আজকের খবর ২০২৬

প্রাথমিক শিক্ষকদের পদবি পরিবর্তনে অর্থ বিভাগের ‘না’: ‘সহকারী শিক্ষক’ থেকে ‘শিক্ষক’ হওয়ার প্রস্তাব আটকে গেল

সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকদের পদবি পরিবর্তন করে শুধু ‘শিক্ষক’ করার প্রস্তাবে সম্মতি দেয়নি অর্থ বিভাগ। একই সঙ্গে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের আওতাধীন পরীক্ষণ বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের পদবি পরিবর্তনের প্রস্তাবও নাকচ করা হয়েছে। ফলে প্রস্তাবিত দুটি পদবির পরিবর্তন আপাতত কার্যকর হচ্ছে না। <Cite refs={[“turn161030search0”]}/>

রবিবার (১১ অক্টোবর) প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের জারি করা অবহিতকরণ স্মারকে বিষয়টি জানানো হয়েছে। এর আগে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে পদবি পরিবর্তনের প্রস্তাব অর্থ বিভাগে পাঠানো হয়েছিল। অর্থ বিভাগের আপত্তির কারণে সেই উদ্যোগ আর এগোতে পারেনি।

প্রাথমিক শিক্ষকদের পদবি পরিবর্তন নিয়ে যাঁরা নতুন সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় ছিলেন, তাঁদের জন্য এ চিঠি গুরুত্বপূর্ণ। তবে বিষয়টি শুধু পদবির নাম পরিবর্তনের সঙ্গে সম্পর্কিত। এ সিদ্ধান্তের মাধ্যমে শিক্ষকদের বেতন-গ্রেড, পদোন্নতি, ইনক্রিমেন্ট কিংবা অন্যান্য আর্থিক সুবিধা নিয়ে নতুন কোনো নির্দেশনা দেওয়া হয়নি।

কোন দুটি পদের নাম পরিবর্তনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল?

প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দুটি শ্রেণির শিক্ষকদের পদবি পরিবর্তনের প্রস্তাব করা হয়েছিল। প্রস্তাবিত পরিবর্তনগুলো ছিল—

বর্তমান পদবিপ্রস্তাবিত পদবি
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ‘সহকারী শিক্ষক’‘শিক্ষক’
পরীক্ষণ বিদ্যালয়ের ‘পরীক্ষণ বিদ্যালয়ের শিক্ষক’‘সহকারী ইন্সট্রাক্টর (পরীক্ষণ বিদ্যালয়)’

অর্থাৎ, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকদের পদবি থেকে ‘সহকারী’ শব্দটি বাদ দিয়ে শুধু ‘শিক্ষক’ রাখার প্রস্তাব করা হয়েছিল। অন্যদিকে, পরীক্ষণ বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের জন্য ‘সহকারী ইন্সট্রাক্টর (পরীক্ষণ বিদ্যালয়)’ পদবি নির্ধারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়।

কিন্তু অর্থ বিভাগ প্রস্তাব দুটি যৌক্তিক বলে বিবেচনা করেনি। ফলে বর্তমান পদবির পরিবর্তে নতুন পদবি কার্যকর করার বিষয়ে সম্মতি পাওয়া যায়নি। <Cite refs={[“turn161030search0”]}/>

কেন পদবি পরিবর্তনের প্রস্তাবে অসম্মতি দিল অর্থ বিভাগ?

অর্থ বিভাগের আপত্তির পেছনে প্রধানত দুটি যুক্তি রয়েছে। সংশ্লিষ্ট দাপ্তরিক পত্রে ভবিষ্যতে প্রশাসনিক জটিলতা তৈরির আশঙ্কা এবং প্রাথমিক শিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধিতে পদবি পরিবর্তনের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে।

১. বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে প্রশাসনিক জটিলতার আশঙ্কা

অর্থ বিভাগের মতে, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের আওতাধীন পরীক্ষণ বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকদের পদবি পরিবর্তন করা হলে অদূর ভবিষ্যতে বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে নতুন করে প্রশাসনিক জটিলতা দেখা দিতে পারে।

সরকারি চাকরিতে পদবি নির্ধারণের সঙ্গে নিয়োগবিধি, সাংগঠনিক কাঠামো এবং পদভিত্তিক দায়িত্বের মতো বিষয় জড়িত থাকতে পারে। তাই পদবি পরিবর্তনের প্রস্তাব মূল্যায়নের সময় এসব বিষয়ের সম্ভাব্য প্রভাব বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট পত্রের বক্তব্য থেকে বোঝা যায়।

২. শিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধিতে সরাসরি ভূমিকা রাখবে না

অর্থ বিভাগের দ্বিতীয় যুক্তি হলো, শুধু পদবির নাম পরিবর্তন করলে প্রাথমিক শিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধিতে কোনো ভূমিকা থাকবে না।

এ কারণে ‘সহকারী শিক্ষক’ পদবি পরিবর্তন করে ‘শিক্ষক’ এবং ‘পরীক্ষণ বিদ্যালয়ের শিক্ষক’ পদবি পরিবর্তন করে ‘সহকারী ইন্সট্রাক্টর (পরীক্ষণ বিদ্যালয়)’ করার প্রস্তাবকে যৌক্তিক মনে করেনি অর্থ বিভাগ।

এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, অর্থ বিভাগের আপত্তি পদবি পরিবর্তনের প্রস্তাব নিয়ে। এই বক্তব্যকে শিক্ষকদের পেশাগত অবদান, যোগ্যতা বা মর্যাদা সম্পর্কে কোনো মূল্যায়ন হিসেবে ব্যাখ্যা করা ঠিক হবে না।

কবে থেকে শুরু হয়েছিল এই উদ্যোগ?

প্রাপ্ত সংবাদসূত্র অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মে মাসে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে পদবি পরিবর্তনের প্রস্তাব অর্থ বিভাগে পাঠানো হয়েছিল। পরে সেপ্টেম্বর মাসে অর্থ বিভাগ প্রস্তাবটির বিষয়ে অসম্মতি জানায়। এরপর সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে মন্ত্রণালয় থেকে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরকে বিষয়টি জানানো হয়। <Cite refs={[“turn161030search0”]}/>

দাপ্তরিক প্রক্রিয়াটি সংক্ষেপে এভাবে দেখা যায়—

  • মে ২০২৬: পদবি পরিবর্তনের প্রস্তাব অর্থ বিভাগে পাঠানো হয়।
  • ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬: অর্থ বিভাগ প্রস্তাবটির বিষয়ে অসম্মতি জানায়।
  • সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে: মন্ত্রণালয় থেকে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরকে সিদ্ধান্তের বিষয়টি জানানো হয়।
  • ১১ অক্টোবর ২০২৬: প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর সংশ্লিষ্টদের অবহিত করে।

এই ধারাবাহিকতা থেকে বোঝা যায়, পদবি পরিবর্তনের বিষয়টি একটি প্রস্তাব হিসেবে বিবেচিত হয়েছিল। অর্থ বিভাগের সম্মতি না পাওয়ায় সেটি কার্যকর পরিবর্তনে রূপ নেয়নি।

সহকারী শিক্ষকদের ওপর কী প্রভাব পড়বে?

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, এই সিদ্ধান্তের পর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকদের চাকরিতে কী পরিবর্তন আসবে?

প্রাপ্ত পত্রের বিষয়বস্তু বিশ্লেষণ করলে কয়েকটি বিষয় স্পষ্ট হয়।

প্রথমত, পদবি পরিবর্তন হচ্ছে না। প্রস্তাবিত ‘শিক্ষক’ পদবি অর্থ বিভাগের সম্মতি পায়নি। তাই এই প্রস্তাবের ভিত্তিতে সহকারী শিক্ষকদের পদবি পরিবর্তিত হয়েছে বলে দাবি করা যাবে না।

দ্বিতীয়ত, বেতন বৃদ্ধি নিয়ে নতুন কোনো সিদ্ধান্ত নেই। পদবি পরিবর্তনের প্রস্তাবে অসম্মতি জানানোর অর্থ বেতন বৃদ্ধি বন্ধ করা বা বেতন কমিয়ে দেওয়া নয়। একইভাবে, এই পত্রের ভিত্তিতে বেতন বৃদ্ধির নিশ্চয়তাও দেওয়া যায় না।

তৃতীয়ত, পদোন্নতি ও উচ্চতর গ্রেডের বিষয়টি আলাদা। পদবি পরিবর্তন, পদোন্নতি এবং উচ্চতর গ্রেড এক বিষয় নয়। সংশ্লিষ্ট বিধিমালা ও পৃথক সরকারি আদেশের ভিত্তিতে এসব বিষয় নির্ধারিত হয়। আলোচ্য পত্রে পদোন্নতি বা উচ্চতর গ্রেড নিয়ে নতুন কোনো সিদ্ধান্ত নেই।

চতুর্থত, অন্যান্য চাকরিসুবিধা অপরিবর্তিত থাকবে কি না, তা এই পত্র দিয়ে নির্ধারণ করা যায় না। পত্রটির মূল বিষয় পদবি পরিবর্তনের প্রস্তাব। তাই অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা নিয়ে সিদ্ধান্ত জানতে সংশ্লিষ্ট বিধিমালা ও পৃথক সরকারি আদেশ দেখতে হবে।

পরীক্ষণ বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের প্রস্তাবটিও আটকে গেল

সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকদের পাশাপাশি প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের আওতাধীন পরীক্ষণ বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের পদবি পরিবর্তনের প্রস্তাবও অর্থ বিভাগের সম্মতি পায়নি।

প্রস্তাব অনুযায়ী, ‘পরীক্ষণ বিদ্যালয়ের শিক্ষক’ পদবি পরিবর্তন করে ‘সহকারী ইন্সট্রাক্টর (পরীক্ষণ বিদ্যালয়)’ করার কথা ছিল। কিন্তু প্রশাসনিক জটিলতার আশঙ্কা এবং প্রাথমিক শিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধিতে প্রস্তাবটির কার্যকারিতা নিয়ে অর্থ বিভাগের আপত্তির কারণে এ পরিবর্তনও অনুমোদিত হয়নি।

ফলে পরীক্ষণ বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের ক্ষেত্রেও প্রস্তাবিত নতুন পদবি কার্যকর হয়েছে—এমন দাবি করার সুযোগ নেই।

পদবি পরিবর্তন হলেই কি বেতন বা মর্যাদা বাড়ে?

সরকারি চাকরিতে পদবি পরিবর্তন এবং বেতন-গ্রেড পরিবর্তনকে এক করে দেখার সুযোগ নেই। কোনো পদের নাম পরিবর্তন করা হলেও সংশ্লিষ্ট সরকারি আদেশে বেতন-গ্রেড বা অন্যান্য আর্থিক সুবিধা পরিবর্তনের কথা না থাকলে শুধু নাম পরিবর্তনের কারণে সেসব সুবিধা স্বয়ংক্রিয়ভাবে পরিবর্তিত হয়েছে বলে ধরে নেওয়া যায় না।

একইভাবে, ‘সহকারী শিক্ষক’ থেকে ‘শিক্ষক’ করার প্রস্তাব অনুমোদিত হলে বেতন বৃদ্ধি বা পদোন্নতি নিশ্চিত হতো—এমন সিদ্ধান্তেও পৌঁছানো যায় না। এসব বিষয় নির্ভর করে প্রযোজ্য নিয়োগবিধি, বেতন কাঠামো এবং সরকারের পৃথক সিদ্ধান্তের ওপর।

তাই শিক্ষকদের জন্য এই সিদ্ধান্তের তাৎপর্য হলো, পদবি পরিবর্তনের উদ্যোগটি আপাতত কার্যকর হচ্ছে না। তবে তাঁদের অন্যান্য অধিকার বা সুযোগ-সুবিধা সম্পর্কে সিদ্ধান্ত জানতে সংশ্লিষ্ট বিধি ও সরকারি আদেশ বিবেচনা করতে হবে।

ভবিষ্যতে কি আবার পদবি পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া যাবে?

অর্থ বিভাগের অসম্মতির কারণে বর্তমান প্রস্তাবটি কার্যকর হচ্ছে না। ভবিষ্যতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নতুন কোনো প্রস্তাব দেবে কি না, সংশোধিত প্রস্তাব পাঠাবে কি না, কিংবা এ বিষয়ে নতুন সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে কি না—তা এখনই নিশ্চিত করে বলা যায় না।

এ বিষয়ে কোনো নতুন উদ্যোগ নেওয়া হলে তা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, অর্থ বিভাগ এবং প্রয়োজনীয় কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ও দাপ্তরিক নির্দেশনার মাধ্যমে স্পষ্ট হবে।

শেষ কথা

সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ‘সহকারী শিক্ষক’ পদবি পরিবর্তন করে ‘শিক্ষক’ এবং পরীক্ষণ বিদ্যালয়ের ‘পরীক্ষণ বিদ্যালয়ের শিক্ষক’ পদবি পরিবর্তন করে ‘সহকারী ইন্সট্রাক্টর (পরীক্ষণ বিদ্যালয়)’ করার প্রস্তাবে অর্থ বিভাগ সম্মতি দেয়নি। প্রশাসনিক জটিলতার আশঙ্কা এবং প্রাথমিক শিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধিতে পদবি পরিবর্তনের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে প্রস্তাব দুটি যৌক্তিক নয় বলে বিবেচনা করা হয়েছে।

প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর ১১ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে বিষয়টি সংশ্লিষ্টদের অবহিত করেছে। ফলে নতুন কোনো অনুমোদিত সিদ্ধান্ত না আসা পর্যন্ত প্রস্তাবিত পদবি কার্যকর হয়েছে বলে ধরে নেওয়া যাবে না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *