সরকারি কর্মচারীদের বহুল প্রতীক্ষিত নবম জাতীয় পে-স্কেল এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এর বাস্তবায়ন হবে এবং যে কোনো মুহূর্তে নতুন বেতন কাঠামোর ঘোষণা আসতে পারে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এ বি এম আব্দুস সাত্তার।
রোববার সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “পে-স্কেল বিবেচনাধীন আছে এবং সরকারের কমিটমেন্ট আছে। এটা আমরা বাস্তবায়ন করবো। এটি চূড়ান্ত পর্যায়ে আছে। যে কোনো মুহূর্তে পে-স্কেল ঘোষণা হতে পারে।”
প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিবের এই বক্তব্যকে নবম পে-স্কেল নিয়ে চলমান দীর্ঘ প্রক্রিয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সাম্প্রতিক বার্তাগুলোর একটি হিসেবে দেখা হচ্ছে। কারণ এর আগে বিভিন্ন পর্যায়ে কমিটির পর্যালোচনা, অর্থায়ন, বেতন কাঠামো ও বাস্তবায়ন পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা হলেও সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে এমন সরাসরি বক্তব্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত বহন করছে।
এখন কোন পর্যায়ে রয়েছে পে-স্কেল?
নবম জাতীয় বেতন কমিশনের সুপারিশ পর্যালোচনার জন্য গত ২১ এপ্রিল মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনির নেতৃত্বে একটি ১০ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়। কমিটিতে প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব, অর্থসচিব, জনপ্রশাসনসচিব, আইনসচিব, প্রতিরক্ষাসচিব, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষাসচিব, স্বাস্থ্যসেবাসচিব, সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার এবং হিসাব মহানিয়ন্ত্রকসহ সংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তারা রয়েছেন।
সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিবেদনে এর আগে বলা হয়েছিল, বেসামরিক প্রশাসন, বিচার বিভাগ এবং সশস্ত্র বাহিনীর জন্য পৃথক বেতন কাঠামোর কাজও প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। ফলে এখন মূল অপেক্ষা সরকারের চূড়ান্ত অনুমোদন এবং আনুষ্ঠানিক প্রজ্ঞাপনের।
কত বাড়বে সরকারি কর্মচারীদের বেতন?
নবম পে-স্কেলে কোন গ্রেডে কত টাকা মূল বেতন নির্ধারণ করা হবে—এ বিষয়ে এখনো সরকারের চূড়ান্ত ঘোষণা আসেনি। ফলে বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত প্রস্তাব, কমিশনের সুপারিশ কিংবা বিভিন্ন সূত্রের তথ্যকে চূড়ান্ত বেতন কাঠামো হিসেবে ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই।
তবে এর আগে প্রকাশিত প্রতিবেদনে নবম বেতন কমিশনের সুপারিশে সর্বনিম্ন মূল বেতন ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা করার প্রস্তাবের কথা উল্লেখ করা হয়েছিল। একই প্রতিবেদনে বলা হয়, কমিশনের সুপারিশ পুরোপুরি বাস্তবায়নে বছরে অতিরিক্ত প্রায় ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হতে পারে।
অর্থাৎ, চূড়ান্ত পে-স্কেলে বেতন কত হবে, কোন গ্রেডে কী হারে বৃদ্ধি হবে এবং নতুন কাঠামো কীভাবে কার্যকর হবে—এসব বিষয় সরকারের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে।
২০১৫ সালের পর নতুন বেতন কাঠামোর অপেক্ষা
বাংলাদেশে সরকারি কর্মচারীদের সর্বশেষ জাতীয় বেতন কাঠামো কার্যকর হয় ২০১৫ সালে। এরপর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও নতুন পে-স্কেল কার্যকর হয়নি। ফলে মূল্যস্ফীতি, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং বিদ্যমান বেতন কাঠামোর ক্রয়ক্ষমতা নিয়ে সরকারি কর্মচারীদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে অসন্তোষ ও প্রত্যাশা রয়েছে।
এই বাস্তবতায় নবম পে-স্কেল শুধু বেতন বৃদ্ধির বিষয় নয়; এর সঙ্গে সরকারি চাকরিজীবীদের বাড়িভাড়া, চিকিৎসা, শিক্ষা, অবসরকালীন সুবিধা, পেনশনসহ বিভিন্ন আর্থিক সুবিধার কাঠামোও প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যুক্ত হতে পারে।
‘যে কোনো মুহূর্তে ঘোষণা’—কী বোঝাচ্ছে?
প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিবের বক্তব্যের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ অংশ হলো—“চূড়ান্ত পর্যায়ে” এবং “যে কোনো মুহূর্তে”।
এর অর্থ, পে-স্কেলের মূল নীতিগত সিদ্ধান্তের পাশাপাশি প্রশাসনিক পর্যায়ের শেষ ধাপগুলো এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে বলে ধারণা করা যায়। তবে নির্দিষ্ট কোনো তারিখ বা সময় ঘোষণা না হওয়া পর্যন্ত ‘আজই’ বা ‘আগামীকালই’ প্রজ্ঞাপন হবে—এমন দাবি নিশ্চিতভাবে করা যাচ্ছে না।
আগের প্রতিবেদনগুলোতেও পে-স্কেলের সুপারিশ পর্যালোচনাকারী কমিটির কাজ প্রায় চূড়ান্ত এবং প্রজ্ঞাপন জারির অপেক্ষার কথা বলা হয়েছিল।
সরকারি কর্মচারীদের প্রত্যাশা এখন ঘোষণার দিকে
নতুন পে-স্কেল নিয়ে সরকারি কর্মচারীদের মধ্যে সবচেয়ে বড় আগ্রহ হলো—কোন গ্রেডে কত টাকা বেতন হবে এবং নতুন কাঠামো কবে থেকে কার্যকর হবে।
বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যম গ্রেডের কর্মচারীদের প্রত্যাশা, মূল্যস্ফীতি ও বর্তমান বাজারদরের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তাদের মূল বেতন ও ভাতার পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো হবে। অন্যদিকে সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে বিপুল সংখ্যক সরকারি কর্মচারীর বেতন-ভাতা বৃদ্ধির আর্থিক প্রভাব সামাল দেওয়া।
এ কারণে নতুন পে-স্কেল ঘোষণার সঙ্গে শুধু বেতন বৃদ্ধির অঙ্ক নয়, কত ধাপে বাস্তবায়ন হবে, অতিরিক্ত অর্থের সংস্থান কোথা থেকে হবে এবং কোন কোন ভাতা নতুন কাঠামোর আওতায় পুনর্নির্ধারণ করা হবে—এসব বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
এখন কী হতে পারে?
প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিবের সর্বশেষ বক্তব্যের পর নবম পে-স্কেল নিয়ে মূলত তিনটি বিষয়ের দিকে নজর থাকবে—
প্রথমত, সরকারের চূড়ান্ত অনুমোদন কখন দেওয়া হয়।
দ্বিতীয়ত, নতুন বেতন কাঠামোর গ্রেডভিত্তিক মূল বেতন কত নির্ধারণ করা হয়।
তৃতীয়ত, প্রজ্ঞাপনে কার্যকর তারিখ, বাস্তবায়নের ধাপ এবং বেতন-ভাতা ও অন্যান্য আর্থিক সুবিধার বিস্তারিত কীভাবে নির্ধারণ করা হয়।
সব মিলিয়ে, দীর্ঘ অপেক্ষার পর নবম পে-স্কেল এখন সিদ্ধান্তের একেবারে শেষ প্রান্তে পৌঁছেছে—প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিবের বক্তব্যে এমনই ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। তবে চূড়ান্ত বেতনহার, গ্রেডভিত্তিক অঙ্ক ও কার্যকর তারিখ সম্পর্কে সরকারি প্রজ্ঞাপন প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত কোনো নির্দিষ্ট অঙ্ককে চূড়ান্ত হিসেবে ধরা ঠিক হবে না।
এখন লাখ লাখ সরকারি কর্মচারীর অপেক্ষা—কবে আসবে সেই কাঙ্ক্ষিত ঘোষণা, আর ঘোষণার পর নতুন বেতন কাঠামোয় কার বেতন কতটা বাড়বে।

