BD Govt Service Rules

পিআরএল শেষে অবসরে যাচ্ছেন সরকারি কর্মচারীরা, উৎসব ভাতার ক্ষেত্রে কোন বিধি প্রযোজ্য?

সরকারি চাকরি থেকে অবসর গ্রহণের সময় উৎসব ভাতা পাওয়া যাবে কি না, তা নিয়ে অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারীর মধ্যে প্রশ্ন রয়েছে। বিশেষ করে সেপ্টেম্বরের শেষ দিন কিংবা অক্টোবর মাসে যাঁদের অবসর-উত্তর ছুটি (পিআরএল) শেষ হচ্ছে, তাঁদের ক্ষেত্রে উৎসব ভাতার প্রাপ্যতা নির্ধারণে ২০০৪ সালের অর্থ বিভাগের একটি পরিপত্র গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

অর্থ বিভাগের প্রবিধি শাখা-১ থেকে ২০০৪ সালের ৬ নভেম্বর জারি করা পরিপত্রে বলা হয়েছে, সরকারি, আধা-সরকারি, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা এবং সামরিক বাহিনীর কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী অবসরে যাওয়ার মাসে উৎসব অনুষ্ঠিত হলে তিনি পূর্ববর্তী মাসে আহরিত মূল বেতনের সমপরিমাণ অর্থ উৎসব ভাতা হিসেবে প্রাপ্য হবেন। পরিপত্রটির নম্বর অম/অবি/বিধি-১/চা:বি:-৬/২০০৪/১৮৪।

এই পরিপত্রের কারণে অবসরপ্রত্যাশী কর্মচারীদের মধ্যে উৎসব ভাতা নিয়ে নতুন করে আগ্রহ তৈরি হয়েছে। তবে বিধানটির সঠিক প্রয়োগ বুঝতে হলে পিআরএল শেষ হওয়ার তারিখ, চূড়ান্ত অবসরের কার্যকর তারিখ এবং সংশ্লিষ্ট উৎসবের সময়—এই তিনটি বিষয় আলাদাভাবে বিবেচনা করতে হবে।

২০০৪ সালের পরিপত্রের মূল বক্তব্য

পরিপত্রে মূলত উৎসবের মাসে অবসরে যাওয়া কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উৎসব ভাতা দেওয়ার বিষয়ে সরকারের সিদ্ধান্ত তুলে ধরা হয়েছে। এর আওতায় থাকা কোনো কর্মচারীর অবসরের মাসেই সংশ্লিষ্ট উৎসব অনুষ্ঠিত হলে, পূর্ববর্তী মাসে আহরিত মূল বেতনের সমপরিমাণ অর্থ উৎসব ভাতা হিসেবে পাওয়ার বিধান উল্লেখ রয়েছে।

এখানে দুটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

প্রথমত, পরিপত্রে শুধু পিআরএল শেষ হওয়ার কথা বলা হয়নি; সেখানে অবসরে যাওয়ার মাসে উৎসব অনুষ্ঠিত হওয়ার শর্ত রয়েছে।

দ্বিতীয়ত, উৎসব ভাতার হিসাব নির্ধারণের ক্ষেত্রে পূর্ববর্তী মাসে আহরিত মূল বেতনের কথা বলা হয়েছে। তাই অবসর গ্রহণের পর পেনশনার হিসেবে প্রাপ্য ভাতা এবং চাকরিরত অবস্থার উৎসব ভাতার হিসাব এক করে দেখা ঠিক হবে না।

সেপ্টেম্বরের শেষ দিনে পিআরএল শেষ হলে কী হবে?

ধরা যাক, একজন সরকারি কর্মচারীর পিআরএল ৩০ সেপ্টেম্বর শেষ হয়েছে। তাঁর ক্ষেত্রে প্রথমেই দেখতে হবে, সংশ্লিষ্ট আদেশে চূড়ান্ত অবসরের কার্যকর তারিখ কীভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে এবং উৎসবটি কোন মাসে অনুষ্ঠিত হয়েছে।

যদি প্রযোজ্য বিধানের শর্ত অনুযায়ী সেপ্টেম্বর মাসে তাঁর অবসর কার্যকর হয় এবং ওই মাসেই সংশ্লিষ্ট উৎসব অনুষ্ঠিত হয়, তাহলে ২০০৪ সালের পরিপত্রটি তাঁর উৎসব ভাতার প্রাপ্যতা যাচাইয়ের ভিত্তি হতে পারে।

কিন্তু উৎসব যদি অক্টোবর মাসে অনুষ্ঠিত হয়, আর তাঁর অবসর সেপ্টেম্বরেই কার্যকর হয়ে থাকে, তাহলে কেবল পিআরএল শেষ হওয়ার তারিখের ভিত্তিতে ২০০৪ সালের পরিপত্র প্রয়োগ করে সিদ্ধান্ত দেওয়া যাবে না। এ ক্ষেত্রে অবসর-পরবর্তী পেনশনভোগীদের উৎসব ভাতার বিধানও বিবেচনা করতে হবে।

অক্টোবর মাসে পিআরএল শেষ হলে কি উৎসব ভাতা পাওয়া যাবে?

অক্টোবর মাসে পিআরএল শেষ হওয়া কর্মচারীদের ক্ষেত্রেও একই ধরনের যাচাই প্রয়োজন। পিআরএল শেষ হওয়ার পর কর্মচারী পেনশনভোগী হিসেবে কোন তারিখ থেকে গণ্য হচ্ছেন এবং উৎসবের তারিখ সেই সময়ের মধ্যে পড়ছে কি না, তা গুরুত্বপূর্ণ।

উদাহরণস্বরূপ, কোনো কর্মচারীর পিআরএল ৫ অক্টোবর শেষ হলে তাঁর অবসর-পরবর্তী অবস্থা এবং ১০ অক্টোবর অনুষ্ঠিত কোনো উৎসবের সময়কাল মিলিয়ে দেখতে হবে। প্রযোজ্য বিধান অনুযায়ী উৎসবের সময় তিনি পেনশনভোগী হিসেবে গণ্য হলে তাঁর ক্ষেত্রে পেনশনারদের উৎসব ভাতা-সংক্রান্ত নিয়ম প্রাসঙ্গিক হতে পারে।

অন্যদিকে, পিআরএল শেষ হওয়ার আগে উৎসব অনুষ্ঠিত হলে এবং কর্মচারী তখনো চাকরিরত অবস্থায় উৎসব ভাতা পাওয়ার শর্ত পূরণ করলে হিসাবটি ভিন্ন হতে পারে। তাই প্রতিটি ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত অবসর আদেশ ও বেতন-ভাতার রেকর্ড যাচাই করা প্রয়োজন।

পিআরএল চলাকালে উৎসব ভাতা এবং পেনশনারদের উৎসব ভাতা কি এক?

না, দুটি বিষয় আলাদা করে বোঝা জরুরি।

পিআরএল চলাকালে কর্মচারী অবসর-উত্তর ছুটিতে থাকলেও সংশ্লিষ্ট বিধি অনুযায়ী চাকরিরত কর্মচারীদের কিছু সুবিধা প্রাপ্য হতে পারেন। অন্যদিকে, চূড়ান্ত অবসরের পর পেনশনভোগীদের উৎসব ভাতা নির্ধারিত হয় তাঁদের জন্য প্রযোজ্য পৃথক বিধান অনুসারে।

প্রধান হিসাবরক্ষণ ও অর্থ বিভাগের পেনশন-সংক্রান্ত নির্দেশনায় দেখা যায়, পেনশনারদের জন্য উৎসব ভাতার ব্যবস্থা ১ জুলাই ২০০৮ থেকে চালু হয়। এ বিষয়ে অর্থ বিভাগের ২৪ জুন ২০০৮ তারিখের স্মারক উল্লেখ রয়েছে।

অতএব, কোনো কর্মচারী উৎসবের তারিখে পিআরএলে রয়েছেন, নাকি ইতোমধ্যে পেনশনভোগী হয়েছেন—তার ওপর প্রযোজ্য বিধান নির্ভর করতে পারে।

উৎসব ভাতার পরিমাণ কীভাবে নির্ধারিত হবে?

২০০৪ সালের পরিপত্রে অবসরের মাসে উৎসব অনুষ্ঠিত হলে পূর্ববর্তী মাসে আহরিত মূল বেতনের সমপরিমাণ অর্থের কথা বলা হয়েছে।

উদাহরণ হিসেবে, কোনো কর্মচারীর পূর্ববর্তী মাসে আহরিত মূল বেতন ৪০ হাজার টাকা হলে, পরিপত্রের সব শর্ত পূরণ সাপেক্ষে ৪০ হাজার টাকা উৎসব ভাতার হিসাবের ভিত্তি হতে পারে।

তবে এটি একটি উদাহরণমাত্র। বাস্তবে কর্মচারীর বেতন-নির্ধারণী বিবরণী, অবসর আদেশ, সংশ্লিষ্ট বিধি এবং হিসাবরক্ষণ কর্তৃপক্ষের যাচাই অনুযায়ী চূড়ান্ত প্রাপ্যতা নির্ধারিত হবে।

পেনশনভোগীদের ক্ষেত্রে আবার তাঁদের জন্য প্রযোজ্য উৎসব ভাতার নিয়ম অনুসরণ করতে হবে। তাই চাকরিরত অবস্থায় আহরিত মূল বেতন এবং অবসরের পর নির্ধারিত পেনশনের ভিত্তিতে প্রাপ্য সুবিধাকে একই হিসাবের মধ্যে ফেলা যাবে না।

১০০ শতাংশ পেনশন সমর্পণকারীদের ক্ষেত্রেও কী বিধান রয়েছে?

অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উৎসব ভাতা নিয়ে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হলো, অবসরপ্রাপ্ত মূল পেনশনভোগী ও পারিবারিক পেনশনভোগীদের উৎসব ভাতা প্রদানের বিষয়ে পৃথক সরকারি নির্দেশনা রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সরকারি নথিতে ১০০ শতাংশ পেনশন সমর্পণকারীদের ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট শর্তে উৎসব ভাতার সুবিধা প্রযোজ্য হওয়ার কথা উল্লেখ রয়েছে।

এটি পিআরএল শেষ হওয়ার মাসে চাকরিরত অবস্থার উৎসব ভাতার হিসাব থেকে পৃথক বিষয়। তাই কেউ শতভাগ পেনশন সমর্পণ করেছেন কি না, সেটি যাচাই করার পাশাপাশি তাঁর পেনশন-সংক্রান্ত প্রযোজ্য নির্দেশনাও দেখতে হবে।

অবসরপ্রত্যাশী কর্মচারীদের এখন কী করা উচিত?

সেপ্টেম্বরের শেষ দিন অথবা অক্টোবর মাসে পিআরএল শেষ হচ্ছে—এমন কর্মচারীদের সংশ্লিষ্ট দপ্তরের প্রশাসন শাখা ও হিসাবরক্ষণ অফিসের সঙ্গে যোগাযোগ করে নিচের বিষয়গুলো নিশ্চিত করা উচিত।

১. পিআরএল শেষ হওয়ার সঠিক তারিখ এবং চূড়ান্ত অবসরের কার্যকর তারিখ।

২. সংশ্লিষ্ট উৎসবের তারিখ এবং সেই সময়ে কর্মচারীর চাকরিগত বা পেনশনভোগী অবস্থান।

৩. পূর্ববর্তী মাসে আহরিত মূল বেতনের পরিমাণ।

৪. ২০০৪ সালের পরিপত্রের পাশাপাশি পেনশনারদের উৎসব ভাতা-সংক্রান্ত প্রযোজ্য নির্দেশনা।

৫. পরবর্তী সময়ে জারি করা কোনো সংশোধনী বা ব্যাখ্যা থাকলে তার প্রযোজ্যতা।

এসব তথ্য যাচাই করে হিসাবরক্ষণ কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে লিখিত ব্যাখ্যা নেওয়া হলে ভুল বোঝাবুঝি কমবে এবং প্রাপ্য সুবিধা নির্ধারণ সহজ হবে।

শেষ কথা

সরকারি চাকরি থেকে অবসরে যাওয়ার সময় উৎসব ভাতা প্রাপ্যতা নির্ধারণে ২০০৪ সালের ৬ নভেম্বরের অর্থ বিভাগের পরিপত্রটি গুরুত্বপূর্ণ। তবে এই পরিপত্রের সুবিধা নির্ভর করে অবসরের মাসে উৎসব অনুষ্ঠিত হওয়ার শর্ত এবং সংশ্লিষ্ট কর্মচারীর প্রযোজ্য বিধানের ওপর।

সেপ্টেম্বরের শেষ দিন কিংবা অক্টোবর মাসে পিআরএল শেষ হলেই প্রত্যেক কর্মচারী একই নিয়মে উৎসব ভাতা পাবেন—এমন সিদ্ধান্ত দেওয়া সঠিক হবে না। বরং পিআরএল শেষ হওয়ার তারিখ, চূড়ান্ত অবসরের কার্যকর তারিখ এবং উৎসবের সময় মিলিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে প্রাপ্যতা নিশ্চিত করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

তথ্যসূত্র: অর্থ বিভাগ, অর্থ মন্ত্রণালয়ের ৬ নভেম্বর ২০০৪ তারিখের পরিপত্র; প্রধান হিসাবরক্ষণ ও অর্থ বিভাগের পেনশন-সংক্রান্ত নির্দেশনা; সরকারি পেনশন ও উৎসব ভাতা-সংক্রান্ত প্রযোজ্য বিধি।

Source file

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *