতে পারছে এবং নির্ধারিত দক্ষতার কোন পর্যায়ে রয়েছে।
অর্থাৎ ৯৫ নম্বর পাওয়া শিক্ষার্থী এবং ৮৫ নম্বর পাওয়া শিক্ষার্থীর মধ্যে শুধু ১০ নম্বরের পার্থক্য দেখানোর বদলে তাদের পারদর্শিতার অবস্থান তুলে ধরাই হবে মূল্যায়নের অন্যতম উদ্দেশ্য।
এ কারণে নতুন পদ্ধতিতে রিপোর্ট কার্ডের ভূমিকা আরও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। অভিভাবক শুধু একটি সংখ্যা দেখে সন্তানের ফলাফল বোঝার পরিবর্তে কোন দক্ষতায় সে এগিয়ে, কোন ক্ষেত্রে আরও উন্নতির প্রয়োজন এবং কোন পর্যায়ে রয়েছে—তা বোঝার সুযোগ পাবেন।
লিখিত পরীক্ষা কি পুরোপুরি বাদ যাচ্ছে?
নতুন শিক্ষাক্রমের মূল্যায়ন কাঠামো নিয়ে যে তথ্য প্রকাশিত হয়েছিল, সেখানে লিখিত মূল্যায়ন ও কার্যক্রমভিত্তিক মূল্যায়নের সমন্বয়ের কথা বলা হয়েছিল। একটি কাঠামোতে লিখিত অংশের ওয়েটেজ ৬৫ শতাংশ এবং কার্যক্রমভিত্তিক অংশের ওয়েটেজ ৩৫ শতাংশ নির্ধারণের কথা উল্লেখ করা হয়েছিল। কার্যক্রমের মধ্যে অ্যাসাইনমেন্ট, উপস্থাপন, অনুসন্ধান, প্রদর্শন, সমস্যা সমাধান ও পরিকল্পনা তৈরির মতো কাজ অন্তর্ভুক্ত ছিল।
অর্থাৎ নতুন পদ্ধতির মূল লক্ষ্য শুধু পরীক্ষার খাতায় শিক্ষার্থী কত লিখল তা দেখা নয়; বরং বাস্তব পরিস্থিতিতে তার জ্ঞান, দক্ষতা, চিন্তাশক্তি ও প্রয়োগক্ষমতাও বিবেচনায় আনা।
শিক্ষার্থীদের জন্য এর অর্থ কী?
নতুন মূল্যায়ন ব্যবস্থা কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে শিক্ষার্থীদের জন্য সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হবে শুধু পরীক্ষার আগে মুখস্থ করে ভালো নম্বর পাওয়ার প্রবণতা কমিয়ে শেখার প্রকৃত দক্ষতার দিকে গুরুত্ব দেওয়া।
একজন শিক্ষার্থী কোনো বিষয় মুখস্থ করতে পারলেও যদি তা বাস্তবে প্রয়োগ করতে না পারে, তাহলে তার পারদর্শিতা সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছাবে না। বিপরীতে কোনো শিক্ষার্থী যদি প্রশ্ন করতে পারে, অনুসন্ধান করতে পারে, যুক্তি দিতে পারে এবং শেখা বিষয় বাস্তবে প্রয়োগ করতে পারে, তাহলে তার প্রকৃত সক্ষমতা মূল্যায়নে দৃশ্যমান হওয়ার সুযোগ বাড়বে।
অভিভাবকদের জন্যও পরিবর্তন গুরুত্বপূর্ণ
পুরোনো ব্যবস্থায় ‘A+ পেয়েছে’ বললেই অনেকটা ধারণা করা যেত শিক্ষার্থী ভালো করেছে। কিন্তু সাত স্তরের মূল্যায়নে অভিভাবকদের নতুন ভাষা ও কাঠামোর সঙ্গে পরিচিত হতে হবে।
‘অনন্য’ মানে সর্বোচ্চ পারদর্শিতার স্তর, আর ‘প্রারম্ভিক’ মানে সর্বনিম্ন পর্যায়—এভাবে প্রতিটি স্তর শিক্ষার্থীর শেখার অবস্থান সম্পর্কে একটি বার্তা দেবে। এনসিটিবির কাঠামোতেও এই সাতটি স্তরের মধ্যে ‘অনন্য’কে সর্বোচ্চ এবং ‘প্রারম্ভিক’কে সর্বনিম্ন স্তর হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়: ভাইরাল ছবির সঙ্গে সরকারি কাঠামো এক নয়
এখানে তাই দুটি বিষয় আলাদা করে দেখা জরুরি।
প্রথমত, অনন্য, অর্জনমুখী, অগ্রগামী, সক্রিয়, অনুসন্ধানী, বিকাশমান ও প্রারম্ভিক—এই সাতটি পারদর্শিতা-স্তরের ধারণাটি নতুন শিক্ষাক্রমের মূল্যায়ন কাঠামোর সঙ্গে সম্পর্কিত।
দ্বিতীয়ত, ছবিতে দেখানো A+, A, A-, B, C, D, F-এর সঙ্গে ৮০–১০০, ৭০–৭৯, ৬০–৬৯ ইত্যাদি নম্বর এবং GPA-এর সরাসরি সম্পর্ককে চূড়ান্ত সরকারি নিয়ম হিসেবে ধরে নেওয়া ঠিক নয়। এ ধরনের ভাইরাল ছক নিয়ে পূর্বে এনসিটিবির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বক্তব্যের ভিত্তিতে ফ্যাক্টচেকও হয়েছে।
শেষ কথা
২০২৬ সালের নতুন কারিকুলাম নিয়ে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে ফলাফল কীভাবে প্রকাশ হবে—এ প্রশ্নটি সবচেয়ে বেশি আলোচিত।
তবে নতুন ব্যবস্থার মূল দর্শনকে যদি এক কথায় বলতে হয়, সেটি হলো—‘শুধু কত নম্বর পেয়েছে’ নয়, বরং ‘কী শিখেছে এবং কতটা পারদর্শী হয়েছে’—সেটিই হবে মূল্যায়নের কেন্দ্রবিন্দু।
তাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কোনো ছবি দেখে A+ বা GPA নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট শিক্ষা কর্তৃপক্ষের সর্বশেষ প্রজ্ঞাপন, নির্দেশনা বা অনুমোদিত মূল্যায়ন কাঠামো যাচাই করা জরুরি। কারণ নতুন কারিকুলামের সাতটি পারদর্শিতা-স্তর এবং প্রচলিত নম্বর-ভিত্তিক A+ থেকে F গ্রেডিং—দুটি বিষয়কে এক করে দেখলে শিক্ষার্থী ও অভিভাবক উভয়ের মধ্যেই ভুল ধারণা তৈরি হতে পারে।

