নবম জাতীয় পে-স্কেল ২০২৬ নিয়ে দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান হয়েছে। গত ১৯ সেপ্টেম্বর ‘চাকরি (বেতন ও ভাতাদি) আদেশ, ২০২৬’ জারি হওয়ার পর সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে স্বস্তির পাশাপাশি বিভিন্ন অসঙ্গতি ও বৈষম্য নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে। নতুন কাঠামোটি ১ জুলাই ২০২৬ থেকে কার্যকর ধরা হয়েছে এবং মূল বেতন ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের কথা বলা হয়েছে।
বিশেষ করে বাড়িভাড়া ভাতার কাঠামো, গ্রেডভেদে মোট প্রাপ্য বেতন, পে-ফিক্সেশন এবং সিনিয়র-জুনিয়র বেতনের ব্যবধান নিয়ে সরকারি কর্মচারীদের একটি অংশ প্রশ্ন তুলছেন। ২২ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী কল্যাণ সমিতিও ১৫তম ও ১৭তম গ্রেডের মধ্যে সম্ভাব্য মোট বেতন বৈষম্যের বিষয়টি তুলে ধরে দ্রুত সমাধানের দাবি জানিয়েছে।
বৈষম্যের বিষয়টি কোথায়?
নতুন পে-স্কেলে মূল বেতন বৃদ্ধির পাশাপাশি বিভিন্ন ভাতার কাঠামোও গুরুত্বপূর্ণ। প্রকাশিত গেজেট অনুযায়ী, ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় ২০তম থেকে ১৬তম গ্রেডের নির্দিষ্ট বেতনসীমায় বাড়িভাড়া সর্বোচ্চ ৬০ শতাংশ, ১৫তম থেকে ১০ম গ্রেডে ৫০ শতাংশ, ৯ম থেকে ৫ম গ্রেডে ৪৫ শতাংশ এবং ৪র্থ থেকে ১ম ও তদূর্ধ্ব গ্রেডে ৩০ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে।
এখানেই তৈরি হয়েছে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—উচ্চতর গ্রেডে থাকা একজন কর্মচারীর মোট বেতন ও সুবিধা কি সব ক্ষেত্রে নিম্নতর গ্রেডের কর্মচারীর চেয়ে বেশি থাকবে?
সরকারি কর্মচারীদের বিভিন্ন সংগঠন ও বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে, কিছু ক্ষেত্রে বাড়িভাড়া ও অন্যান্য সুবিধার কাঠামো পাশাপাশি বসালে প্রত্যাশিত গ্রেডভিত্তিক পার্থক্য তৈরি হচ্ছে না। এমনকি ১৫তম গ্রেডের কর্মচারী ১৭তম গ্রেডের তুলনায় কম মোট বেতন পাওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে বলে কল্যাণ সমিতি দাবি করেছে।
অর্থাৎ বিষয়টি শুধু ‘কত টাকা বেতন বাড়ল’—এমন সরল হিসাবের নয়। নতুন স্কেলের প্রতিটি গ্রেড, প্রতিটি ধাপ, বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ভাতা, ইনক্রিমেন্ট এবং পে-ফিক্সেশন একসঙ্গে বিবেচনা করলেই প্রকৃত চিত্র পাওয়া যাবে।
তাহলে এসব নিয়ে কথা বললে কি পে-স্কেল বাতিল হয়ে যাবে?
এটি নিয়ে অনেক সরকারি কর্মচারীর মধ্যে যে আশঙ্কা দেখা যাচ্ছে, সেটিকে বাস্তবতার সঙ্গে আলাদা করে দেখা প্রয়োজন।
গেজেট প্রকাশের পর কোনো অসঙ্গতি নিয়ে প্রশ্ন তোলা মানেই পুরো পে-স্কেল বাতিলের দাবি করা নয়। বরং একটি বেতন কাঠামো কার্যকর হওয়ার পর বাস্তবে যদি কোনো গাণিতিক অসঙ্গতি, অনিচ্ছাকৃত বৈষম্য, প্রয়োগগত সমস্যা বা গ্রেড-টু-গ্রেড অসামঞ্জস্য ধরা পড়ে, তাহলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে তা উপস্থাপন করা প্রশাসনিকভাবে স্বাভাবিক বিষয়।
বরং পে-স্কেলকে আরও কার্যকর ও গ্রহণযোগ্য করতে সমস্যাগুলো চিহ্নিত করা প্রয়োজন।
বর্তমান গেজেট ইতোমধ্যে জারি হয়েছে এবং ১ জুলাই ২০২৬ থেকে কার্যকর হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। ফলে এখন আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হওয়া উচিত—কোথায় সমস্যা রয়েছে, কীভাবে সমস্যা তৈরি হচ্ছে এবং কী ধরনের সংশোধন করলে কাঠামোর মূল উদ্দেশ্য অক্ষুণ্ন রেখে বৈষম্য দূর করা সম্ভব।
‘কথা বললে বেতন কমিয়ে দেবে’—এমন আশঙ্কার ভিত্তি কতটা?
কোনো নির্দিষ্ট কর্মচারী যৌক্তিকভাবে কোনো অসঙ্গতি তুলে ধরলেই তার ব্যক্তিগত বেতন কমিয়ে দেওয়া হবে—এমন কোনো সাধারণ নিয়মের কথা প্রকাশিত গেজেট বা সাম্প্রতিক নির্ভরযোগ্য প্রতিবেদনে পাওয়া যাচ্ছে না।
তবে এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার রাখা জরুরি। অভিযোগ বা দাবি করলেই সেটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে সঠিক প্রমাণিত হয় না। কোনো বৈষম্য আছে কি না, সেটি গেজেটের সংশ্লিষ্ট ধারা, বেতন সারণি, ফিক্সেশন সূত্র ও ভাতার নিয়ম দিয়ে হিসাব করে দেখাতে হবে।
তাই আবেগের পরিবর্তে সবচেয়ে শক্তিশালী পদ্ধতি হচ্ছে—
- কোন গ্রেডে সমস্যা;
- কোন ধাপে সমস্যা;
- পুরোনো ও নতুন মূল বেতনের পার্থক্য কত;
- বাড়িভাড়া ও অন্যান্য ভাতা যোগ করলে মোট কত দাঁড়ায়;
- সিনিয়র কর্মচারী ও জুনিয়র কর্মচারীর বেতনে কী পার্থক্য থাকছে;
- পে-ফিক্সেশনের পর কী ফলাফল হচ্ছে—
এসব তথ্য টেবিল আকারে তুলে ধরা।
পে-স্কেলের দুর্বলতা তুলে ধরা কেন গুরুত্বপূর্ণ?
একটি জাতীয় বেতন কাঠামোর অন্যতম উদ্দেশ্য হলো দায়িত্ব, পদমর্যাদা, যোগ্যতা ও চাকরির স্তরের মধ্যে একটি যৌক্তিক আর্থিক সম্পর্ক তৈরি করা।
কিন্তু বাস্তব প্রয়োগে যদি দেখা যায়—
উচ্চতর গ্রেডের কর্মচারী কোনো ক্ষেত্রে নিম্নতর গ্রেডের কর্মচারীর চেয়ে কম মোট বেতন পাচ্ছেন,
অথবা
দীর্ঘ চাকরির কারণে সিনিয়র কর্মচারী ও তুলনামূলক কম চাকরিকাল থাকা কর্মচারীর বেতন প্রায় সমান হয়ে যাচ্ছে,
তাহলে বিষয়টি নীতিনির্ধারকদের সামনে তুলে ধরা প্রয়োজন।
কারণ আজ যে অসঙ্গতি ছোট মনে হচ্ছে, কয়েক বছর পর ইনক্রিমেন্ট, পদোন্নতি ও পে-ফিক্সেশনের সঙ্গে সেটিই বড় বৈষম্যে পরিণত হতে পারে।
আন্দোলন নয়, তথ্যভিত্তিক দাবি সবচেয়ে কার্যকর
৯ম পে-স্কেল নিয়ে এখন সবচেয়ে প্রয়োজন তথ্যভিত্তিক ও শান্তিপূর্ণ দাবি উপস্থাপন।
কোনো দাবি যৌক্তিক কি না তা প্রমাণের জন্য নির্দিষ্ট উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। যেমন—
‘গ্রেড ১৫-এর একজন কর্মচারী বনাম গ্রেড ১৭-এর একজন কর্মচারী—দুজনের নতুন মূল বেতন, বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ভাতা ও অন্যান্য প্রাপ্য যোগ করলে কার মোট বেতন কত?’
এ ধরনের হিসাব সামনে এলে সাধারণ কর্মচারী থেকে শুরু করে নীতিনির্ধারকরাও সমস্যাটি সহজে বুঝতে পারবেন।
একইভাবে পে-ফিক্সেশনের ক্ষেত্রে পুরোনো বেসিক → নতুন বেসিক → ইনক্রিমেন্ট → ফিক্সেশন → চূড়ান্ত বেসিক—এই ধারাবাহিক হিসাব প্রকাশ করা হলে কোথায় সমস্যা তৈরি হচ্ছে তা আরও স্পষ্ট হবে।
ইতোমধ্যে বৈষম্যের অভিযোগ সামনে এসেছে
নবম পে-স্কেলের গেজেট প্রকাশের মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই বাড়িভাড়া ও গ্রেডভিত্তিক মোট বেতন নিয়ে সরকারি কর্মচারীদের সংগঠন থেকে আনুষ্ঠানিক বক্তব্য এসেছে। বাংলাদেশ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী কল্যাণ সমিতি ২০২৮ সালের আগেই এসব বৈষম্য নিরসনের দাবি জানিয়েছে।
এটি দেখায় যে বিষয়টি শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আলোচনা নয়; সরকারি কর্মচারীদের প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠনও বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে সামনে এনেছে।
অন্যদিকে গেজেট অনুযায়ী অন্যান্য ভাতা নতুন হারে কার্যকর হওয়ার সময়ও পরে নির্ধারিত হয়েছে। বাড়িভাড়া, চিকিৎসা, উৎসবসহ বিভিন্ন সুবিধার নতুন কাঠামো ২০২৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে কার্যকর হওয়ার বিষয়টি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ফলে আগামী সময়ে এসব ভাতা বাস্তবে কীভাবে প্রয়োগ হয়, সেটিও বৈষম্য মূল্যায়নের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হবে।
‘পে-স্কেল বাতিল’ নয়, প্রয়োজন সংশোধনের পথ খোঁজা
নবম পে-স্কেল নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে দুটি বিষয়কে আলাদা করা জরুরি।
এক. পে-স্কেল বাস্তবায়ন।
দুই. পে-স্কেলের কোনো ত্রুটি বা অসঙ্গতি সংশোধন।
একটি কাঠামো বাস্তবায়নের পর সমস্যা চিহ্নিত হলে সেটি সংশোধনের দাবি তোলা আর পুরো কাঠামো বাতিলের দাবি এক বিষয় নয়।
তাই সরকারি কর্মচারীদের মধ্যে অযথা আতঙ্ক তৈরি না করে বরং সংশ্লিষ্ট ধারা ও হিসাব যাচাই করে সুনির্দিষ্ট দাবি উত্থাপন করাই অধিক ফলপ্রসূ হতে পারে।
শেষ কথা
নবম পে-স্কেল সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর আসা একটি গুরুত্বপূর্ণ বেতন কাঠামো। কিন্তু কোনো বেতন কাঠামো প্রকাশিত হলেই তার প্রতিটি ধারা বাস্তবে নিখুঁত হবে—এমন নিশ্চয়তা নেই।
গেজেট প্রকাশের পর যদি কোনো গ্রেডে বেতন বৈষম্য, বাড়িভাড়া নিয়ে অসামঞ্জস্য, পে-ফিক্সেশনে জটিলতা কিংবা সিনিয়র-জুনিয়র বেতনে অস্বাভাবিক ব্যবধান দেখা যায়, তাহলে সেটি তথ্য-প্রমাণসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সামনে তুলে ধরা দরকার।
তবে দাবি হতে হবে গেজেটভিত্তিক, হিসাবনির্ভর ও বাস্তবসম্মত। কারণ ‘ভয় পেয়ে চুপ থাকা’ যেমন সমাধান নয়, তেমনি যাচাই ছাড়া কোনো অভিযোগ করাও সমাধান নয়।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—৯ম পে-স্কেল বাস্তবায়নের পাশাপাশি যেখানে প্রকৃত অসঙ্গতি রয়েছে, সেগুলো চিহ্নিত করে সংশোধনের পথ তৈরি করা। এতে পে-স্কেলের উদ্দেশ্যই আরও শক্তিশালী হবে এবং বিভিন্ন গ্রেডের সরকারি কর্মচারীদের মধ্যে ন্যায্যতার প্রশ্নটিও আরও পরিষ্কারভাবে সমাধানের সুযোগ তৈরি হবে।

