বাংলাদেশে অনলাইনে আয়কর রিটার্ন দাখিল করতে গিয়ে নতুন করে সমস্যায় পড়ছেন কিছু করদাতা। ২০২৬-২৭ করবর্ষের রিটার্ন সফলভাবে জমা দিতে পারলেও আগের ২০২৪-২৫ ও ২০২৫-২৬ করবর্ষের রিটার্ন দাখিল করতে গিয়ে প্রতিটি করবর্ষে ৫ হাজার টাকা করে মোট ১০ হাজার টাকা প্রদেয় দেখাচ্ছে। এতে প্রশ্ন উঠেছে, ২০২৪ সালে টিআইএন খোলা করদাতাদের কেন আগের বছরের রিটার্ন জমা দিতে অতিরিক্ত অর্থ দিতে হচ্ছে এবং এই অর্থ মওকুফের কোনো সুযোগ রয়েছে কি না।
করদাতাদের দেওয়া স্ক্রিনশটে দেখা যায়, রিটার্নের হিসাবের শেষ অংশে ‘Total Amount Payable u/s 174’ শিরোনামে ৫ হাজার টাকা দেখানো হয়েছে। ফলে অনেকেই এটিকে সরাসরি জরিমানা হিসেবে বিবেচনা করছেন। তবে আয়কর আইন অনুযায়ী বিলম্বে রিটার্ন দাখিলের অতিরিক্ত কর এবং রিটার্ন দাখিল না করার জন্য আরোপিত জরিমানা এক বিষয় নয়। তাই অর্থ প্রদানের আগে সংশ্লিষ্ট করবর্ষের বিধান ও হিসাব যাচাই করা জরুরি।
স্ক্রিনশটে ৫ হাজার টাকা দেখানোর কারণ কী?
আয়কর আইন, ২০২৩-এর ১৭৪ ধারায় নির্ধারিত সময়ের পরে রিটার্ন দাখিলের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত কর হিসাবের বিধান রয়েছে। সংশ্লিষ্ট বিধান অনুযায়ী, স্বেচ্ছায় বিলম্বিত রিটার্ন দাখিলের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য করের ১০ শতাংশ অথবা ৫ হাজার টাকা—যেটি বেশি, সেই পরিমাণ অতিরিক্ত কর দিতে হতে পারে। নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে করবর্ষ শেষ হওয়ার পর কর কর্তৃপক্ষের নোটিশের ভিত্তিতে রিটার্ন দাখিল করলে ১৫ শতাংশ অথবা ১০ হাজার টাকা—যেটি বেশি, সেই বিধানও প্রযোজ্য হতে পারে।
তবে সব করদাতার ক্ষেত্রে একই অঙ্ক প্রযোজ্য হবে, এমন নয়। করদাতার পরিস্থিতি, সংশ্লিষ্ট করবর্ষে কার্যকর আইন এবং রিটার্নের হিসাবের ওপর প্রদেয় অর্থ নির্ভর করতে পারে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের আয়কর আইন ও নির্দেশনা অনুযায়ী, রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা এবং বিলম্বের কারণে প্রযোজ্য অতিরিক্ত অর্থ আলাদাভাবে বিবেচনা করতে হবে।
২০২৪ সালে টিআইএন খুললে কি আগের দুই বছরের রিটার্ন বাধ্যতামূলক?
এ প্রশ্নের উত্তর নির্ভর করে সংশ্লিষ্ট করদাতার বাস্তব পরিস্থিতির ওপর। শুধু টিআইএন খোলার সাল দেখেই কোনো ব্যক্তির সব করবর্ষের রিটার্ন বাধ্যতামূলক ছিল কি না, তা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না।
এ ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ:
- সংশ্লিষ্ট করবর্ষে করদাতার আয় করযোগ্য সীমা অতিক্রম করেছিল কি না।
- আয়কর আইন অনুযায়ী অন্য কোনো কারণে তাঁর রিটার্ন দাখিল বাধ্যতামূলক ছিল কি না।
- এর আগে কখনো আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়া হয়েছিল কি না।
- সংশ্লিষ্ট করবর্ষে কার্যকর আইন অনুযায়ী রিটার্ন দাখিলের সময়সীমা ও অতিরিক্ত করের বিধান কী ছিল।
যদি কোনো করদাতার সংশ্লিষ্ট করবর্ষে রিটার্ন দাখিলের আইনগত বাধ্যবাধকতা থাকে, তাহলে শুধু ওই বছর রিটার্ন জমা না দেওয়ার কারণে এখন অতিরিক্ত অর্থ দেখানো হচ্ছে বলে দাবি করলেই তা বাতিল হবে না। অন্যদিকে, হিসাব বা তথ্যের ভুল থাকলে সেটি যাচাই করে সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।
১০ হাজার টাকা মওকুফ করা সম্ভব?
করদাতাদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন এটি। পোর্টালে প্রদর্শিত অর্থ ভুলভাবে নির্ধারিত হলে বা প্রযোজ্য বিধান সঠিকভাবে প্রয়োগ না হলে সংশ্লিষ্ট কর সার্কেলের মাধ্যমে বিষয়টি যাচাই ও প্রয়োজনীয় সংশোধনের আবেদন করা যেতে পারে।
কিন্তু আইন অনুযায়ী অতিরিক্ত কর প্রযোজ্য হলে কেবল আবেদন করলেই তা মওকুফ হয়ে যাবে—এমন সাধারণ নিশ্চয়তা নেই। মওকুফ, সংশোধন বা অন্য কোনো প্রতিকার পাওয়া যাবে কি না, তা নির্ভর করবে প্রযোজ্য আইন, সংশ্লিষ্ট পরিস্থিতি এবং কর কর্তৃপক্ষের ক্ষমতার ওপর।
অর্থাৎ, মওকুফের আবেদন করা এবং মওকুফ পাওয়ার অধিকার থাকা এক বিষয় নয়। তাই করদাতাদের উচিত প্রথমে অর্থটির প্রকৃতি ও আইনগত ভিত্তি নিশ্চিত করা।
করদাতারা এখন কী করবেন?
যাঁদের ২০২৪-২৫ ও ২০২৫-২৬ করবর্ষের রিটার্ন জমা দিতে গিয়ে ৫ হাজার টাকা করে অতিরিক্ত অর্থ দেখাচ্ছে, তাঁরা নিচের পদক্ষেপগুলো অনুসরণ করতে পারেন।
প্রথম ধাপ: রিটার্নের হিসাব যাচাই
দুই করবর্ষের রিটার্নে প্রবেশ করে প্রদেয় অর্থের বিস্তারিত হিসাব দেখুন। ‘Total Amount Payable u/s 174’ অংশে অর্থ দেখানো হলে সংশ্লিষ্ট ধারার বিধান অনুযায়ী হিসাবটি কীভাবে নির্ধারিত হয়েছে, তা বুঝে নিন।
দ্বিতীয় ধাপ: সংশ্লিষ্ট করবর্ষের বাধ্যবাধকতা নিশ্চিত করা
টিআইএন খোলার তারিখ, আগের রিটার্নের ইতিহাস, আয় এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক তথ্য নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর সার্কেলের সঙ্গে যোগাযোগ করুন। প্রয়োজনে কর আইন সম্পর্কে অভিজ্ঞ ব্যক্তির সহায়তা নিন।
তৃতীয় ধাপ: লিখিত আবেদন করা
হিসাবে ভুল থাকার যুক্তিসংগত কারণ থাকলে সংশ্লিষ্ট উপকর কমিশনারের কাছে লিখিত আবেদন করে প্রদেয় অর্থের ভিত্তি ব্যাখ্যা এবং প্রয়োজনীয় সংশোধনের অনুরোধ করা যেতে পারে। আবেদনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট রিটার্নের কপি ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র যুক্ত করা যেতে পারে।
চতুর্থ ধাপ: সরকারি নির্দেশনা অনুসরণ করা
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সরকারি ওয়েবসাইটে প্রকাশিত নির্দেশনা ও আয়কর আইন দেখে সিদ্ধান্ত নিন। প্রয়োজনে এনবিআরের আয়কর-সংক্রান্ত প্রশ্নোত্তর বিভাগ থেকেও তথ্য যাচাই করুন।
এনবিআরের সরকারি নির্দেশনা: https://nbr.gov.bd/faq/income-tax-faq
পুরোনো রিটার্ন জমা দিতে গিয়ে যে ভুল করা উচিত নয়
অনেক করদাতা শুধু অতিরিক্ত অর্থের কারণে পুরোনো করবর্ষের রিটার্ন জমা দেওয়া থেকে বিরত থাকেন। কিন্তু রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা থাকলে বিষয়টি দীর্ঘদিন ফেলে রাখা ভবিষ্যতে আরও জটিলতা তৈরি করতে পারে।
আবার, পোর্টালে অর্থ দেখাচ্ছে বলেই হিসাব না বুঝে সঙ্গে সঙ্গে অর্থ পরিশোধ করাও সব ক্ষেত্রে সঠিক সিদ্ধান্ত নয়। প্রথমে দেখতে হবে, এটি ধারা ১৭৪ অনুযায়ী অতিরিক্ত কর, নাকি অন্য কোনো কারণে প্রদেয় অর্থ হিসেবে গণনা করা হয়েছে।
এ ছাড়া ২০২৬-২৭ করবর্ষের রিটার্ন জমা দেওয়া হয়েছে বলে আগের দুই করবর্ষের দায় স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিষ্পত্তি হয়ে গেছে—এমন ধারণা করাও ঠিক নয়। প্রতিটি করবর্ষের হিসাব আলাদাভাবে যাচাই করতে হবে।
শেষ কথা
২০২৪ সালে টিআইএন খোলার পর ২০২৬-২৭ করবর্ষের রিটার্ন জমা দেওয়া গেলেও ২০২৪-২৫ ও ২০২৫-২৬ করবর্ষের রিটার্নে ৫ হাজার টাকা করে মোট ১০ হাজার টাকা প্রদেয় দেখানোর বিষয়টি করদাতার পরিস্থিতি ও সংশ্লিষ্ট আইনের আলোকে যাচাই করা প্রয়োজন।
স্ক্রিনশটে ধারা ১৭৪ উল্লেখ থাকায় প্রদর্শিত অর্থ বিলম্বে রিটার্ন দাখিলের অতিরিক্ত কর হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগে সংশ্লিষ্ট করবর্ষের আইন, রিটার্নের হিসাব এবং করদাতার রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা নিশ্চিত করতে হবে।
করদাতাদের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ পথ হলো—হিসাব যাচাই করা, প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট কর সার্কেলে লিখিত আবেদন করা এবং সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া। এতে অযথা অর্থ প্রদান কিংবা রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা উপেক্ষা—দুই ধরনের ঝুঁকিই কমানো সম্ভব।

