বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাদের আবাসন সংকট নিরসনে দেশের ৬৪ জেলা ও ৮টি মহানগরের বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাদের জন্য আবাসিক ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে উপযুক্ত সরকারি জমি চিহ্নিত করে তথ্য পাঠানোর জন্য দেশের সব জেলা ও দায়রা জজ এবং গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলীদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আইন ও বিচার বিভাগের পরিকল্পনা শাখা থেকে ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে এ সংক্রান্ত একটি পত্র জারি করা হয়। পত্রে বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাদের জন্য আবাসিক ভবন নির্মাণ প্রকল্পের আওতায় জমি নির্বাচনের বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।
বিচারকদের আবাসন সংকট
মন্ত্রণালয়ের পত্রে বলা হয়েছে, বর্তমানে প্রতিটি জেলায় দেওয়ানি ও ফৌজদারি আদালত এবং বিভিন্ন বিশেষ ট্রাইব্যুনালে বিভিন্ন স্তরের প্রায় ৩০ থেকে ৫০ জন বিচারক কর্মরত থাকেন। কিন্তু কয়েকটি জেলা ছাড়া অধিকাংশ জেলাতেই বিচারকদের জন্য পর্যাপ্ত বা সমন্বিত সরকারি আবাসন ব্যবস্থা নেই।
এর ফলে অধিকাংশ বিচারককে ভাড়া বাসায় বসবাস করতে হয়। বিশেষ করে বিচারিক দায়িত্ব পালনের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের ক্ষেত্রে এ ধরনের ভাড়া বাসায় বসবাস শুধু আবাসন সমস্যা নয়, বরং নিরাপত্তার বিষয়ও হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মন্ত্রণালয়ের বক্তব্য অনুযায়ী, বিচারকদের দায়িত্বের প্রকৃতি এবং তাদের পরিচালিত মামলাসংক্রান্ত কার্যক্রম বিবেচনায় নিয়ে আবাসন নিরাপত্তার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভাড়া বাসায় বসবাসের কারণে বিচারক ও তাদের পরিবারের সার্বিক নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এক জায়গায় আবাসন হলে বাড়বে নিরাপত্তা
প্রস্তাবিত উদ্যোগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—একটি সমন্বিত আবাসিক ভবন বা আবাসিক কমপ্লেক্সের মাধ্যমে একাধিক বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তার আবাসনের ব্যবস্থা করা।
পত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, অনেক স্থানে জেলা জজদের আওতাধীন এলাকায় বিচারকদের আবাসন নির্মাণের জন্য পর্যাপ্ত জায়গা রয়েছে। এসব জমির সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহার নিশ্চিত করার মাধ্যমে প্রতিটি জেলা/মহানগরের ক্ষেত্রে প্রয়োজন অনুযায়ী প্রায় ১০ থেকে ২৫ জন বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তার জন্য আধুনিক আবাসিক কমপ্লেক্স নির্মাণ করা সম্ভব হতে পারে।
এ ধরনের সমন্বিত আবাসিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা হলে বিচারকদের আবাসন সংকটের পাশাপাশি তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও তুলনামূলকভাবে সহজ হবে।
আধুনিক আবাসিক কমপ্লেক্সে কী থাকতে পারে
প্রস্তাবিত আবাসিক কমপ্লেক্সকে শুধু বসবাসের ভবন হিসেবে নয়, বরং বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাদের নিরাপদ ও সুরক্ষিত আবাসন হিসেবে গড়ে তোলার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।
মন্ত্রণালয়ের পত্রে বলা হয়েছে, এ ধরনের ভবনে সিসিটিভি, নির্দিষ্ট প্রবেশপথ এবং সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা তুলনামূলকভাবে সহজ হবে। অর্থাৎ পরিকল্পিতভাবে একটি নির্দিষ্ট কমপ্লেক্সে বিচারকদের আবাসনের ব্যবস্থা করা হলে নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনাও কেন্দ্রীয়ভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হবে।
এতে বিচারক ও তাদের পরিবারের নিরাপত্তা বৃদ্ধির পাশাপাশি কর্মস্থলের কাছাকাছি নিরাপদ আবাসনের সুযোগ তৈরি হবে।
কোথায় নির্মাণ হবে আবাসিক ভবন?
প্রস্তাবিত প্রকল্পের আওতায় দেশের ৬৪ জেলা এবং ৮টি মহানগরের বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাদের জন্য আবাসিক ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
এ জন্য প্রথম ধাপে উপযুক্ত জমি নির্বাচনকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট জেলা ও দায়রা জজদের আওতাধীন আদালত প্রাঙ্গণ বা পুরাতন কোর্ট/মুন্সেফ কোর্ট প্রাঙ্গণে যতটুকু জায়গা রয়েছে, তার বিবরণ দিতে বলা হয়েছে।
জায়গা পর্যাপ্ত না থাকলে জেলা জজ আদালত ভবনের এক কিলোমিটার পরিধির মধ্যে প্রয়োজনীয় ভূমি অধিগ্রহণের সম্ভাব্যতা বিবেচনা করে জায়গার ধারণা দেওয়ার জন্যও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
অর্থাৎ বিচারকদের আবাসিক ভবন নির্মাণে মূল বিবেচ্য হবে—আদালতের কাছাকাছি, নিরাপদ ও সহজে নিয়ন্ত্রণযোগ্য জায়গা।
জমির বিস্তারিত তথ্য চাওয়া হয়েছে
প্রকল্পের জন্য জমি নির্বাচন প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নিতে সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে শুধু জায়গার নাম নয়, বরং জমির বিস্তারিত তথ্য চাওয়া হয়েছে।
এর মধ্যে রয়েছে—
- জেলা ও দায়রা জজের আওতাধীন আদালত প্রাঙ্গণে বিদ্যমান জমির পরিমাণ;
- পুরাতন কোর্ট/মুন্সেফ কোর্ট প্রাঙ্গণে থাকা জায়গার বিবরণ;
- জমির স্থানীয় পরিচিতি ও মৌজা সংক্রান্ত তথ্য;
- প্রয়োজনীয় জমি না থাকলে বিকল্প জায়গার সম্ভাব্যতা;
- জেলা জজ আদালত ভবনের কাছাকাছি সম্ভাব্য জমির অবস্থান;
- প্রয়োজন হলে ভূমি অধিগ্রহণের মাধ্যমে জমি পাওয়ার সম্ভাব্যতা।
এ ছাড়া নির্বাচিত স্থানের ডিজিটাল সার্ভে করার বিষয়েও গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলীদের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।
প্রকল্প বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে জমি নির্বাচন
বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রস্তাবিত উদ্যোগের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রাথমিক ধাপ হচ্ছে সঠিক স্থান নির্বাচন। কারণ বিচারকদের আবাসিক ভবন আদালত থেকে অনেক দূরে নির্মাণ করা হলে নিরাপত্তা, যাতায়াত এবং জরুরি প্রশাসনিক যোগাযোগ—সব ক্ষেত্রেই বাড়তি চাপ তৈরি হতে পারে।
অন্যদিকে আদালত প্রাঙ্গণ বা তার আশপাশে পর্যাপ্ত সরকারি জমি পাওয়া গেলে নতুন করে জমি অধিগ্রহণের প্রয়োজন কমতে পারে। এতে প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় ও ব্যয়—দুই ক্ষেত্রেই সুবিধা পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে আদালতের নিজস্ব কার্যক্রম পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় জায়গা যাতে সংকুচিত না হয়, সেটিও পরিকল্পনার সময় বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। আবাসিক ভবন নির্মাণের পাশাপাশি ভবিষ্যতে আদালতের সম্প্রসারণ, পার্কিং, নিরাপত্তা ও অন্যান্য প্রশাসনিক অবকাঠামোর প্রয়োজনীয়তাও বিবেচনায় রাখতে হবে।
৬৪ জেলা ও ৮ মহানগরে সম্ভাব্য বড় আবাসন কর্মসূচি
এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে এটি বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাদের জন্য দেশের অন্যতম বড় সমন্বিত আবাসন কর্মসূচিতে পরিণত হতে পারে। প্রতিটি জেলা ও মহানগরে যদি প্রয়োজন অনুযায়ী ১০ থেকে ২৫ জন কর্মকর্তার আবাসনের ব্যবস্থা করা যায়, তাহলে বিপুলসংখ্যক বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তা সরকারি নিরাপদ আবাসনের আওতায় আসতে পারেন।
তবে বর্তমানে এটি জমি নির্বাচন ও প্রকল্প প্রস্তুতির পর্যায়ের উদ্যোগ। জমি চিহ্নিতকরণ, ডিজিটাল সার্ভে, প্রকল্পের নকশা, অর্থ বরাদ্দ, প্রশাসনিক ও কারিগরি অনুমোদনসহ পরবর্তী বিভিন্ন ধাপ সম্পন্ন হওয়ার পরই নির্মাণকাজ বাস্তবায়নের পর্যায়ে যাবে।
নিরাপদ আবাসন বিচারিক পরিবেশের অংশ
বিচারকদের আবাসনকে শুধু সরকারি চাকরিজীবীদের আবাসন সুবিধা হিসেবে দেখলে বিষয়টির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক বাদ পড়ে যায়। বিচারিক কর্মকর্তাদের দায়িত্বের সঙ্গে ব্যক্তিগত নিরাপত্তার বিষয়টি সরাসরি সম্পর্কিত। মামলার পক্ষ, সাক্ষী, আসামি কিংবা বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে বিচারিক কার্যক্রমের কারণে বিচারকদের নিরাপত্তা ঝুঁকি সাধারণ সরকারি কর্মচারীদের তুলনায় ভিন্ন মাত্রার হতে পারে।
এই বাস্তবতায় আদালতের কাছাকাছি পরিকল্পিত ও নিরাপত্তাবেষ্টিত সরকারি আবাসিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্যোগ বিচারকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি বিচারিক কার্যক্রমকে আরও নির্বিঘ্ন করার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে।
এখন অপেক্ষা জমি চিহ্নিতকরণের
আইন ও বিচার বিভাগের নির্দেশনার পর এখন সংশ্লিষ্ট জেলা ও দায়রা জজ এবং গণপূর্ত বিভাগের মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের ওপর গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পড়েছে। কোন জেলায় কতটুকু সরকারি জমি রয়েছে, কোথায় আবাসিক ভবন নির্মাণ করা বাস্তবসম্মত, কোথায় নতুন করে জমি অধিগ্রহণ প্রয়োজন এবং আদালতের সঙ্গে প্রস্তাবিত আবাসিক ভবনের দূরত্ব কত—এসব তথ্যের ওপরই পরবর্তী পরিকল্পনা অনেকাংশে নির্ভর করবে।
সার্বিকভাবে, ৬৪ জেলা ও ৮ মহানগরে বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাদের জন্য আবাসিক ভবন নির্মাণের এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে দীর্ঘদিনের আবাসন সংকটের পাশাপাশি বিচারকদের নিরাপত্তা ব্যবস্থায়ও বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। তবে উদ্যোগটির বাস্তব সুফল নির্ভর করবে উপযুক্ত জমি নির্বাচন, বাস্তবসম্মত নকশা, পর্যাপ্ত অর্থায়ন এবং দ্রুত প্রকল্প অনুমোদন ও বাস্তবায়নের ওপর।

