সরকারি ও বেসরকারি স্কুলে শিক্ষার্থী ভর্তি নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে। স্কুলে ভর্তি পরীক্ষা বাতিলের দাবিতে করা একটি রিট হাইকোর্টের অবকাশকালীন বেঞ্চের কার্যতালিকা থেকে বাদ পড়েছে বলে প্রকাশিত তথ্যে জানা গেছে। ১৪ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে রিটটি Out of List করা হয় এবং নিয়মিত বেঞ্চে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয় বলে দাবি করা হচ্ছে। অবকাশ শেষে ২৫ অক্টোবরের পর বিষয়টি শুনানির জন্য উঠতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, স্কুলে ভর্তির ক্ষেত্রে লটারি পদ্ধতি থাকবে, নাকি পরীক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থী নির্বাচন করা হবে? আপাতত প্রচারিত তথ্য অনুযায়ী, প্রথম শ্রেণিতে লটারি এবং দ্বিতীয় থেকে নবম শ্রেণিতে ভর্তি পরীক্ষার বর্তমান ব্যবস্থায় তাৎক্ষণিক কোনো পরিবর্তন আসেনি। তবে আদালতের চূড়ান্ত শুনানি ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক নির্দেশনা ছাড়া ভর্তি-পদ্ধতি নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না।
এক নজরে হাইকোর্টের সিদ্ধান্ত
আদেশের তারিখ
১৪ অক্টোবর ২০২৬
আদালত
বিচারপতি এস এম মনিরুজ্জামান ও বিচারপতি এস এম ইফতেখার উদ্দিন মাহমুদের হাইকোর্ট বেঞ্চ।
আদালতের পদক্ষেপ
রিটটি কার্যতালিকা থেকে বাদ দিয়ে অবকাশ শেষে নিয়মিত বেঞ্চে উপস্থাপনের নির্দেশনা।
বর্তমান ভর্তি-পদ্ধতি
প্রথম শ্রেণিতে লটারি এবং দ্বিতীয় থেকে নবম শ্রেণিতে ভর্তি পরীক্ষা—এটাই প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী প্রচলিত ব্যবস্থা।
সূত্র: আজকের পত্রিকা, জাগো নিউজ ও বাংলা ট্রিবিউনের ১৪ অক্টোবরের প্রতিবেদন।
কেন স্কুলে ভর্তি পরীক্ষা বাতিলের দাবিতে রিট করা হয়েছিল?
২০২৭ শিক্ষাবর্ষে সরকারি ও বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে দ্বিতীয় থেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত ভর্তি পরীক্ষা নেওয়ার সরকারি সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করে গত ৭ অক্টোবর হাইকোর্টে রিটটি দায়ের করা হয়।
রিটকারী সংগঠন মুভমেন্ট ফর হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড গুড গভর্ন্যান্স ফাউন্ডেশন। সংগঠনটির নির্বাহী পরিচালক মিনহাজ উদ্দিন আহমেদ রিটটি করেন। মামলায় শিক্ষা সচিব, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা সচিব, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালকসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিবাদী করা হয়েছে।
রিটের পেছনে মূল বিতর্ক হলো—ভর্তি পরীক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থী নির্বাচন করা হবে, নাকি লটারির মাধ্যমে ভর্তির সুযোগ দেওয়া হবে?
এই বিতর্কে দুই ধরনের উদ্বেগ রয়েছে। একদিকে ভর্তি পরীক্ষার সমর্থকেরা মেধা যাচাইয়ের বিষয়টি গুরুত্ব দিতে পারেন। অন্যদিকে লটারি পদ্ধতির সমর্থকদের আশঙ্কা, ভর্তি পরীক্ষার প্রতিযোগিতা শিক্ষার্থীদের ওপর মানসিক চাপ বাড়াতে পারে এবং কোচিংনির্ভরতা ও আর্থিক বৈষম্য তৈরি করতে পারে। রিটকারীর পক্ষ থেকেও বৈষম্য ও কোচিং ব্যবসা বাড়ার আশঙ্কা তুলে ধরা হয়েছে।
তবে এসব যুক্তির কোনটি আদালত গ্রহণ করবেন, তা শুনানি ও বিচারিক সিদ্ধান্তের বিষয়।
‘Out of List’ হওয়ার অর্থ কী?
এই মামলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আইনি দিক হলো, রিটটি কার্যতালিকা থেকে বাদ পড়েছে; কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে আদালত ভর্তি পরীক্ষা বাতিলের আবেদন খারিজ করে দিয়েছেন।
Out of List বলতে এখানে মামলাটি ওই সময়ের শুনানির কার্যতালিকা থেকে সরিয়ে রাখাকে বোঝানো হয়েছে। আইনজীবী জাহিদ তালুকদারের বক্তব্য অনুযায়ী, অবকাশকালীন ছুটি শেষে নিয়মিত বেঞ্চে রিটটি উপস্থাপন করে শুনানির চেষ্টা করা হবে।
এ কারণে তিনটি বিষয় আলাদা করে বোঝা প্রয়োজন:
রিটের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি: প্রকাশিত প্রতিবেদনে এমন কোনো সিদ্ধান্তের কথা বলা হয়নি।
ভর্তি পরীক্ষা বাতিল: আদালত পরীক্ষার বিধান বাতিল করেছেন—এমন তথ্য নেই।
পরবর্তী শুনানি: অবকাশ শেষে নিয়মিত বেঞ্চে বিষয়টি তোলার সুযোগ রয়েছে; তবে নির্দিষ্ট দিনে শুনানি হবে কি না, তা নিশ্চিত নয়।
অর্থাৎ, রিটটি কার্যতালিকা থেকে বাদ পড়েছে বলে ভর্তি পরীক্ষা চিরতরে বহাল থাকবে—এমন সিদ্ধান্তেও পৌঁছানো যাবে না। আবার রিটের কারণে ভর্তি পরীক্ষা স্থগিত হয়েছে, এমন দাবিও সমর্থিত নয়।
প্রথম শ্রেণিতে লটারি, দ্বিতীয় থেকে নবম শ্রেণিতে পরীক্ষা কেন?
প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী, ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের ভর্তি নীতিতে প্রথম শ্রেণিতে লটারির মাধ্যমে শিক্ষার্থী নির্বাচন এবং দ্বিতীয় থেকে নবম শ্রেণিতে ভর্তি পরীক্ষার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
২০২১ শিক্ষাবর্ষে করোনাভাইরাস পরিস্থিতির মধ্যে সরকারি বিদ্যালয়ে প্রথম থেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত ভর্তিতে ডিজিটাল লটারি পদ্ধতি চালু করা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে সরকার লটারি পদ্ধতি পরিবর্তন করে দ্বিতীয় থেকে নবম শ্রেণিতে পরীক্ষা নেওয়ার সিদ্ধান্ত জানায়।
এ নিয়ে নতুন করে আইনি প্রশ্ন ওঠার কারণ হলো, ভর্তি-পদ্ধতি পরিবর্তনের ফলে শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও বিদ্যালয়গুলোকে প্রস্তুতির ধরন বদলাতে হতে পারে।
লটারি পদ্ধতিতে নির্ধারিত যোগ্যতা ও শর্ত পূরণের পর নির্বাচনের ক্ষেত্রে দৈবচয়ন গুরুত্বপূর্ণ। অন্যদিকে ভর্তি পরীক্ষায় শিক্ষার্থীর পরীক্ষার ফল ও নির্ধারিত নির্বাচনী মানদণ্ড গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। দুই পদ্ধতির সুবিধা ও সীমাবদ্ধতা আলাদা; কোনটি বেশি ন্যায়সংগত, তা নির্ভর করে স্বচ্ছতা, সুযোগের সমতা, বাস্তবায়ন এবং শিক্ষার্থীদের ওপর প্রভাবের মতো বিষয়গুলোর ওপর।
অবকাশ শেষে ২৫ অক্টোবরের পর কী হতে পারে?
প্রকাশিত প্রতিবেদনে অবকাশ শেষে নিয়মিত বেঞ্চে রিটটি উপস্থাপন করে শুনানির চেষ্টা করার কথা বলা হয়েছে। কিছু প্রতিবেদনে ২৫ অক্টোবর থেকে নিয়মিত আদালত বসার তথ্যও উল্লেখ করা হয়েছে।
পরবর্তী পর্যায়ে কয়েকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে:
1. নিয়মিত বেঞ্চে রিটটি শুনানির জন্য গ্রহণ করা হয় কি না।
2. আদালত সরকারের সিদ্ধান্তের বৈধতা সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য শুনতে চান কি না।
3. ভর্তি পরীক্ষা বা লটারি পদ্ধতি নিয়ে কোনো অন্তর্বর্তী নির্দেশনা দেওয়া হয় কি না।
4. সংশ্লিষ্ট শিক্ষা কর্তৃপক্ষ ভর্তি কার্যক্রমের জন্য নতুন কোনো বিজ্ঞপ্তি বা নির্দেশনা প্রকাশ করে কি না।
এগুলো সম্ভাব্য পরবর্তী ধাপ, আদালতের ঘোষিত চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নয়। শুনানির তারিখ, মামলার অগ্রগতি এবং কোনো অন্তর্বর্তী আদেশের বিষয়ে আদালত বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক তথ্যই চূড়ান্ত বলে বিবেচিত হবে।
অভিভাবকদের এখন কী করা উচিত?
ভর্তি-পদ্ধতি নিয়ে আইনি প্রক্রিয়া চলমান থাকলেও অভিভাবকদের উচিত সন্তানদের প্রস্তুতি বন্ধ না করা। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত কোনো পোস্ট দেখে ভর্তি পরীক্ষা বাতিল হয়েছে বা লটারি আবার সব শ্রেণিতে চালু হচ্ছে—এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক হবে না।
অভিভাবকেরা আপাতত নিচের বিষয়গুলো অনুসরণ করতে পারেন:
সংশ্লিষ্ট শিক্ষা কর্তৃপক্ষের ভর্তি বিজ্ঞপ্তি ও নির্দেশনা নিয়মিত দেখা।
সন্তানের কাঙ্ক্ষিত বিদ্যালয়ের ভর্তি-সংক্রান্ত ঘোষণা অনুসরণ করা।
আদালতের পরবর্তী আদেশ সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন যাচাই করা।
ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি নেওয়ার পাশাপাশি সম্ভাব্য নীতিগত পরিবর্তনের খবর রাখা।
এতে শেষ মুহূর্তে সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের কারণে অপ্রয়োজনীয় বিভ্রান্তি কমবে।
লটারি নাকি ভর্তি পরীক্ষা—কোনটি ভালো?
এই প্রশ্নের উত্তর শুধু অভিভাবকের পছন্দের ওপর নির্ভর করে না। একটি কার্যকর ভর্তি-পদ্ধতিতে শিক্ষার্থীদের সমান সুযোগ, নির্বাচনের স্বচ্ছতা, আর্থিক বৈষম্য কমানো এবং শিক্ষার মান—সবগুলো বিষয় বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন।
লটারি পদ্ধতির সম্ভাব্য সুবিধা: পরীক্ষাকেন্দ্রিক চাপ কমানো, কোচিংয়ের প্রয়োজনীয়তা সীমিত করা এবং নির্ধারিত যোগ্যতা পূরণকারী শিক্ষার্থীদের মধ্যে দৈবচয়নের সুযোগ তৈরি করা।
ভর্তি পরীক্ষার সম্ভাব্য সুবিধা: পরীক্ষার মাধ্যমে নির্ধারিত মানদণ্ডে শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ন এবং সীমিত আসনের বিপরীতে প্রতিযোগিতার সুযোগ তৈরি করা।
তবে লটারি থাকলেই সব ধরনের বৈষম্য দূর হবে, কিংবা পরীক্ষা নিলেই মেধার সঠিক মূল্যায়ন নিশ্চিত হবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। ভর্তি-পদ্ধতির পাশাপাশি বিদ্যালয়ের আসনসংখ্যা, শিক্ষার মান, প্রশ্নপত্রের মান, পরীক্ষার স্বচ্ছতা এবং কোচিংনির্ভরতার বিষয়ও বিবেচনা করতে হবে।
শেষ কথা
১৪ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে স্কুলে ভর্তি পরীক্ষা বাতিলের দাবিতে করা রিট হাইকোর্টের কার্যতালিকা থেকে বাদ পড়ার খবরটি ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের ভর্তি-পদ্ধতি নিয়ে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তবে এটি ভর্তি পরীক্ষা বাতিল বা লটারি পদ্ধতি পুনর্বহালের চূড়ান্ত রায় নয়। নিয়মিত বেঞ্চে পরবর্তী শুনানি এবং শিক্ষা কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্তের ওপরই পরবর্তী পরিস্থিতি নির্ভর করবে।
অভিভাবকদের তাই এখনই কোনো পদ্ধতি বাতিল ধরে না নিয়ে সরকারি নির্দেশনা অনুসরণ করা উচিত।

