দেশে মামলাজট কমাতে আদালতে মামলা দায়েরের আগে বিরোধ মীমাংসার উদ্যোগ নেওয়ার ব্যবস্থা আরও বিস্তৃত করেছে সরকার। আইনগত সহায়তা প্রদান (সংশোধন) আইন, ২০২৬-এর ধারা ২১খ অনুযায়ী নির্ধারিত কিছু বিরোধের ক্ষেত্রে আদালতে সরাসরি মামলা করার আগে সংশ্লিষ্ট জেলা লিগ্যাল এইড অফিসে মধ্যস্থতার উদ্যোগ নেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। ইতোমধ্যে পাইলট প্রকল্পের ২০ জেলার সঙ্গে নতুন করে আরও ১০ জেলা যুক্ত হওয়ায় মোট ৩০ জেলায় এ কার্যক্রম চালু হয়েছে।
নতুন করে যুক্ত হওয়া ১০ জেলা হলো—বগুড়া, ঠাকুরগাঁও, পটুয়াখালী, ভোলা, নাটোর, যশোর, শরীয়তপুর, কক্সবাজার, পঞ্চগড় ও টাঙ্গাইল। এর আগে ২০ জেলায় মামলাপূর্ব বাধ্যতামূলক মধ্যস্থতা কার্যক্রম চালু ছিল। ফলে বর্তমানে মোট ৩০ জেলার বাসিন্দাদের নির্ধারিত বিরোধে আদালতে যাওয়ার আগে লিগ্যাল এইড অফিসের মধ্যস্থতা প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হবে।
যেসব বিরোধে আগে মধ্যস্থতা করতে হবে
বর্তমান ২০২৬ সালের ব্যবস্থায় সাত ধরনের বিরোধকে মামলাপূর্ব বাধ্যতামূলক মধ্যস্থতার আওতায় রাখা হয়েছে। এগুলো হলো—
১. পারিবারিক বিরোধ: পারিবারিক আদালত আইন, ২০২৩-এর ধারা ৫-এ উল্লিখিত বিষয়গুলো।
২. বাড়িভাড়া সংক্রান্ত বিরোধ: বাড়ি ভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইন, ১৯৯১-এর আওতাভুক্ত বিরোধ।
৩. বণ্টন সংক্রান্ত বিরোধ: সহকারী জজ আদালতের এখতিয়ারভুক্ত সম্পত্তি বণ্টন সংক্রান্ত বিরোধ।
৪. অগ্রক্রয় সংক্রান্ত বিরোধ: State Acquisition and Tenancy Act, 1950-এর ৯৬ ধারায় উল্লিখিত অগ্রক্রয় সংক্রান্ত বিরোধ।
৫. অ-কৃষি জমির অগ্রক্রয়: Non-Agricultural Tenancy Act, 1949-এর ২৪ ধারায় উল্লিখিত অগ্রক্রয় সংক্রান্ত বিরোধ।
৬. পিতা-মাতার ভরণপোষণ: পিতামাতার ভরণপোষণ আইন, ২০১৩-এর ৮ ধারার আওতাভুক্ত বিরোধ।
৭. যৌতুক সংক্রান্ত বিরোধ: যৌতুক নিরোধ আইন, ২০১৮-এর ৩ ও ৪ ধারায় বর্ণিত যৌতুক-সংক্রান্ত অভিযোগ।
৩০ জেলার তালিকা
মামলাপূর্ব বাধ্যতামূলক মধ্যস্থতা কার্যক্রমের আওতাভুক্ত ৩০ জেলা হলো—লক্ষ্মীপুর, ময়মনসিংহ, কুমিল্লা, নোয়াখালী, মৌলভীবাজার, সুনামগঞ্জ, রংপুর, ফরিদপুর, কুষ্টিয়া, দিনাজপুর, সাতক্ষীরা, রাঙামাটি, সিলেট, মুন্সীগঞ্জ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, জয়পুরহাট, কুড়িগ্রাম, নরসিংদী, ঝিনাইদহ, মাগুরা, বগুড়া, ঠাকুরগাঁও, পটুয়াখালী, ভোলা, নাটোর, যশোর, শরীয়তপুর, কক্সবাজার, পঞ্চগড় ও টাঙ্গাইল।
কীভাবে কার্যক্রমটি হবে
কোনো ব্যক্তি নির্ধারিত সাত ধরনের বিরোধ নিয়ে আদালতে মামলা করতে চাইলে প্রথমে সংশ্লিষ্ট জেলা লিগ্যাল এইড অফিসে আবেদন করতে হবে। সেখানে পক্ষগুলোর মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তির চেষ্টা করা হবে। মধ্যস্থতার মাধ্যমে সমঝোতা হলে আদালতে দীর্ঘ মামলা পরিচালনার প্রয়োজন নাও হতে পারে।
অন্যদিকে মধ্যস্থতা ব্যর্থ হলে সংশ্লিষ্ট পক্ষ আইন অনুযায়ী উপযুক্ত আদালতে মামলা করার সুযোগ পাবেন। অর্থাৎ নতুন ব্যবস্থা আদালতে যাওয়ার অধিকার বন্ধ করছে না; বরং নির্দিষ্ট বিরোধে আদালতে মামলা দায়েরের আগে সমঝোতার একটি বাধ্যতামূলক ধাপ যুক্ত করেছে।
কেন এই ব্যবস্থা
বাংলাদেশের আদালতগুলোতে বিপুলসংখ্যক মামলা বিচারাধীন থাকায় মামলাজট দীর্ঘদিনের বড় সমস্যা। ২১ জুলাই ২০২৬-এ আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান জানান, দেশে প্রায় ৪৫ লাখ মামলা বিচারাধীন রয়েছে। তাঁর মতে, আদালতে মামলা দায়েরের আগেই আলোচনার মাধ্যমে নিষ্পত্তির সুযোগ তৈরি করা গেলে বিচারপ্রার্থীর সময়, অর্থ ও ভোগান্তি কমবে এবং আদালতের ওপর চাপও কমবে।
পাইলট প্রকল্পের ২০ জেলায় কার্যক্রমের প্রভাবও ইতিবাচক বলে জানিয়েছে আইন মন্ত্রণালয়। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি-মে সময়ের সঙ্গে ২০২৬ সালের একই সময় তুলনা করে দেখা যায়, পারিবারিক আদালত আইনের মামলার সংখ্যা ৩ হাজার ৫৫৯ থেকে কমে ১ হাজার ৭৪৪ হয়েছে। সহকারী জজ আদালতের এখতিয়ারভুক্ত বণ্টন সংক্রান্ত মামলা ২ হাজার ১ থেকে কমে ৬৬১টিতে নেমেছে। যৌতুক নিরোধ আইনের মামলাও ৫ হাজার ৬০৫ থেকে কমে ১ হাজার ৮১০টিতে নেমেছে। সব মিলিয়ে সংশ্লিষ্ট মামলার প্রবাহ গড়ে ৬২ দশমিক ০২ শতাংশ কমেছে বলে আইনমন্ত্রী জানিয়েছেন।
সমঝোতা হলে কী হবে
লিগ্যাল এইডের মধ্যস্থতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—সমঝোতার মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তি হলে তা শুধু একটি অনানুষ্ঠানিক আপস হিসেবে থাকবে না। আইনগত কাঠামোর অধীনে চিফ লিগ্যাল এইড অফিসার কর্তৃক প্রত্যায়িত মধ্যস্থতা চুক্তি চূড়ান্ত ও বলবৎযোগ্য হওয়ার বিধান রয়েছে এবং তা আদালতের ডিক্রি বা চূড়ান্ত আদেশের মর্যাদা পেতে পারে।
এতে জমি, পারিবারিক সম্পর্ক, ভরণপোষণ, বাড়িভাড়া বা যৌতুক-সংক্রান্ত নির্দিষ্ট বিরোধ আদালতে দীর্ঘদিন চলার পরিবর্তে তুলনামূলক কম সময়ে নিষ্পত্তির সুযোগ তৈরি হবে। বিশেষ করে আর্থিকভাবে অসচ্ছল ও প্রান্তিক মানুষের জন্য সরকারি অর্থায়নে লিগ্যাল এইডের মাধ্যমে এ সেবা পাওয়ার সুযোগ গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়
প্রচারিত কিছু পোস্ট ও পুরোনো তথ্যচিত্রে আটটি বিষয় এবং Negotiable Instruments Act, 1881-এর ১৩৮ ধারার চেক ডিজঅনার সংক্রান্ত অভিযোগকে এই বাধ্যতামূলক মধ্যস্থতার তালিকায় দেখানো হচ্ছে। তবে ২০২৬ সালের ২১ জুলাই নতুন ১০ জেলায় কার্যক্রম উদ্বোধনের সময় আইনমন্ত্রী ও একাধিক নির্ভরযোগ্য প্রতিবেদনে সাতটি আইনের কথা বলা হয়েছে; সেখানে চেক ডিজঅনারের বিষয়টি তালিকায় নেই। তাই বর্তমানে কার্যকর নিয়ম সম্পর্কে বিভ্রান্তি এড়াতে সর্বশেষ আইন ও সরকারি প্রজ্ঞাপন অনুসরণ করাই নিরাপদ।
লক্ষ্মীপুরে কোথায় যোগাযোগ করবেন
লক্ষ্মীপুরের জেলা লিগ্যাল এইড অফিস জেলা জজ আদালত/চীফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত ভবনে কার্যক্রম পরিচালনা করছে। লক্ষ্মীপুর জেলা জুডিশিয়ারির তথ্য অনুযায়ী, জেলা লিগ্যাল এইড অফিস চীফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত ভবনের ৫ম তলায় অবস্থিত। জাতীয় লিগ্যাল এইড হেল্পলাইন ১৬৪৩০ (টোল ফ্রি)-এও আইনি সহায়তা ও প্রয়োজনীয় তথ্যের জন্য যোগাযোগ করা যায়।
বিচারব্যবস্থায় সম্ভাব্য প্রভাব
সরকারের এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হলো—যে বিরোধ আদালতের বাইরে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা সম্ভব, সেগুলোকে শুরুতেই মধ্যস্থতার আওতায় এনে আদালতে নতুন মামলার চাপ কমানো। একই সঙ্গে বিচারপ্রার্থীর সময় ও খরচ সাশ্রয় এবং দ্রুত বিরোধ নিষ্পত্তির সুযোগ তৈরি করা।
আইনমন্ত্রীও বিচারাধীন মামলাগুলোর মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে নিষ্পত্তিযোগ্য মামলাগুলো লিগ্যাল এইড অফিসে মধ্যস্থতার জন্য পাঠানোর আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর প্রত্যাশা, আদালত, লিগ্যাল এইড অফিস, আইনজীবী ও সংশ্লিষ্ট সবাই সমন্বিতভাবে কাজ করলে আগামী এক বছরের মধ্যে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব হবে।
সুতরাং, ৩০ জেলার বাসিন্দাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হলো—উল্লিখিত সাত ধরনের বিরোধে সরাসরি আদালতে মামলা করার আগে সংশ্লিষ্ট জেলা লিগ্যাল এইড অফিসে মামলাপূর্ব মধ্যস্থতার উদ্যোগ নিতে হবে। মধ্যস্থতায় সমাধান না হলে পরবর্তী সময়ে আইন অনুযায়ী আদালতে যাওয়ার সুযোগ থাকবে।
