দেশের সব উপজেলার প্রতিটি ইউনিয়নের হাট ও বাজারে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপনের নির্দেশ দিয়েছে স্থানীয় সরকার বিভাগ। আগামী ৩১ জানুয়ারি ২০২৭-এর মধ্যে এ কার্যক্রম সম্পন্ন করতে বলা হয়েছে। সৌরবিদ্যুৎ দিয়ে সংশ্লিষ্ট হাট-বাজারের নিজস্ব বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণের পর অতিরিক্ত বিদ্যুৎ নেট মিটারিং পদ্ধতিতে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করতে হবে।
স্থানীয় সরকার বিভাগের উপজেলা-২ শাখা থেকে ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে এ সংক্রান্ত নির্দেশনা জারি করা হয়। এতে দেশের সব উপজেলা পরিষদের প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। স্থানীয় সরকার বিভাগের উপসচিব সুলতানা আক্তার স্বাক্ষরিত নির্দেশনাটি সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের কাছে পাঠানো হয়েছে।
কেন নেওয়া হলো এই উদ্যোগ
নির্দেশনায় বলা হয়েছে, টেকসই জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর অংশ হিসেবে স্থানীয় সরকার বিভাগের আওতাধীন দপ্তর, সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানগুলোর স্থানীয়, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের বিদ্যমান দাপ্তরিক ভবন এবং অন্যান্য আওতাধীন ভবনের ছাদে ব্যাটারিসহ সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপনের কথা বলা হয়েছে।
অর্থাৎ শুধু হাট-বাজার নয়, স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার আওতাধীন বিভিন্ন সরকারি স্থাপনাকেও ধীরে ধীরে সৌরবিদ্যুতের আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রতিটি হাট-বাজারের স্থায়ী শেডের ছাদে বসবে সৌর প্যানেল
নির্দেশনা অনুযায়ী, উপজেলার প্রতিটি ইউনিয়নের হাট ও বাজারের স্থায়ী শেডের ছাদ সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের কাজে ব্যবহার করা হবে। পাশাপাশি স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর—এলজিইডি—নির্মিত বিভিন্ন বাজারের চার থেকে পাঁচতলা ভবনের ছাদের আয়তন ও উপযোগিতা বিবেচনা করে সেখানে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপনের ব্যবস্থা করতে বলা হয়েছে।
এর ফলে নতুন করে জমি অধিগ্রহণ বা সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের জন্য আলাদা জায়গা তৈরির প্রয়োজন কমবে। ইতোমধ্যে নির্মিত বাজার অবকাঠামোর ছাদকে কাজে লাগিয়েই বিদ্যুৎ উৎপাদনের সুযোগ তৈরি হবে।
ন্যূনতম দুই ঘণ্টার ব্যাটারি ব্যাকআপ বাধ্যতামূলক
নির্দেশনার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার সঙ্গে ন্যূনতম দুই ঘণ্টার ব্যাটারি ব্যাকআপ রাখতে হবে।
এর ফলে শুধু দিনের বেলায় সূর্যের আলো থাকাকালীন বিদ্যুৎ উৎপাদনের ওপর নির্ভর করতে হবে না। সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন বন্ধ থাকার সময়ও নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত ব্যাটারি থেকে বিদ্যুৎ ব্যবহার করা যাবে।
বিশেষ করে হাট-বাজারের আলো, অফিস, নিরাপত্তা ব্যবস্থা, পানি সরবরাহ কিংবা অন্যান্য প্রয়োজনীয় বৈদ্যুতিক কার্যক্রমে এ ব্যাকআপ ব্যবস্থার ব্যবহার গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
আগে নিজস্ব চাহিদা, এরপর জাতীয় গ্রিডে উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ
প্রস্তাবিত ব্যবস্থার মূল কাঠামো হলো—প্রথমে উৎপাদিত সৌরবিদ্যুৎ সংশ্লিষ্ট হাট বা প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণে ব্যবহার করা হবে। নিজস্ব ব্যবহারের পর যে বিদ্যুৎ অতিরিক্ত থাকবে, সেটি নেট মিটারিং ব্যবস্থার মাধ্যমে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হবে।
এতে একটি হাট বা বাজার একই সঙ্গে বিদ্যুতের ভোক্তা ও অতিরিক্ত বিদ্যুতের সরবরাহকারী হিসেবে ভূমিকা রাখতে পারবে।
প্রতি ইউনিট উদ্বৃত্ত বিদ্যুতের বিপরীতে ১০ টাকা ৫০ পয়সা
নির্দেশনায় নেট মিটারিং নির্দেশিকা, ২০২৫-এর কথা উল্লেখ করে বলা হয়েছে, জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা বিদ্যুতের প্রতি ইউনিটের বিপরীতে ১০ টাকা ৫০ পয়সা হারে অর্থ পাওয়ার সুযোগ রয়েছে।
ফলে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের মাধ্যমে শুধু বিদ্যুৎ বিল কমানোর সুযোগই তৈরি হবে না; নিজস্ব চাহিদা পূরণের পর অতিরিক্ত বিদ্যুৎ গ্রিডে সরবরাহ করে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো রাজস্ব আয়ের সুযোগও পেতে পারে।
তবে বাস্তবে কত টাকা আয় হবে, তা নির্ভর করবে স্থাপিত সৌর প্যানেলের সক্ষমতা, সূর্যালোকের প্রাপ্যতা, হাটের বিদ্যুৎ চাহিদা, উৎপাদিত বিদ্যুতের পরিমাণ এবং গ্রিডে সরবরাহযোগ্য উদ্বৃত্ত বিদ্যুতের ওপর।
হাট-বাজারের ইজারার অর্থ ব্যবহার করা যাবে
সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের অর্থায়নের ক্ষেত্রেও নির্দেশনায় একটি নির্দিষ্ট পথ দেখানো হয়েছে। ‘হাট ও বাজার (স্থাপন ও ব্যবস্থাপনা) বিধিমালা, ২০২৫’-এর বিধি ১০-এর সংশ্লিষ্ট উপবিধি অনুসারে হাট-বাজারের ইজারালব্ধ অর্থের নির্ধারিত অংশ রক্ষণাবেক্ষণ ও উন্নয়ন কাজে ব্যবহারের জন্য বরাদ্দ থাকে।
নির্দেশনা অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট হাট ও বাজারের রক্ষণাবেক্ষণ বা উন্নয়নের জন্য নির্ধারিত ১০ শতাংশ এবং উপজেলার আওতাধীন হাট-বাজারগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ বা উন্নয়নের জন্য নির্ধারিত আরও ১০ শতাংশ অর্থ ব্যবহার করে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন ও তা বাণিজ্যিকভাবে সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিতে বলা হয়েছে।
অর্থাৎ হাট-বাজার থেকে অর্জিত রাজস্বের একটি অংশকে দীর্ঘমেয়াদি বিদ্যুৎ অবকাঠামো তৈরিতে বিনিয়োগ করার সুযোগ রাখা হয়েছে।
সৌর প্যানেল স্থাপনকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ২০ বছরের চুক্তি
শুধু সৌর প্যানেল স্থাপন করেই প্রকল্পের দায়িত্ব শেষ হবে না। নির্দেশনায় সৌরবিদ্যুৎ প্যানেল স্থাপনকারী কোম্পানির সঙ্গে পরবর্তী ২০ বছর মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে চুক্তি করার কথা বলা হয়েছে।
এর উদ্দেশ্য হলো, সৌর প্যানেল, ব্যাটারি, ইনভার্টারসহ সংশ্লিষ্ট যন্ত্রপাতি স্থাপনের পর দীর্ঘমেয়াদে সেগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করা। এতে প্রকল্প স্থাপনের কয়েক বছর পর রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে সিস্টেম অকার্যকর হয়ে পড়ার ঝুঁকি কমানোর একটি প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা তৈরি হবে।
৩১ জানুয়ারি ২০২৭-এর মধ্যে বাস্তবায়নের লক্ষ্য
নির্দেশনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়সীমা হলো ৩১ জানুয়ারি ২০২৭। এর মধ্যে দেশের সব উপজেলার প্রতিটি ইউনিয়নের হাট ও বাজারে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপনের প্রয়োজনীয় কার্যক্রম সম্পন্ন করতে বলা হয়েছে।
এ কারণে এখন উপজেলা প্রশাসন, হাট-বাজার কর্তৃপক্ষ এবং সংশ্লিষ্ট স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর সামনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ রয়েছে—ছাদ ও অবকাঠামো যাচাই, সৌর প্যানেলের সক্ষমতা নির্ধারণ, অর্থের সংস্থান, প্রয়োজনীয় কারিগরি ব্যবস্থা, নেট মিটারিং সংযোগ এবং দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণ চুক্তি সম্পন্ন করা।
জাতীয় গ্রিডেও বাড়বে নবায়নযোগ্য বিদ্যুতের অংশ
এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে এর প্রভাব শুধু স্থানীয় হাট-বাজারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। বিভিন্ন বাজারে উৎপাদিত উদ্বৃত্ত সৌরবিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হলে সামগ্রিক বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।
একই সঙ্গে দিনের বেলায় বাজারের নিজস্ব বিদ্যুৎ চাহিদার একটি অংশ সৌরবিদ্যুৎ থেকে পূরণ করা সম্ভব হলে প্রচলিত গ্রিড বিদ্যুতের ওপর নির্ভরতা কমতে পারে। আর উৎপাদন ও ব্যবহার ব্যবস্থার মধ্যে সমন্বয় ভালোভাবে করা গেলে উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে পাঠানো সম্ভব হবে। স্থানীয় সরকার বিভাগও এ উদ্যোগের মাধ্যমে নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসার, স্থানীয় বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণ এবং রাজস্ব আয়ের সম্ভাবনার কথা জানিয়েছে।
বাস্তবায়নে যেসব বিষয় গুরুত্বপূর্ণ
বিশেষজ্ঞ পর্যায়ে প্রকল্পটির বাস্তব সুফল নিশ্চিত করতে কয়েকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। প্রথমত, প্রতিটি হাট-বাজারের ছাদের ধারণক্ষমতা ও কাঠামোগত নিরাপত্তা যাচাই করতে হবে। দ্বিতীয়ত, সৌর প্যানেল ও ব্যাটারির মান নিশ্চিত করতে হবে। তৃতীয়ত, নেট মিটারিং সংযোগের জন্য সংশ্লিষ্ট বিদ্যুৎ বিতরণ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রয়োজনীয় সমন্বয় করতে হবে।
এ ছাড়া ২০ বছরের রক্ষণাবেক্ষণ চুক্তিতে যন্ত্রপাতির ওয়ারেন্টি, ব্যাটারি পরিবর্তন, ত্রুটি মেরামত, নিয়মিত সার্ভিসিং এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানের দায়বদ্ধতা স্পষ্ট রাখা গুরুত্বপূর্ণ হবে।
সারসংক্ষেপ
স্থানীয় সরকার বিভাগের ২৪ সেপ্টেম্বরের এই নির্দেশনার মাধ্যমে দেশের উপজেলা পর্যায়ের হাট-বাজারগুলোকে ধীরে ধীরে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবস্থার আওতায় আনার একটি নির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা সামনে এসেছে। এতে স্থায়ী শেড ও বহুতল বাজার ভবনের ছাদ ব্যবহার করে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন, ন্যূনতম দুই ঘণ্টার ব্যাটারি ব্যাকআপ, নিজস্ব চাহিদা পূরণের পর উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ এবং নেট মিটারিংয়ের মাধ্যমে আর্থিক সুবিধা পাওয়ার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ৩১ জানুয়ারি ২০২৭-এর মধ্যে দেশের সব উপজেলার প্রতিটি ইউনিয়নের হাট ও বাজারে এই ব্যবস্থা স্থাপনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ২০ বছরের রক্ষণাবেক্ষণ চুক্তির নির্দেশ থাকায় প্রকল্পটির দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্বের বিষয়টিও নির্দেশনায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

