সূচীপত্র
বাংলাদেশে জমি কেনা-বেচা বা মালিকানা প্রমাণের প্রধান ভিত্তি হলো ‘খতিয়ান’। অনেকেই সঠিক খতিয়ান না চেনায় জমি সংক্রান্ত নানা আইনি জটিলতায় পড়েন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ব্রিটিশ আমল থেকে বর্তমান পর্যন্ত প্রধানত ৫ ধরনের খতিয়ান বাংলাদেশে প্রচলিত আছে। জমির সঠিক মালিকানা ও সীমানা বুঝতে এই খতিয়ানগুলোর গুরুত্ব অপরিসীম।
১. সি.এস. খতিয়ান (C.S.): খতিয়ানের আদি উৎস
ব্রিটিশ শাসনামলে ১৮৮৮ থেকে ১৯৪০ সালের মধ্যে প্রথম যে জরিপ করা হয়, তাকে বলা হয় সি.এস. খতিয়ান। এটি সবচেয়ে পুরোনো এবং মৌলিক খতিয়ান। বর্তমানে কোনো জমির আদি মালিক কে ছিলেন এবং জমির মূল অবস্থান কী ছিল, তা যাচাই করতে এই খতিয়ানের বিকল্প নেই।
২. এস.এ. খতিয়ান (S.A.): জমিদারী প্রথা বিলুপ্তির দলিল
১৯৫০ সালে জমিদারী প্রথা বিলুপ্ত হওয়ার পর ১৯৫৬ থেকে ১৯৬২ সালের মধ্যে এই খতিয়ান তৈরি করা হয়। তবে দ্রুততার সাথে তৈরি করার কারণে এস.এ. খতিয়ানে প্রচুর ভুল-ভ্রান্তি রয়ে গেছে। তাই এই খতিয়ানটি ব্যবহারের ক্ষেত্রে অন্য খতিয়ানের সাথে মিলিয়ে দেখার পরামর্শ দেন আইন বিশেষজ্ঞরা।
৩. আর.এস. খতিয়ান (R.S.): সংস্কারকৃত জরিপ
সি.এস. জরিপের দীর্ঘ সময় পর জমির মালিকানা ও সীমানার পরিবর্তনগুলো অন্তর্ভুক্ত করার জন্য যে রিভিশনাল সার্ভে বা পুনঃ জরিপ করা হয়, সেটিই আর.এস. খতিয়ান। এটি পাকিস্তান আমলে করা হয়েছিল এবং এখনো দেশের অনেক অঞ্চলে এটি অত্যন্ত গ্রহণযোগ্য দলিল হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
৪. বি.এস. খতিয়ান (B.S.): বর্তমানের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য দলিল
বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত যে হালনাগাদ জরিপ চলছে, তাকে বি.এস. বা বাংলাদেশ সার্ভে খতিয়ান বলা হয়। এটি সবচেয়ে আধুনিক এবং নির্ভুল খতিয়ান হিসেবে বিবেচিত। নতুন মালিকানা, জমির দাগ নম্বর এবং অংশীদারদের আপডেট তথ্য এতে নিখুঁতভাবে থাকে।
৫. ডি.পি. খতিয়ান (D.P.): প্রজেক্ট ভিত্তিক বিশেষ খতিয়ান
সরকারি উন্নয়নমূলক প্রকল্প যেমন নদী শাসন, পুনর্বাসন বা বিশেষ প্রজেক্ট এরিয়ার জন্য আলাদাভাবে ডি.পি. খতিয়ান তৈরি করা হয়। এটি সাধারণ জমির চেয়ে নির্দিষ্ট উন্নয়ন এলাকার জন্য বেশি প্রযোজ্য।
একনজরে খতিয়ান চেনার সহজ উপায়:
| খতিয়ানের নাম | বৈশিষ্ট্য |
| সি.এস. (CS) | সবচেয়ে পুরনো, জমির মূল ইতিহাস জানতে। |
| আর.এস. (RS) | সি.এস. এর ভুল সংশোধন ও পরবর্তী মালিকানা যাচাই। |
| বি.এস. (BS) | বর্তমান সময়ের সবচেয়ে হালনাগাদ ও নির্ভুল রেকর্ড। |
| এস.এ. (SA) | জমিদারী বিলুপ্তির সময়ের দলিল (ভুল থাকার সম্ভাবনা থাকে)। |
| ডি.পি. (DP) | সরকারি বিশেষ উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য তৈরি। |
সতর্কতা: জমি কেনা বা বিক্রির আগে সব সময়ের বিএস (BS) খতিয়ানের পাশাপাশি আগের খতিয়ানগুলোর (CS/RS) ধারাবাহিকতা বা ‘চেইন’ ঠিক আছে কি না, তা যাচাই করা আবশ্যক।
এত রকমের খোজ খবর কেন নিতে হয়?
জমির মালিকানা নিশ্চিত করতে এতগুলো খতিয়ান বা রেকর্ড ঘেঁটে দেখার পেছনে মূলত ৩টি প্রধান কারণ কাজ করে: মালিকানার ধারাবাহিকতা (Chain of Title), নির্ভুলতা যাচাই এবং প্রতারণা থেকে বাঁচা।
নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো কেন এটি জরুরি:
১. মালিকানার ধারাবাহিকতা বা ‘চেইন’ মেলানো
বাংলাদেশে জমি কেবল একজনের কাছ থেকে অন্যজনের কাছে যায় না, এটি বংশপরম্পরায় বা কেনাবেচার মাধ্যমে হাতবদল হয়।
সি.এস. খতিয়ানে মালিক ছিলেন আপনার দাদা।
আর.এস.-এ সেটি আপনার বাবার নামে আসার কথা।
বি.এস.-এ সেটি আপনার নামে থাকার কথা। যদি মাঝখানের কোনো একটি খতিয়ানে নামের মিল না থাকে বা অন্য কারো নাম চলে আসে, তবে বুঝতে হবে সেখানে মালিকানায় কোনো সমস্যা আছে। এই ধারাবাহিকতা না মিললে জমি বিক্রি বা মিউটেশন (নামজারি) করা অসম্ভব হয়ে পড়ে।
২. জমির শ্রেণি ও সীমানা পরিবর্তন
সময়ের সাথে সাথে জমির শ্রেণি পরিবর্তন হয়। যেমন: আগে যেটা ‘নাল’ (কৃষি জমি) ছিল, সেটা এখন ‘ভিটি’ (বাড়ি করার যোগ্য) বা ‘বাণিজ্যিক’ হয়ে যেতে পারে।
পুরানো খতিয়ান দেখলে বোঝা যায় জমিটি আগে কী ছিল (যেমন: পুকুর বা খাল কি না)।
অনেক সময় দেখা যায় বিএস খতিয়ানে ভুলবশত অন্যের জমি আপনার রেকর্ডে ঢুকে গেছে বা আপনার জমি অন্যের রেকর্ডে। সব খতিয়ান না মেলালে এই সীমানা বিতর্ক সমাধান করা যায় না।
৩. জালিয়াতি এবং ‘ডাবল’ লিখন রোধ
বাংলাদেশে অনেক সময় একই জমি একাধিক ব্যক্তির নামে রেকর্ড হয়ে থাকে।
হয়তো জাল দলিলের মাধ্যমে এস.এ. খতিয়ানে কেউ নাম লিখিয়ে নিয়েছিল।
আপনি যদি শুধু আধুনিক বি.এস. দেখে জমি কেনেন এবং পরে দেখা যায় আদি রেকর্ড বা সি.এস. অনুযায়ী জমির প্রকৃত মালিক অন্য কেউ, তবে আপনি আইনি জটিলতায় পড়বেন। আদালত সাধারণত আদি রেকর্ড এবং ধারাবাহিকতাকে বেশি গুরুত্ব দেয়।
৪. সরকারি স্বার্থ বা খাস জমি কি না তা যাচাই
অনেক সময় দেখা যায় বিএস খতিয়ানে জমিটি ব্যক্তির নামে, কিন্তু আগের (CS বা SA) খতিয়ানে সেটি ছিল ‘সরকারি খাস জমি’, ‘অর্পিত সম্পত্তি’ বা ‘ওয়াকফ’ সম্পত্তি। আগের খতিয়ানগুলো চেক না করলে আপনি অজান্তেই সরকারি জমি কিনে বিপদে পড়তে পারেন, যা যেকোনো সময় সরকার বাজেয়াপ্ত করতে পারে।
৫. ব্যাংক লোন এবং আইনি বৈধতা
আপনি যদি জমি বন্ধক রেখে ব্যাংক থেকে লোন নিতে চান, তবে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ গত ২৫-৩০ বছরের মালিকানার রেকর্ড বা খতিয়ানের ধারাবাহিকতা দেখতে চাইবে। চেইন ঠিক না থাকলে ব্যাংক লোন দেয় না।
সারকথা: খতিয়ান হলো জমির “বায়োডাটা”। একটি মানুষের অতীত না জেনে যেমন তাকে পুরোপুরি চেনা যায় না, তেমনি আদি খতিয়ান (CS) থেকে বর্তমান (BS) পর্যন্ত সব তথ্য না মিলিয়ে জমি কেনা মানে বড় ধরণের আর্থিক ঝুঁকিতে পড়া।
