আজকের খবর ২০২৬

ওসিয়তনামা বা উইল কীভাবে লিখবেন, কী কী তথ্য থাকবে—জেনে নিন পূর্ণ নমুনা

মৃত্যুর পর নিজের সম্পত্তি কীভাবে বণ্টন হবে, কার কাছে কী থাকবে কিংবা কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে দান করা হবে কি না—এসব বিষয়ে জীবদ্দশায় নিজের ইচ্ছা লিখিতভাবে রেখে যাওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হলো ওসিয়তনামা বা উইল। তবে ওসিয়ত করার ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত আইন, সম্পত্তির ধরন এবং উত্তরাধিকারীদের অধিকার বিবেচনা করা জরুরি।

বিশেষ করে মুসলিম ব্যক্তির ক্ষেত্রে ওসিয়ত করার সময় সম্পত্তির কতটুকু অংশ ওসিয়ত করা যাবে—এ বিষয়ে ইসলামী উত্তরাধিকার আইনের বিধান গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণভাবে, ওয়ারিশদের সম্মতি ছাড়া এক-তৃতীয়াংশের বেশি সম্পত্তির ওসিয়ত কার্যকর হয় না। আবার কোনো বৈধ ওয়ারিশের পক্ষে ওসিয়ত করার ক্ষেত্রেও অন্য ওয়ারিশদের সম্মতির বিষয়টি সামনে আসে।

তাই শুধু একটি সাধারণ ফরম পূরণ করলেই সব ক্ষেত্রে তা কার্যকর হবে—এমনটি ধরে নেওয়া ঠিক নয়।

ওসিয়তনামায় যেসব তথ্য থাকা উচিত

প্রচলিত একটি ওসিয়তনামার নমুনায় প্রথমেই থাকে ‘ওসিয়তনামা/শেষ ইচ্ছাপত্র’ শিরোনাম। এরপর ওসিয়তকারীর পূর্ণ পরিচয় দিতে হয়।

এ অংশে সাধারণত থাকতে পারে—

  • নাম
  • পিতার নাম
  • মাতার নাম
  • জন্ম তারিখ
  • জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর
  • পাসপোর্ট নম্বর, যদি থাকে
  • বর্তমান ও স্থায়ী ঠিকানা
  • পেশা

এর পাশাপাশি ওসিয়তকারী সুস্থ মস্তিষ্কে, স্বজ্ঞানে এবং কোনো ধরনের চাপ বা প্ররোচনা ছাড়া ওসিয়তটি করছেন—এমন ঘোষণা রাখা যেতে পারে।

আগের কোনো উইল থাকলে কী হবে

ওসিয়তকারী আগে কোনো ওসিয়ত বা ইচ্ছাপত্র করে থাকলে নতুন ওসিয়তনামায় আগেরটি বাতিল করার ঘোষণা রাখা যেতে পারে। এতে সর্বশেষ ইচ্ছাপত্রটি কোনটি—তা নিয়ে ভবিষ্যৎ বিরোধের ঝুঁকি কমানো সম্ভব হতে পারে।

পরিবারের সদস্যদের তথ্যও রাখা যায়

ওসিয়তনামায় স্ত্রী বা স্বামী, পুত্র, কন্যা এবং অন্যান্য নির্ভরশীল ব্যক্তির নাম, জন্ম তারিখ বা NID নম্বর উল্লেখের ব্যবস্থা রাখা যেতে পারে।

এ তথ্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সম্পত্তি বণ্টনের ক্ষেত্রে সম্ভাব্য উত্তরাধিকারীদের পরিচয় ও পারিবারিক সম্পর্ক জানা প্রয়োজন হতে পারে।

ঋণ ও দায়-দেনার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ

ওসিয়তনামায় শুধু সম্পত্তি কারা পাবেন তা লিখলেই যথেষ্ট নয়। ওসিয়তকারীর মৃত্যুর পর তার বৈধ ঋণ ও দায়-দেনার বিষয়টিও উল্লেখ করা যেতে পারে।

নমুনা ফরম্যাটে দাফন বা সৎকারের খরচ, বৈধ ঋণ, বকেয়া কর, জাকাত বা অন্যান্য দেনা পরিশোধের কথা রাখা হয়েছে।

এ জন্য পাওনাদারের নাম, টাকার পরিমাণ এবং ঋণের বিবরণ লেখার জন্য আলাদা জায়গাও রাখা যেতে পারে।

স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তির পূর্ণ বিবরণ

ওসিয়তের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলোর একটি হলো সম্পত্তির বিবরণ। এতে সম্পত্তিকে সাধারণত দুই ভাগে উল্লেখ করা যায়।

স্থাবর সম্পত্তি

যেমন—

  • জমি
  • বাড়ি
  • ফ্ল্যাট

এ ক্ষেত্রে সম্পত্তির অবস্থান, দলিল বা খতিয়ান নম্বর এবং আনুমানিক মূল্য উল্লেখ করা যেতে পারে।

অস্থাবর সম্পত্তি

এর মধ্যে থাকতে পারে—

  • ব্যাংক হিসাব
  • সঞ্চয়পত্র
  • স্বর্ণালংকার
  • যানবাহন
  • ব্যবসায়িক শেয়ার
  • অন্যান্য আর্থিক বা মূল্যবান সম্পদ

সম্পত্তির ধরন, বিবরণ এবং আনুমানিক মূল্য উল্লেখ করলে পরবর্তীতে সম্পত্তি শনাক্ত করা সহজ হতে পারে।

ওসিয়তের মূল অংশে কী লিখবেন

ওসিয়তনামার মূল অংশে ওসিয়তকারী তার ইচ্ছা স্পষ্টভাবে লিখবেন। যেমন—কোন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে কত অংশ বা কত টাকা দেওয়া হবে, কোনো মসজিদ-মাদ্রাসা বা প্রতিষ্ঠানে কী পরিমাণ অর্থ বা সম্পত্তি দান করা হবে কিংবা ব্যক্তিগত জিনিসপত্র কে পাবেন।

ব্যাংক হিসাব থেকে নির্দিষ্ট কোনো অর্থ দেওয়ার ইচ্ছা থাকলে সেটিও উল্লেখ করা যেতে পারে।

তবে মুসলিম ব্যক্তির ক্ষেত্রে এসব নির্দেশনা দেওয়ার সময় এক-তৃতীয়াংশের সীমা এবং ওয়ারিশদের আইনগত অধিকার অবশ্যই বিবেচনায় নিতে হবে।

অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্তানের জন্য অভিভাবক মনোনয়ন

ওসিয়তকারীর অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্তান থাকলে তাদের দেখাশোনার জন্য কোনো ব্যক্তিকে অভিভাবক হিসেবে মনোনীত করার ইচ্ছা ওসিয়তনামায় উল্লেখ করা যেতে পারে।

এ ক্ষেত্রে মনোনীত ব্যক্তির—

  • নাম
  • সম্পর্ক
  • ঠিকানা

উল্লেখ করার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

তবে অভিভাবকত্বের চূড়ান্ত আইনগত কার্যকারিতা প্রযোজ্য আইন ও আদালতের এখতিয়ারের ওপর নির্ভর করতে পারে।

নির্বাহী বা Executor নিয়োগ

ওসিয়ত বাস্তবায়নের দায়িত্ব দেওয়ার জন্য একজন নির্বাহী (Executor) মনোনয়ন করা যেতে পারে।

তার নাম, পিতার নাম, ঠিকানা ও মোবাইল নম্বর উল্লেখ করা যায়। ওসিয়তকারীর ইচ্ছা অনুযায়ী সম্পত্তি বণ্টন, ঋণ পরিশোধ এবং প্রয়োজনীয় আইনগত কাজ সম্পন্ন করার দায়িত্ব তার ওপর দেওয়ার কথা উল্লেখ করা যেতে পারে।

বিশেষ নির্দেশনাও রাখা যায়

ওসিয়তকারীর জানাজা বা সৎকার, পারিবারিক বিষয় কিংবা কোনো বিশেষ ধর্মীয় বা ব্যক্তিগত নির্দেশনা থাকলে তা আলাদাভাবে উল্লেখ করা যেতে পারে।

তবে এ ধরনের নির্দেশনাও যেন প্রচলিত আইন বা অন্যের আইনগত অধিকারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখা প্রয়োজন।

সাক্ষী ও স্বাক্ষর

ওসিয়তনামার শেষে ওসিয়তকারীর স্বাক্ষর, নাম, তারিখ ও স্থান উল্লেখের ব্যবস্থা থাকা উচিত। একই সঙ্গে সাক্ষীদের নাম, পিতার নাম, ঠিকানা, NID নম্বর এবং স্বাক্ষর রাখা যেতে পারে।

প্রদত্ত নমুনায় দুইজন সাক্ষীর জন্য আলাদা জায়গা রাখা হয়েছে। প্রত্যেক পাতায় ওসিয়তকারী ও সাক্ষীদের স্বাক্ষর রাখা ভবিষ্যতে নথির সত্যতা নিয়ে বিরোধ কমাতে সহায়ক হতে পারে।

নোটারি বা রেজিস্ট্রেশন কি করা যায়?

নমুনা ফরম্যাটে নোটারি পাবলিকের নাম, সিল-স্বাক্ষর এবং রেজিস্ট্রেশন সংক্রান্ত তথ্য রাখার জায়গাও রয়েছে। ওসিয়তকে যথাযথভাবে সংরক্ষণ ও প্রমাণের সুবিধার জন্য আইনজীবীর পরামর্শ নিয়ে উপযুক্ত পদ্ধতি অনুসরণ করা ভালো।

তবে নোটারি করলেই ওসিয়তের সব বিষয় স্বয়ংক্রিয়ভাবে বৈধ হয়ে যায়—এমন নয়। বিশেষ করে জমি, বাড়ি, ফ্ল্যাট, ব্যাংক আমানত বা বড় অঙ্কের সম্পত্তি থাকলে সংশ্লিষ্ট আইন ও ব্যক্তিগত আইনের বিধান যাচাই করা জরুরি।

মুসলিমদের ওসিয়তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়

বাংলাদেশে মুসলিম ব্যক্তির ওসিয়তের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো উত্তরাধিকারীদের অধিকার এবং এক-তৃতীয়াংশের বিধান। সাধারণভাবে, ওয়ারিশদের সম্মতি ছাড়া এক-তৃতীয়াংশের বেশি সম্পত্তি ওসিয়ত করা যায় না।

অন্যদিকে, কোনো ওয়ারিশের পক্ষে ওসিয়ত করার বিষয়েও আলাদা আইনগত ও শরিয়তি প্রশ্ন রয়েছে। ফলে নিজের ইচ্ছামতো সম্পত্তির পুরোটা কোনো একজনকে দিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে তা পরবর্তীতে উত্তরাধিকারীদের সঙ্গে বিরোধ সৃষ্টি করতে পারে।

আইনজীবীর পরামর্শ কেন গুরুত্বপূর্ণ

সাধারণ নমুনা দেখে ওসিয়তনামা তৈরি করা গেলেও জটিল সম্পত্তি, একাধিক উত্তরাধিকারী, অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্তান, ঋণ, ব্যবসায়িক শেয়ার বা বড় ধরনের জমি-জমা থাকলে আইনজীবীর মাধ্যমে চূড়ান্ত খসড়া তৈরি করা নিরাপদ

কারণ একটি ওসিয়তনামার কার্যকারিতা শুধু সেখানে কী লেখা হয়েছে তার ওপর নয়; বরং ওসিয়তকারীর ব্যক্তিগত আইন, সম্পত্তির মালিকানা, উত্তরাধিকারীদের অধিকার এবং প্রযোজ্য আইনগত প্রক্রিয়ার ওপরও নির্ভর করে।

সুতরাং, ওসিয়তনামা করার আগে সম্পত্তির পূর্ণ তালিকা তৈরি, উত্তরাধিকারীদের তথ্য সংরক্ষণ এবং প্রযোজ্য আইন যাচাই করা উচিত। বিশেষ করে মুসলিমদের ক্ষেত্রে এক-তৃতীয়াংশের সীমা ও ওয়ারিশদের অধিকার সম্পর্কে নিশ্চিত না হয়ে চূড়ান্ত ওসিয়ত করা উচিত নয়।

ওসিয়তনামা বা উইল কীভাবে লিখবেন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *