আজকের খবর ২০২৬

অসিয়ত বা উইল: মুসলিম ও হিন্দু আইনে সম্পত্তি বণ্টনের নিয়ম, সীমা ও গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য

মৃত্যুর আগে নিজের সম্পত্তি কীভাবে বণ্টন হবে—এ বিষয়ে কোনো ব্যক্তি যে ইচ্ছা প্রকাশ করে যান, আইনগত পরিভাষায় সেটিই উইল বা অসিয়তের সঙ্গে সম্পর্কিত। তবে মুসলিম ও হিন্দু ব্যক্তিগত আইনে এ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। বিশেষ করে মুসলিমদের ক্ষেত্রে অসিয়তের পরিমাণ, উত্তরাধিকারীর পক্ষে অসিয়ত এবং মৃত্যুর পর এর কার্যকারিতা নিয়ে নির্দিষ্ট বিধান রয়েছে।

অসিয়ত কী?

‘অসিয়ত’ আরবি শব্দ। সাধারণভাবে এর অর্থ ভবিষ্যতে দান বা মৃত্যুর পর সম্পত্তি দেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ। কোনো মুসলমান ব্যক্তি মৃত্যুর আগে তার মৃত্যুর পর সম্পত্তি কীভাবে বণ্টন বা হস্তান্তর হবে—এ বিষয়ে আইনসম্মতভাবে লিখিত বা মৌখিক ইচ্ছা প্রকাশ করলে তাকে অসিয়ত বলা হয়। প্রচলিত অর্থে অমুসলিমদের ক্ষেত্রে একই ধরনের ইচ্ছাপত্রকে উইল বলা হয়।

অসিয়তের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো—এটি সাধারণত অসিয়তকারীর মৃত্যুর পর কার্যকর হয়। জীবিত অবস্থায় অসিয়তকারী তার ইচ্ছা পরিবর্তন বা বাতিল করতে পারেন।

উইল ও হেবার মধ্যে বড় পার্থক্য

উইল বা অসিয়ত এবং দান বা হেবা এক বিষয় নয়। হেবা জীবদ্দশায় সম্পন্ন করা হয় এবং মুসলিম আইনে হেবা সম্পূর্ণ হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ, বিশেষ করে দখল হস্তান্তরের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।

অন্যদিকে অসিয়ত মৃত্যুর পর কার্যকর হয়। তাই অসিয়তকৃত সম্পত্তির দখল অসিয়তকারীর জীবদ্দশায় হস্তান্তর করা আবশ্যক নয়। একজন ব্যক্তি জীবদ্দশায় করা উইল পরবর্তী সময়ে পরিবর্তন বা বাতিলও করতে পারেন।

একই সম্পত্তি নিয়ে একাধিক উইল করা হলে সাধারণভাবে পরবর্তী বৈধ উইল আগের উইলকে বাতিল বা প্রতিস্থাপন করতে পারে—তবে বিষয়টি নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট উইলের ভাষা, বৈধতা ও প্রযোজ্য আইনের ওপর।

উইল রেজিস্ট্রি করা কি বাধ্যতামূলক?

উইল বা অসিয়ত রেজিস্ট্রি করা সব ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক নয়। তবে ইচ্ছাপত্র রেজিস্ট্রি না করলেই সেটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে অবৈধ হয়ে যায়—এমন ধারণা সঠিক নয়।

উইল রেজিস্ট্রি না করেও বৈধ হতে পারে। তবে ভবিষ্যতে বিরোধ এড়াতে উইল যথাযথভাবে প্রস্তুত করা, সাক্ষী রাখা এবং প্রয়োজনে রেজিস্ট্রেশনের বিষয়টি বিবেচনা করা গুরুত্বপূর্ণ।

মুসলিম ব্যক্তি কতটুকু সম্পত্তি অসিয়ত করতে পারেন?

মুসলিম আইনে অসিয়তের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সীমাবদ্ধতা হলো এক-তৃতীয়াংশের নীতি

সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী, কোনো মুসলিম ব্যক্তি তার মৃত্যুর পর রেখে যাওয়া নিট সম্পত্তির এক-তৃতীয়াংশ পর্যন্ত উত্তরাধিকারী নন—এমন ব্যক্তির জন্য অসিয়ত করতে পারেন। এক-তৃতীয়াংশের বেশি অসিয়ত করতে চাইলে সংশ্লিষ্ট উত্তরাধিকারীদের সম্মতির প্রশ্ন আসে।

অন্যদিকে, কোনো উত্তরাধিকারীর পক্ষে অসিয়ত করার ক্ষেত্রে আলাদা বিধান প্রযোজ্য। উত্তরাধিকারীদের অধিকার ক্ষুণ্ন করে শুধু উইল করে সম্পত্তির বণ্টন পরিবর্তন করা যায় না। এ ধরনের বিষয়ে উত্তরাধিকারীদের সম্মতি এবং প্রযোজ্য মুসলিম ব্যক্তিগত আইনের বিধান গুরুত্বপূর্ণ।

তাই ‘মুসলিম ব্যক্তি সবসময় তার সম্পত্তির এক-তৃতীয়াংশের বেশি উইল করতে পারেন না’—এভাবে বিষয়টি সরলীকরণ না করে কাকে অসিয়ত করা হচ্ছে এবং উত্তরাধিকারীদের সম্মতি আছে কি না, সেটিও দেখতে হবে।

কার নামে অসিয়ত করা যায়?

সাধারণভাবে অসিয়ত ব্যক্তির উদ্দেশ্যে যেমন করা যায়, তেমনি ধর্মীয় বা জনকল্যাণমূলক উদ্দেশ্যেও করা যেতে পারে।

ব্যক্তির উদ্দেশ্যে করা অসিয়তকে আবার প্রধানত দুইভাবে দেখা যায়—

১. ওয়ারিশের নামে অসিয়ত
২. ওয়ারিশ নন এমন ব্যক্তির নামে অসিয়ত

দুই ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য ব্যক্তিগত আইন ও উত্তরাধিকারীদের অধিকার বিবেচনা করা জরুরি।

হিন্দু ব্যক্তির উইলের ক্ষেত্রে কী নিয়ম?

হিন্দু ব্যক্তির ক্ষেত্রে উইলের মাধ্যমে সম্পত্তি বণ্টনের বিষয়ে মুসলিম অসিয়তের এক-তৃতীয়াংশ সীমা প্রযোজ্য নয়। সাধারণভাবে একজন হিন্দু ব্যক্তি তার উইলযোগ্য সম্পত্তি সম্পর্কে উইলের মাধ্যমে ইচ্ছা প্রকাশ করতে পারেন। তবে সম্পত্তির প্রকৃতি, মালিকানা, প্রযোজ্য উত্তরাধিকার আইন এবং অন্যান্য আইনগত সীমাবদ্ধতা বিবেচনা করতে হবে।

উইল কার্যকর করার পর কোনো বিরোধ দেখা দিলে আদালতের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কিছু ক্ষেত্রে প্রবেট (Probate) বা আদালতের আনুষ্ঠানিক অনুমোদনের প্রয়োজন হতে পারে। প্রবেটকে সহজভাবে উইলের বৈধতা সম্পর্কে আদালতের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি হিসেবে বোঝানো যায়।

অসিয়তের গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য

অসিয়তের কয়েকটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য হলো—

  • অসিয়তকারীর মৃত্যুর পর এটি কার্যকর হয়।
  • মুসলিম আইনে উত্তরাধিকারী নন এমন ব্যক্তির জন্য সাধারণত এক-তৃতীয়াংশ পর্যন্ত অসিয়ত করা যায়।
  • সুস্থ মস্তিষ্কসম্পন্ন সক্ষম ব্যক্তি অসিয়ত করতে পারেন।
  • অসিয়তকারীর ইচ্ছা স্পষ্ট ও নির্দিষ্ট হওয়া প্রয়োজন।
  • জীবিত অবস্থায় অসিয়ত পরিবর্তন বা বাতিল করার সুযোগ থাকে।
  • ব্যক্তিগত বা ধর্মীয় উদ্দেশ্যেও অসিয়ত করা যেতে পারে।
  • উইল ও অসিয়তের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য আইন ধর্ম ও সম্পত্তির ধরন অনুযায়ী ভিন্ন হতে পারে।

কেন সতর্কভাবে উইল বা অসিয়ত করা জরুরি?

সম্পত্তি নিয়ে মৃত্যুর পর পারিবারিক বিরোধের অন্যতম কারণ হলো অস্পষ্ট বা ত্রুটিপূর্ণ উইল। কে কতটুকু সম্পত্তি পাবেন, কোন সম্পত্তি কার নামে দেওয়া হচ্ছে, অসিয়তকারী সম্পত্তিটির বৈধ মালিক কি না এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির উত্তরাধিকারী হওয়ার অধিকার আছে কি না—এসব বিষয় পরিষ্কার থাকা জরুরি।

বিশেষ করে মুসলিম ব্যক্তির ক্ষেত্রে এক-তৃতীয়াংশের সীমা, উত্তরাধিকারীর পক্ষে অসিয়ত এবং অন্যান্য উত্তরাধিকারীর সম্মতির বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

তাই শুধু সাদা কাগজে সম্পত্তি কাউকে দিয়ে যাওয়ার ইচ্ছা লিখে রাখলেই সব ক্ষেত্রে তা কার্যকর হবে—এমন ধারণা ঠিক নয়। উইল বা অসিয়ত তৈরির আগে সম্পত্তির মালিকানা, উত্তরাধিকারী এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিগত আইন যাচাই করে নেওয়া নিরাপদ।

সারকথা, উইল বা অসিয়ত হলো মৃত্যুর পর সম্পত্তি নিয়ে ব্যক্তির ইচ্ছা প্রকাশের একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনগত মাধ্যম। তবে মুসলিম ও হিন্দু আইনে এর নিয়ম এক নয়। বিশেষ করে মুসলিমদের ক্ষেত্রে এক-তৃতীয়াংশের সীমা এবং উত্তরাধিকারীর পক্ষে অসিয়তের বিধান বুঝে সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন। ফলে সম্পত্তি বণ্টন নিয়ে ভবিষ্যৎ বিরোধ এড়াতে আইনজীবীর পরামর্শ নিয়ে সঠিকভাবে উইল বা অসিয়ত প্রস্তুত করাই সবচেয়ে নিরাপদ পথ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *