পে স্কেল নিউজ ২০২৬

মন্ত্রিসভার অনুমোদনের অপেক্ষায় নবম পে-স্কেল, বেতন বাড়ার আশায় সরকারি কর্মচারীরা

দীর্ঘ এক দশকের বেশি সময় পর সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া এখন গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে রয়েছে। জাতীয় বেতন কমিশনের সুপারিশ পর্যালোচনা করে মন্ত্রিসভায় উপস্থাপনের প্রস্তুতি চলছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাত দিয়ে প্রকাশিত সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সচিব কমিটির আরও কিছু সভার পর সুপারিশ মন্ত্রিসভায় পাঠানো হতে পারে এবং সব প্রক্রিয়া শেষ হলে আগস্টে গেজেট প্রকাশের লক্ষ্য রয়েছে।

তবে এখানে একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ—নবম পে-স্কেল নিয়ে এখনো চূড়ান্ত সরকারি গেজেট প্রকাশ হয়নি। ফলে বেতন বৃদ্ধির হার, ধাপ ও ভাতা সংক্রান্ত যেসব তথ্য প্রকাশ্যে এসেছে, সেগুলোকে আপাতত প্রস্তাব বা বাস্তবায়ন-পরিকল্পনা হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।

সর্বনিম্ন ২০ হাজার, সর্বোচ্চ ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা

জাতীয় বেতন কমিশনের প্রস্তাবিত কাঠামোয় সরকারি চাকরিজীবীদের সর্বনিম্ন মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা করার সুপারিশ রয়েছে। নতুন কাঠামোয় ২০টি গ্রেড রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে।

অর্থাৎ প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে ২০তম গ্রেডের একজন কর্মচারীর মূল বেতন বর্তমানের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। একইভাবে প্রথম গ্রেডের কর্মকর্তাদের মূল বেতনও ১ লাখ ৬০ হাজার টাকায় উন্নীত করার সুপারিশ রয়েছে।

কমিশনের প্রস্তাব অনুযায়ী বিভিন্ন গ্রেডে বেতন বৃদ্ধির হার এক হবে না। সামগ্রিকভাবে ১০০ থেকে ১৪০ শতাংশের মতো বেতন বৃদ্ধির প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তবে শেষ পর্যন্ত কোন গ্রেডে কত টাকা এবং কী হারে বৃদ্ধি কার্যকর হবে, তা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ও সরকারি গেজেটের ওপর নির্ভর করবে।

একবারে নয়, ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের সম্ভাবনা

নবম পে-স্কেল বাস্তবায়নের সবচেয়ে বড় প্রশ্নগুলোর একটি হলো—সরকার কি একসঙ্গে পুরো বেতন বৃদ্ধি কার্যকর করবে, নাকি কয়েক ধাপে বাস্তবায়ন করবে?

সাম্প্রতিক সময়ে সরকারের উচ্চপর্যায়ের পর্যালোচনায় ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। আর্থিক সক্ষমতা, অতিরিক্ত সরকারি ব্যয় এবং মূল্যস্ফীতির চাপ বিবেচনায় নিয়ে একাধিক ধাপে নতুন কাঠামো বাস্তবায়নের সুপারিশের কথা প্রকাশিত হয়েছে।

প্রাথমিক আলোচনায় তিন ধাপের একটি পরিকল্পনার কথা এসেছে। এতে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে মূল বেতন বৃদ্ধির একটি অংশ, পরবর্তী অর্থবছরে বাকি অংশ এবং এরপর নতুন ভাতা কাঠামো বাস্তবায়নের ধারণা রয়েছে। তবে এটি এখনো চূড়ান্ত গেজেট নয়। মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্তের পরই বাস্তব রূপরেখা নিশ্চিত হবে।

১ জুলাই থেকে কার্যকর ধরা হলেও বর্ধিত টাকা পেতে সময় লাগতে পারে

সরকারের পক্ষ থেকে নতুন বেতন কাঠামো ১ জুলাই ২০২৬ থেকে কার্যকর করার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু গেজেট প্রকাশ এবং প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন না হওয়ায় বাস্তবে নতুন হারে বেতন পাওয়ার ক্ষেত্রে সময় লাগছে।

সংশ্লিষ্টদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, গেজেট পরে প্রকাশ হলেও কার্যকর তারিখ ১ জুলাই ধরা হলে ওই তারিখ থেকে প্রাপ্য অর্থ বকেয়া বা অ্যারিয়ার হিসেবে সমন্বয়ের সুযোগ থাকবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।

অর্থাৎ গেজেট প্রকাশে বিলম্ব হলেও ১ জুলাই থেকে নতুন কাঠামোর সুবিধা কার্যকর হিসেবে গণ্য হলে কর্মচারীদের প্রাপ্য অর্থ পরবর্তী সময়ে একসঙ্গে বা সরকারের নির্ধারিত পদ্ধতিতে সমন্বয় করা হতে পারে।

গেজেট প্রকাশে কেন দেরি হচ্ছে?

নতুন পে-স্কেল শুধু মূল বেতন পরিবর্তনের বিষয় নয়। এর সঙ্গে জড়িত রয়েছে বাড়িভাড়া, চিকিৎসা, যাতায়াতসহ বিভিন্ন ভাতা, পেনশন, ইনক্রিমেন্ট, বেতন নির্ধারণ এবং সরকারি বেতন ব্যবস্থাপনার সফটওয়্যার।

এ ছাড়া জাতীয় বেতন কমিশনের সুপারিশের পাশাপাশি জুডিশিয়াল সার্ভিস ও সশস্ত্র বাহিনীর বেতন কাঠামোর বিষয়ও পর্যালোচনা করা হচ্ছে। এসব বিষয় সমন্বয় করে বাস্তবায়নযোগ্য সুপারিশ তৈরি করাই উচ্চপর্যায়ের কমিটির অন্যতম কাজ।

ফলে কেবল একটি প্রজ্ঞাপন জারি করলেই পুরো কার্যক্রম শেষ হবে না; প্রশাসনিক, আর্থিক ও প্রযুক্তিগত বেশ কিছু প্রস্তুতিও সম্পন্ন করতে হবে।

সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ অর্থের জোগান

নবম পে-স্কেল বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সরকারের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হলো অতিরিক্ত অর্থের সংস্থান। কমিশনের প্রস্তাব পুরোপুরি বাস্তবায়ন করতে বিপুল অতিরিক্ত অর্থের প্রয়োজন হতে পারে। মে মাসে প্রকাশিত প্রতিবেদনে কমিশনের প্রস্তাব বাস্তবায়নে অতিরিক্ত প্রায় ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হতে পারে বলে উল্লেখ করা হয়েছিল।

এ কারণে সরকার একদিকে কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধির দাবি বিবেচনা করছে, অন্যদিকে রাজস্ব আয়, মূল্যস্ফীতি ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক সক্ষমতার বিষয়টিও হিসাব করছে।

এই বাস্তবতায় ধাপে ধাপে বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন করলে সরকারের ওপর একসঙ্গে বড় ধরনের আর্থিক চাপ কিছুটা কমানো সম্ভব হবে—এমন যুক্তিই আলোচনায় গুরুত্ব পাচ্ছে।

আইএমএফের পরামর্শ নিয়েও আলোচনা

নবম পে-স্কেল নিয়ে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের অবস্থানও আলোচনায় এসেছে। মূল্যস্ফীতি ও সামষ্টিক অর্থনীতির ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থেকে পে-স্কেল বাস্তবায়ন পিছিয়ে দেওয়ার পরামর্শের কথা বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

তবে সরকার এখন পর্যন্ত বিষয়টি পুরোপুরি স্থগিত করার পথে না গিয়ে ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের মাধ্যমে আর্থিক চাপ সামাল দেওয়ার কৌশল বিবেচনা করছে বলে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে জানা গেছে। ফলে পে-স্কেল বাস্তবায়নের মূল প্রশ্ন এখন সময়ের চেয়ে বেশি হয়ে দাঁড়িয়েছে—কোন কাঠামোয় এবং কত ধাপে এটি কার্যকর হবে।

পেনশনভোগীদের জন্যও থাকছে পরিবর্তনের সম্ভাবনা

নতুন বেতন কাঠামোর আলোচনায় শুধু কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারী নয়, পেনশনভোগীদের বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে। কমিশনের বিভিন্ন সুপারিশে নিম্ন পেনশনভোগীদের জন্য উল্লেখযোগ্য সুবিধা বাড়ানোর প্রস্তাব রয়েছে।

ফলে নবম পে-স্কেল বাস্তবায়িত হলে এর প্রভাব শুধু সরকারি চাকরিজীবীদের মাসিক বেতনে নয়, অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পেনশন কাঠামোতেও পড়তে পারে।

২০১৫ সালের পর নতুন কাঠামোর অপেক্ষা

বাংলাদেশে সর্বশেষ অষ্টম জাতীয় পে-স্কেল কার্যকর হয়েছিল ২০১৫ সালে। এরপর এক দশকের বেশি সময় ধরে নতুন জাতীয় বেতন কাঠামো কার্যকর না হওয়ায় সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যে নতুন পে-স্কেলের দাবি ক্রমেই জোরালো হয়েছে।

এই দীর্ঘ সময়ে খাদ্য, বাসস্থান, চিকিৎসা, শিক্ষা ও পরিবহনসহ জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে। ফলে একই বেতন কাঠামোয় দীর্ঘদিন কাজ করার কারণে সরকারি কর্মচারীদের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমেছে—এমন যুক্তি থেকেই নতুন বেতন কাঠামোর প্রয়োজনীয়তা সামনে এসেছে।

এখন অপেক্ষা মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্তের

বর্তমান পরিস্থিতিতে নবম পে-স্কেলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হলো উচ্চপর্যায়ের কমিটির সুপারিশ চূড়ান্ত করা এবং তা মন্ত্রিসভায় উপস্থাপন। সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, আরও কয়েকটি বৈঠকের পর সুপারিশ মন্ত্রিসভায় পাঠানোর সম্ভাবনা রয়েছে এবং আগস্টের মধ্যে চূড়ান্ত গেজেট প্রকাশের লক্ষ্য রয়েছে।

তবে অন্যদিকে জুলাইয়ের শেষ দিকের প্রতিবেদনে আগস্টের মধ্যে গেজেট না হলে বৃহত্তর কর্মসূচির হুঁশিয়ারিও এসেছে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একটি সংগঠনের পক্ষ থেকে।

সব মিলিয়ে, নবম পে-স্কেলের মূল বেতন কাঠামোর প্রস্তাব অনেকটাই স্পষ্ট হলেও চূড়ান্ত বেতন, ধাপ, ভাতা ও বাস্তবায়ন পদ্ধতি এখনো সরকারি গেজেটের মাধ্যমে নিশ্চিত হয়নি। তাই সর্বনিম্ন ২০ হাজার টাকা, সর্বোচ্চ ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা কিংবা শতভাগের বেশি বেতন বৃদ্ধির তথ্যকে আপাতত কমিশনের সুপারিশ হিসেবে দেখা উচিত।

সরকারি কর্মচারীদের এখন মূল অপেক্ষা—মন্ত্রিসভায় প্রস্তাব অনুমোদন, চূড়ান্ত প্রজ্ঞাপন প্রকাশ এবং ১ জুলাই থেকে প্রাপ্য সুবিধা কীভাবে ও কোন ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে, সেই সিদ্ধান্তের জন্য। গেজেট প্রকাশের পরই নবম পে-স্কেলের প্রকৃত চিত্র পুরোপুরি পরিষ্কার হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *