সূচীপত্র
বাংলাদেশ সরকারের ভূমি ব্যবস্থাপনাকে সম্পূর্ণ ডিজিটাল ও নির্ভুল করার মহাপরিকল্পনার অংশ হিসেবে সিলেট বিভাগের চার জেলা—সুনামগঞ্জ, সিলেট, হবিগঞ্জ, ও মৌলভীবাজারে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে BDS (Bangladesh Digital Survey)। ভূমি মালিকদের জন্য এটি একটি “সুখবর” হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, কারণ এই জরিপের মাধ্যমে জমির রেকর্ড সংক্রান্ত বহু পুরোনো জটিলতার স্থায়ী সমাধানের পথ খুলছে।
তবে, ভূমি মালিকদের সতর্ক করে দিয়ে ভূমি প্রশাসন জানিয়েছে, এই ডিজিটাল জরিপ প্রক্রিয়া চলাকালীন সামান্য অবহেলাও ভবিষ্যতে জমির রেকর্ড ভুল, নামজারি জটিলতা কিংবা প্রতিবেশীর সঙ্গে সীমা-বিরোধের বড় কারণ হতে পারে। এই পরিস্থিতিতে, জমির রেকর্ড নির্ভুল ও সুরক্ষিত রাখতে ভূমি মালিকদের জন্য ৭টি জরুরি করণীয় পালনের আহ্বান জানানো হয়েছে। দেশের অন্যান্য জেলাতেও খুব দ্রুতই এই জরিপ শুরু হবে, তাই সকল ভূমি মালিককে এখন থেকেই প্রস্তুত থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
ভূমি মালিকদের জন্য ৭টি জরুরি করণীয়
জরিপ চলাকালীন ভূমি মালিকদের নিম্নলিখিত পদক্ষেপগুলো অত্যন্ত যত্নের সঙ্গে নিশ্চিত করতে হবে:
১. প্রয়োজনীয় কাগজপত্র প্রস্তুত রাখুন
জরিপ দল মাঠে আসার আগেই ভূমি সংক্রান্ত সকল নথি গুছিয়ে রাখুন। এর মধ্যে রয়েছে:
জমির দলিল
নামজারি (মিউটেশন) বা খারিজ খতিয়ান
পর্চা (CS/SA/RS/BS)
দাগ নম্বর, জমির পরিমাণ
খাজনার রশিদ (আপ-টু-ডেট)
জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) কপি
পুরোনো ম্যাপ (যদি থাকে)
২. নিজের জমির সীমানা পরিষ্কার করুন
জরিপ কাজ শুরু হওয়ার আগে জমির চারদিকের সীমানা স্পষ্ট ও দৃশ্যমান করে তুলুন।
জমির পিলার বা সীমানা চিহ্ন ঠিক আছে কিনা নিশ্চিত করুন।
প্রতিবেশী ভূমি মালিকদের সঙ্গে আলোচনা করে সীমানা মিলিয়ে নিন এবং কোনো বিরোধ থাকলে জরিপ শুরুর আগেই তা সমাধানের চেষ্টা করুন।
৩. জরিপ দলের সঙ্গে সহযোগিতা করুন
জরিপ দল যখন মাঠে কাজ করবে, তখন ভূমি মালিকের নিজেই উপস্থিত থাকা আবশ্যক।
সঠিক তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করুন এবং জমির অবস্থান নিজে হাতে দেখিয়ে দিন।
৪. ফিল্ড বুক/খসড়া তালিকা অবশ্যই যাচাই করুন
জরিপ শেষে তৈরি হওয়া প্রাথমিক ফিল্ড বুক বা খসড়া তালিকা (খানাপুরী) মনোযোগ সহকারে যাচাই করুন।
খসড়ায় আপনার নাম, দাগ নম্বর, জমির পরিমাণ, ও জমির ধরণ—সবকিছু সঠিকভাবে লেখা হয়েছে কিনা মিলিয়ে দেখুন।
কোনো ভুল ধরা পড়লে সঙ্গে সঙ্গে জরিপকারী কর্মকর্তাকে জানান।
৫. ভুল পেলে আপত্তি (Objection) জানান
খসড়া বা প্রাথমিক তালিকায় কোনো ভুল ধরা পড়লে নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে লিখিত আপত্তি (আপত্তি মামলা) দায়ের করতে হবে।
আপত্তির সঙ্গে প্রয়োজনীয় সঠিক কাগজপত্র জমা দিন।
জরিপ কর্মকর্তা যাচাই-বাছাই শেষে প্রয়োজনীয় সংশোধন করবেন।
৬. চূড়ান্ত BDS খতিয়ান সংগ্রহ করুন
যখন চূড়ান্ত BDS খতিয়ান প্রকাশ হবে, তখন অবশ্যই চক করে মিলিয়ে দেখুন।
ভুল থেকে গেলে দ্রুত সময়ের মধ্যে সংশোধনের জন্য আবেদন করুন।
৭. রেকর্ড ডিজিটালভাবে সংরক্ষণ করুন
জমির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নতুন ডিজিটাল রেকর্ডগুলোও সুরক্ষিত রাখুন।
দলিল ও খতিয়ান স্ক্যান করে বা উচ্চ রেজোলিউশনের ছবি তুলে রাখুন।
জমির সীমানার ছবি ও ভিডিও সংরক্ষণ করুন।
অনলাইন ক্লাউড স্টোরেজে বা ডিজিটাল মাধ্যমে ব্যাকআপ রাখা সবচেয়ে নিরাপদ।
❌ যে ভুলগুলো এড়িয়ে চলতে হবে
ভূমি মালিকদের বিশেষভাবে সতর্ক করা হয়েছে যেন তারা নিম্নলিখিত ভুলগুলো এড়িয়ে চলেন:
জরিপ দলের জন্য মাঠে উপস্থিত না থাকা।
নিজের জমির সীমা পরিষ্কারভাবে না দেখানো।
খসড়া তালিকা যাচাই না করে স্বাক্ষর করা।
ভুল ধরা পড়লেও আপত্তি না করা বা সময়মতো আবেদন না করা।
প্রতিবেশীর সঙ্গে সীমা-বিরোধ ঝুলিয়ে রাখা।
ভূমি প্রশাসন জোর দিয়ে বলেছে, BDS জরিপ হচ্ছে আপনার জমির ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা নিশ্চিত করার এক সুবর্ণ সুযোগ। এখন যত্নের সঙ্গে এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হলে, পরের ৫০ বছর পর্যন্ত রেকর্ড সংক্রান্ত ঝামেলা তত কম হবে।

