সর্বজনীন পেনশন স্কিম

সর্বজনীন পেনশনে চালু হচ্ছে ইসলামিক পেনশন, ৫৫ বছরেই পেনশনের প্রস্তাবও পর্যালোচনায়

সর্বজনীন পেনশন কর্মসূচিকে আরও বিস্তৃত ও অংশগ্রহণবান্ধব করতে শরিয়াহভিত্তিক বা ইসলামিক পেনশন ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের পরিচালনা পর্ষদ ইসলামিক পেনশন ব্যবস্থা চালুর প্রস্তাবে অনুমোদন দিয়েছে। তবে এটি এখনই চালু হচ্ছে না; কাঠামো, পরিচালন পদ্ধতি ও বিধিমালা প্রণয়নের পর এটি বাস্তবায়ন করা হবে।

বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬) সচিবালয়ে জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের পরিচালনা পর্ষদের সভায় এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। সভা শেষে জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. মো. সুরাতুজ্জামান সাংবাদিকদের এসব তথ্য জানান।

শরিয়াহভিত্তিক পেনশনের উদ্যোগ

বর্তমান সর্বজনীন পেনশন কর্মসূচির আওতায় বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষকে অন্তর্ভুক্ত করা হলেও শরিয়াহভিত্তিক বিনিয়োগ ও পরিচালন কাঠামোর জন্য আলাদা কোনো পেনশন স্কিম এতদিন ছিল না। নতুন উদ্যোগের ফলে ইসলামিক আর্থিক নীতিমালা অনুসরণ করে একটি পৃথক পেনশন ব্যবস্থা গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি হচ্ছে।

জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (ADB) এবং স্থানীয় পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ইসলামিক পেনশন ব্যবস্থার কাঠামো ও পরিচালন পদ্ধতি নিয়ে কাজ করছে। প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি শেষ হওয়ার পর পৃথক বিধিমালা প্রণয়ন করে স্কিমটি চালু করা হবে।

অর্থাৎ, পর্ষদের অনুমোদন পাওয়া মানেই ইসলামিক পেনশনের নিবন্ধন বা চাঁদা গ্রহণ এখনই শুরু হচ্ছে—এমন নয়। এর আগে বিনিয়োগ কাঠামো, পরিচালনা পদ্ধতি, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং শরিয়াহ-অনুগত বিধিবিধান নির্ধারণের কাজ শেষ করতে হবে।

৬০ বছর থেকে ৫৫ বছর বয়সে পেনশনের প্রস্তাব

এর পাশাপাশি সর্বজনীন পেনশন পাওয়ার বর্তমান বয়সসীমা ৬০ বছর থেকে কমিয়ে ৫৫ বছর করার একটি প্রস্তাবও পর্যালোচনা করা হচ্ছে। তবে এ বিষয়ে বৃহস্পতিবারের সভায় কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। বিষয়টি আরও পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং অ্যাকচুয়ারিয়াল পরামর্শের পর ভবিষ্যতে পর্ষদে উপস্থাপন করা হতে পারে।

বর্তমান আইনি কাঠামো অনুযায়ী, সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থায় ধারাবাহিকভাবে কমপক্ষে ১০ বছর চাঁদা দেওয়ার শর্তসহ ৬০ বছর বয়স পূর্ণ হলে পেনশন পাওয়ার বিধান রয়েছে।

জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের ওয়েবসাইটেও বর্তমানে ৬০ বছর বয়সে মাসিক পেনশন পাওয়ার কথা উল্লেখ রয়েছে।

কেন ৫৫ বছরের প্রস্তাবটি গুরুত্বপূর্ণ

পেনশনের বয়স ৬০ থেকে ৫৫ বছর হলে অংশগ্রহণকারীরা তুলনামূলকভাবে আগে পেনশন পাওয়ার সুযোগ পাবেন। তবে একই সঙ্গে পেনশন তহবিলের ওপর দীর্ঘ সময় ধরে অর্থ পরিশোধের দায় তৈরি হতে পারে। ফলে শুধু বয়স কমালেই হবে না—চাঁদার পরিমাণ, জমাকৃত অর্থ, বিনিয়োগ থেকে সম্ভাব্য আয়, পেনশনের পরিমাণ এবং একজন পেনশনভোগী গড়ে কত বছর সুবিধা পাবেন—সবকিছু হিসাব করতে হবে।

এই কারণেই কর্তৃপক্ষ বিষয়টি অ্যাকচুয়ারিয়াল বিশ্লেষণের মাধ্যমে যাচাই করতে চাইছে। অর্থাৎ, বয়স ৫৫ করা হলে দীর্ঘমেয়াদে পেনশন তহবিল আর্থিকভাবে কতটা টেকসই থাকবে, তা হিসাব করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাও বিবেচনায়

পেনশনের বয়স নির্ধারণে অন্যান্য দেশের অবসর ও পেনশন ব্যবস্থার উদাহরণও বিবেচনা করা হচ্ছে। ড. সুরাতুজ্জামান উদাহরণ দিয়ে বলেছেন, স্পেনে পেনশনের বয়স ৬৭ বছর এবং যুক্তরাজ্যে ৬৬ বছর। একই সঙ্গে বাংলাদেশে মানুষের গড় আয়ু বৃদ্ধির বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে।

তাই ৫৫ বছর বয়সে পেনশন দেওয়ার প্রস্তাবটি কেবল বয়স কমানোর বিষয় হিসেবে দেখা হচ্ছে না; এর সঙ্গে জনমিতিক পরিবর্তন, গড় আয়ু, তহবিলের স্থায়িত্ব এবং ভবিষ্যৎ আর্থিক দায়—এসব বিষয়ও যুক্ত রয়েছে।

পেনশনারের মৃত্যুর পর স্বামী-স্ত্রীর সুবিধা বাড়ছে

ইসলামিক পেনশনের পাশাপাশি সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থায় পেনশনারের মৃত্যুর পর তাঁর স্বামী বা স্ত্রীর পেনশন পাওয়ার বয়সসীমাও বাড়ানো হয়েছে।

নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, পেনশনারের মৃত্যুর পর তাঁর স্বামী বা স্ত্রী আগের ৭৫ বছরের পরিবর্তে ৮০ বছর বয়স পর্যন্ত পেনশন সুবিধা পাবেন। অর্থাৎ, নমিনি বা স্বামী-স্ত্রীর জন্য সুবিধার সময়সীমা আরও পাঁচ বছর বাড়ানো হয়েছে।

বর্তমান ব্যবস্থায় পেনশনার ৭৫ বছর পূর্ণ করার আগেই মারা গেলে নমিনি অবশিষ্ট সময়ের জন্য পেনশন পাওয়ার বিধান ছিল। নতুন সিদ্ধান্তে সেই বয়সসীমা ৮০ বছর করা হয়েছে।

আরও পরিবর্তনের পথে সর্বজনীন পেনশন

সর্বজনীন পেনশন কর্মসূচিতে সাম্প্রতিক সময়ে একাধিক পরিবর্তন আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে সরকারি মালিকানাধীন যেসব প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা সরাসরি সরকারি পেনশন সুবিধার আওতায় নেই, তাদের ‘প্রগতি’ স্কিমে অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগও রয়েছে।

এ ছাড়া ২০২৫-২৬ অর্থবছরে পেনশন তহবিলের বিনিয়োগের বিপরীতে ১১ দশমিক ৭২ শতাংশ মুনাফা দেওয়ার প্রস্তাবও অনুমোদন করেছে কর্তৃপক্ষ। আগের হার ছিল ১১ দশমিক ৬৮ শতাংশ।

পেনশন কর্মসূচির সঙ্গে স্বাস্থ্যবীমা যুক্ত করা, অংশগ্রহণকারীদের ঋণ সুবিধা দেওয়া এবং মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সমন্বয় করে পেনশনের মুনাফা নির্ধারণের বিষয়গুলোও পর্যালোচনায় রয়েছে। এসব বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।

এখন কী হতে পারে

সব মিলিয়ে সর্বজনীন পেনশন কর্মসূচিতে সামনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে শরিয়াহভিত্তিক ইসলামিক পেনশন ব্যবস্থা চালুর সিদ্ধান্ত অনুমোদন পেয়েছে; তবে বাস্তবায়নের আগে এর কাঠামো ও পৃথক বিধিমালা তৈরি করতে হবে।

অন্যদিকে ৬০ বছর থেকে ৫৫ বছর বয়সে পেনশন দেওয়ার প্রস্তাব এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নয়। অ্যাকচুয়ারিয়াল বিশ্লেষণ ও আর্থিক-জনমিতিক বাস্তবতা যাচাইয়ের পর এ বিষয়ে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

ফলে আপাতত সর্বজনীন পেনশনের বর্তমান পেনশনযোগ্য বয়স ৬০ বছরই বহাল রয়েছে। ৫৫ বছর করার প্রস্তাবটি অনুমোদিত হলে পরবর্তীতে সংশ্লিষ্ট বিধি বা কাঠামোয় প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনতে হবে।

সারকথা: সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থাকে নতুন করে সাজানোর প্রক্রিয়ায় একদিকে শরিয়াহভিত্তিক ইসলামিক পেনশন যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, অন্যদিকে পেনশন পাওয়ার বয়স কমিয়ে ৫৫ বছর করার প্রস্তাব পরীক্ষা করা হচ্ছে। তবে দ্বিতীয় বিষয়টি এখনো প্রস্তাব ও পর্যালোচনার পর্যায়ে রয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *