জমির মালিকানা ও দখল ঠিক থাকার পরও অনেক সময় অসাবধানতাবশত বা জরিপকারীদের ভুলের কারণে চূড়ান্তভাবে প্রকাশিত খতিয়ান বা রেকর্ডে ভুল চলে আসে। কখনো বাবার নামের বানান ভুল হয়, কখনো অংশ বা দাগ নম্বরে ভুল থাকে, আবার কখনো মূল মালিকের জায়গায় অন্য কারও নাম লিপিবদ্ধ হয়ে যায়। তবে এ নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী অত্যন্ত সহজ পদ্ধতিতে এই ‘করণিক ভুল’ (Clerical Mistake) এবং ‘প্রতারণামূলক লিখন’ (Fraudulent Entry) সংশোধন করা সম্ভব।
ভুল সংশোধনের আইনি ভিত্তি, আবেদনের প্রক্রিয়া এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে একটি বিস্তারিত নির্দেশিকা তুলে ধরা হলো:
আইন কী বলে?
The State Acquisition and Tenancy Act, 1950 এর ৪৩ ধারা এবং প্রজাস্বত্ব বিধিমালা, ১৯৫৫ এর বিধি ২৩ (উপবিধি ৩) অনুযায়ী, চূড়ান্তভাবে প্রকাশিত রেকর্ডের যেকোনো করণিক ভুল সংশোধনের পূর্ণ এখতিয়ার রয়েছে সংশ্লিষ্ট রাজস্ব কর্মকর্তার, যিনি বর্তমানে সহকারী কমিশনার (ভূমি) বা এসি ল্যান্ড (AC Land) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
এছাড়া, কোনো প্রতারণামূলক লিখনের মাধ্যমে রেকর্ড ভুল হলে প্রজাস্বত্ব বিধিমালা, ১৯৫৫ এর বিধি ২৩ (উপবিধি ৪) অনুযায়ী এসি ল্যান্ড প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারেন।
সহকারী কমিশনার (ভূমি) কোন কোন ভুল সংশোধন করতে পারেন?
সাধারণত যেসব ভুলকে ‘করণিক ভুল’ হিসেবে বিবেচনা করে এসি ল্যান্ড অফিস সংশোধন করতে পারে, সেগুলো হলো:
নামের বানান বা বাবার নামের ভুল।
অংশ বা হিস্যা বসানোর হিসাবের ভুল।
দাগসূচিতে (Plot Index) ভুল।
মৌজা ম্যাপের সাথে রেকর্ডের গরমিল।
জরিপ চলাকালীন বাবার মৃত্যুর কারণে সন্তানদের নামে রেকর্ড হওয়ার কথা থাকলেও, ভুলবশত বা অজ্ঞাত কারণে তা মৃত বাবার নামে রেকর্ড হওয়া ইত্যাদি।
সংশোধন প্রক্রিয়া: যেভাবে কাজটি সম্পন্ন হয়
খতিয়ানের ভুল সংশোধনের পুরো প্রক্রিয়াটি সাধারণত ৩০ থেকে ৩৫ দিনের মধ্যে সম্পন্ন হয়ে থাকে। প্রক্রিয়াটি নিচে দেওয়া হলো:
১. আবেদন ও প্রতিবেদন: ভুক্তভোগী জমির মালিক নিজে আবেদন করার পর অথবা প্রজাস্বত্ব বিধিমালার ২২(১) বিধি অনুযায়ী ইউনিয়ন ভূমি অফিস থেকে করণিক ভুল সংশোধনের প্রতিবেদন প্রাপ্তির পর এসি ল্যান্ড কার্যক্রম শুরু করেন।
২. নথিপত্র যাচাই: এসি ল্যান্ড পূর্ববর্তী জরিপের কাগজপত্র, প্রাথমিক খাজনা বিবরণী, কালেক্টরের দপ্তরে সংরক্ষিত খতিয়ানের কপি এবং ২ নং রেজিস্টার পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পর্যালোচনা করেন।
৩. নোটিশ ও শুনানি: ইউনিয়ন ভূমি অফিস থেকে প্রতিবেদন আসার পর, যার নামে খতিয়ানে ভুল এসেছে বা সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে নোটিশ পাঠানো হয়। একটি নির্দিষ্ট তারিখে উভয় পক্ষের শুনানি গ্রহণ করা হয় এবং দাখিলকৃত নথিপত্র যাচাই করা হয়।
৪. চূড়ান্ত আদেশ ও সংশোধন: শুনানিতে কোনো আপত্তি না থাকলে এবং কাগজপত্র সঠিক পাওয়া গেলে এসি ল্যান্ড রেকর্ড সংশোধনের চূড়ান্ত আদেশ দেন। এই আদেশ অনুযায়ী ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা সংশোধিত খতিয়ান প্রস্তুত করেন এবং কানুনগো প্রয়োজনীয় রেকর্ড সংশোধন করে সংশোধিত লিপি সংশ্লিষ্ট পক্ষকে প্রদান করেন।
আবেদনের সাথে যা যা জমা দিতে হবে (প্রয়োজনীয় নথিপত্র)
একটি সঠিক ও পূর্ণাঙ্গ আবেদনের জন্য নিচে উল্লেখিত কাগজপত্রগুলোর সত্যায়িত ফটোকপি বা সার্টিফাইড কপি জমা দিতে হবে:
খতিয়ানের কপি: সর্বশেষ নামজারি, সিএস (CS), আরএস (RS), এসএ (SA) এবং বিএস (BS) খতিয়ানের সার্টিফাইড বা সত্যায়িত কপি।
মৌজা ম্যাপ: সংশ্লিষ্ট মৌজার এসএ এবং বিএস মৌজা ম্যাপ।
দলিলপত্র: মূল দলিলের সার্টিফাইড কপি এবং সর্বশেষ জরিপের পর থেকে মালিকানা হস্তান্তরের ভায়া বা পিট দলিল (প্রযোজ্য ক্ষেত্রে)।
মাঠপর্চা: বিএস জরিপের মাঠপর্চা ও ডিপি (DP) খতিয়ান।
কর পরিশোধের প্রমাণ: হালনাগাদ ভূমি উন্নয়ন কর (খাজনা) পরিশোধের দাখিলা বা রসিদ।
ওয়ারিশ সনদ: অনধিক ৩ মাসের মধ্যে ইস্যু করা ওয়ারিশ কায়েম সনদপত্র (যদি প্রযোজ্য হয়)।
আদালতের রায় (যদি থাকে): জমি সংক্রান্ত আদালতের কোনো রায়, আদেশ বা ডিক্রি থাকলে তার সার্টিফাইড কপি এবং আরজির (Plaint) সার্টিফাইড কপি।
পরামর্শ: জমির খতিয়ানে ভুল ধরা পড়ার সাথে সাথেই প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহ করে দ্রুত সংশ্লিষ্ট উপজেলা বা সার্কেল ভূমি অফিসে (এসি ল্যান্ড অফিস) যোগাযোগ করুন। সঠিক নথিপত্র জমা দিলে আইনি নিয়ম মেনেই খুব অল্প সময়ে আপনার মূল্যবান সম্পত্তির রেকর্ড সংশোধন সম্ভব।
